নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (নোবিপ্রবি) ক্যাম্পাসে নির্ধারিত বাসভবন থাকার পরও বাড়িভাড়া বাবদ প্রতি মাসে বিপুল টাকা তুলে নিচ্ছেন উপাচার্য অধ্যাপক দিদার-উল-আলম। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) নিরীক্ষা দলের কাছে এ অনিয়ম ধরা পড়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে এ পর্যন্ত তুলে নেওয়া টাকা ফেরত দিতে উপাচার্যকে নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। গত ১৮ জুলাই উপাচার্যকে চিঠি দিয়ে টাকা পরিশোধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঢাকার গেস্ট হাউসে দীর্ঘদিন ব্যবহার করা পাজেরো জিপ গাড়িটি ক্যাম্পাসে নিয়ে যেতে বলা হয়েছে উপাচার্যকে। ইউজিসির সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ড. ফেরদৌস জামান স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, কমিশনের বাজেট নিরীক্ষা দল গত ১৫-১৬ নভেম্বর নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনে যায়। দলটি ২০২০-২১ অর্থবছরের সংশোধিত এবং ২০২০-২১ অর্থবছরের মূল বাজেট পরীক্ষার সময় উপাচার্যের বাংলো থাকা সত্ত্বেও বাড়িভাড়া ভাতা দেওয়া হচ্ছে বলে দেখা যায়, যা আর্থিক শৃঙ্খলা পরিপন্থি।

চিঠিতে আরও বলা হয়, ২০১২ সালে কেনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাজেরো গাড়ি অতীতের ধারাবাহিকতায় ঢাকায় গেস্ট হাউসে ব্যবহূত হচ্ছে, যা বিধিবহির্ভূত। গাড়িটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে স্থানান্তর করা উচিত।

ইউজিসির নিরীক্ষা দলের দুই সদস্য সমকালকে জানান, অধ্যাপক দিদার-উল-আলম নোবিপ্রবিতে যোগ দিয়েই প্রতি মাসে ৬০ হাজার টাকা বাড়িভাড়া তুলে নিচ্ছেন। তিনি নিকটাত্মীয়ের মালিকানাধীন রাজধানীর একটি ফ্ল্যাটের সঙ্গে এজন্য চুক্তি করেছেন। অথচ উপাচার্য পদে তার নিয়োগের শর্তানুযায়ী তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী হিসেবে সার্বক্ষণিক ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকায় তিনি রাজধানী ঢাকায় কোনোভাবেই বাড়িভাড়া পেতে পারেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৫ একর জমির ওপর তিনতলা সুদৃশ্য ভিসি বাংলো থাকার পরও তিনি বাড়িভাড়া বাবদ অতিরিক্ত অর্থ নিতে পারেন না। উপাচার্য তার বেতন থেকে কোনো বাড়িভাড়া পরিশোধ করেন না। বরং কাগজপত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেস্ট হাউসের একটি কক্ষ ব্যবহার করছেন দেখিয়ে মাসে মাত্র ছয় হাজার টাকা পরিশোধ করেন।

নিরীক্ষা দলের সদস্যরা জানান, উপাচার্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্বাভাবিক অবসরে যাওয়ার পরে নোবিপ্রবিতে নিয়োগ পান। অধ্যাপক হিসেবে তার বেতন স্কেল ৭৮ হাজার টাকা, সে হিসাবে তার বাসা ভাড়া হয় ২৬ হাজার ৮০০ টাকা। এই হিসাবেও ৬০ হাজার টাকা তোলার কোনো সুযোগ নেই।

তারা জানান, ঢাকায় রাখা পাজেরো গাড়িটি উপাচার্যের পরিবারের সদস্যরা সার্বক্ষণিক ব্যবহার করেন বলে তারা তথ্য পেয়েছেন। গাড়ির চালক, জ্বালানি ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তহবিল থেকে নির্বাহ করা হচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি থেকে জানা গেছে, নোবিপ্রবিতে নিরীক্ষা চলাকালে বেশ কিছু আর্থিক বিশৃঙ্খলা ধরা পড়ে। এরপর গত ২৩ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি দিয়ে বাজেট ব্যয়ের ক্ষেত্রে বেশ কিছু গাইডলাইন দেওয়া হয়। ২০২১-২২ অর্থবছরের মূল বাজেটে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বমোট ৮৬৩ জনবলের বেতন-ভাতা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন ১৬ জন অধ্যাপক, ৩৪ জন সহযোগী অধ্যাপক, ১৭৯ জন সহকারী অধ্যাপক, ১১৬ জন প্রভাষক, কর্মকর্তা ১২৮ জন, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ৩৯০ জন। চলতি ২০২১-২২ অর্থবছরে নোবিপ্রবিকে মোট ৭৯ কোটি ৬৬ লাখ টাকা বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

গত ৫ মে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উপসচিব নূরে আলমের সই করা এক চিঠিতে নোবিপ্রবিতে সংঘটিত বেশ কিছু আর্থিক অনিয়মের উদাহরণ দিয়ে তা বন্ধের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উপাচার্যকে বলা হয়। তবে উপাচার্য ব্যবস্থা নেননি। চিঠিতে বলা হয়, উপাচার্য তার ইচ্ছেমতো মোবাইল বিল পরিশোধ করেন, নূ্যনতম যোগ্যতা না মেনে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেন, এতে পিএইচডিসহ অনেক উচ্চতর ডিগ্রিধারী প্রার্থী বঞ্চিত হয়েছেন। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছে জনপ্রিয় থাকতে তিনি সরকারি বিধি অনুযায়ী বাসাভাড়া না কেটে বর্গফুট হিসেবে ভাড়া কাটেন।

নোবিপ্রবির সাবেক উপাচার্যের অনিয়ম-দুর্নীতি তদন্ত করতে ইউজিসির একটি দল গত জানুয়ারিতে নোয়াখালী যায়। তদন্ত করতে গিয়ে বর্তমান উপাচার্যের নানা আর্থিক অনিয়ম ধরা পড়ে। তদন্ত দলের প্রধান ও ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. মো. আবু তাহের সমকালকে বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

নোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. দিদার-উল-আলম সমকালকে বলেন, আমার নিয়োগের প্রজ্ঞাপনে ছিল, আমি ঢাকাতে যে পরিমাণ বাসাভাড়া পাই, এখানেও তা পাব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসরে যাওয়ার আগে ৬০ হাজার টাকা করে বাসাভাড়া পেতাম। তারপরও এরা (ইউজিসি) এটা কেন ধরল বুঝতে পারলাম না। তবু তারা যেহেতু ধরেছে, আমি কোনো তর্কে যাব না। সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমি বাসা ছেড়ে দেব। জুলাই মাস থেকে আর কোনো বাসা ভাড়া নেব না।

তিনি বলেন, 'আমার মতো অনেক উপাচার্যই তো এভাবে বাসা ভাড়া নিচ্ছেন। সবাই-ই নেয়। শুধু আমাকে বলার মানে কী?' তিনি দাবি করেন, তিনি ভিসি বাংলো ব্যবহার করেন না। গেস্ট হাউসে থাকেন। তার সন্তান ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। চাইলেই তো পরিবার মফস্বলে স্থানান্তর করা যায় না। এর জন্য সময় প্রয়োজন।

গাড়ি প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, গাড়িটি আগে থেকেই ঢাকায় চলে। বসিয়ে রাখলে তো নষ্ট হবে। এর আগে একটা গাড়ি এমন হয়েছে। ঢাকায় গেস্ট হাউসের কাজে, শিক্ষকদের এয়ারপোর্ট থেকে আনা-নেওয়ার কাজে লাগে। উনারা (ইউজিসি) কীভাবে এগুলো অডিটে ধরেন, বুঝি না।