'চিকিৎসক হওয়ার কোনো আগ্রহ ছিল না। শুধু মায়ের ইচ্ছা পূরণের জন্যই মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া। মাত্র তিন মাসের প্রস্তুতিতেই আসে সাফল্য, যা ছিল প্রত্যাশার বাইরে। দেশসেরা হতে পেরে খুবই ভালো লাগছে।' এভাবেই নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন মিম মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার জাতীয় মেধা তালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করেছেন খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার মেয়ে মীম। লিখিত পরীক্ষায় ৯২ দশমিক ৫ নম্বর পেয়েছেন। তার মোট নম্বর ২৯২ দশমিক ৫। মীমের বাবা খুলনার ডুমুরিয়া কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোসলেম উদ্দিন সরদার। মা কেশবপুর উপজেলার পাঁজিয়া উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ফার্মাসিস্ট খাদিজা খাতুন। খুলনার ডুমুরিয়া বালিকা বিদ্যালয় থেকে ২০১৯ সালে যশোর বোর্ডের অধীনে এসএসসি ও ২০২১ সালে একই বোর্ডের অধীনে খুলনা সরকারি মজিদ মেমোরিয়াল সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। দুটি পরীক্ষাতেই জিপিএ ৫ পেয়েছিলেন। গ্রামের মেয়ে দেশের সেরা হওয়ায় অভিনন্দনের বন্যায় ভাসছে পুরো পরিবারে।

মীম বলেন, 'এত বেশি প্রত্যাশা ছিল না। তারপরও দেশসেরা হওয়ায় আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাই। আমার ফলাফলের পেছনে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন আমার মা-বাবা।

বিশেষ করে প্রতিদিন কেশবপুরে যাওয়া-আসা করা মায়ের জন্য ছিল খুবই কষ্টের। আমার জন্য এই কষ্ট তিনি হাসিমুখে মেনে নিয়েছেন। ফল পেয়ে তাদের মুখের হাসিই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।'

মীম বলেন, 'ছোটবেলায় চিকিৎসক হওয়ার কোনো ইচ্ছা আমার ছিল না। শুধু আম্মুর ইচ্ছার জন্যই মেডিকেলের জন্য পড়াশোনা করেছি। এখানে ভর্তির সুযোগ পেয়েছি, এটাই সবচেয়ে ভালো লাগার জায়গা।'

আগামী দিনের পরীক্ষার্থীদের উদ্দেশে মীম বলেন, 'বুঝে পড়াশোনা করতে হবে। সবাই ভাবে মুখস্থ করতে হবে। কিন্তু না, যা পড়ছ সেই বিষয়টা পরিস্কার বুঝতে হবে। মুখস্থ করলে পরদিন ভুলে যেতে পার। কিন্তু বুঝে পড়লে সেটা কাটিয়ে ওঠা যায়। কোচিংয়ের অনেক পরীক্ষায় ঠিকমতো প্রস্তুতি নিতে পারতাম না। তারপরও বুঝে পড়ার কারণে ফলাফল ভালো হতো।' ভর্তি পরীক্ষায় এমন সাফল্যের পেছনের কারণ জানতে চাইলে বলেন, 'কেউ মেধাবী হয়ে জন্মায় না। সবার ভেতরেই মেধা সুপ্ত ও ঘুমন্ত থাকে। জীবনের লক্ষ্য স্থির করে নিজের সুপ্ত মেধাকে জাগানোর জন্য সাধনা করতে হবে। স্বপ্টম্ন ছোঁয়ার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। প্রচুর পড়াশোনা করতে হবে, পরিশ্রম করতে হবে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। সময়ের কাজ সময়েই করতে হবে। আর পাঠ্যবইয়ের বাইরেও পৃথিবীকে জানতে হবে। তাহলেই সাফল্য মিলবে।'

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি কেমন হওয়া উচিত এ প্রসঙ্গে বলেন, মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা। তাই মূল বই পড়ার কোনো বিকল্প নেই। পরীক্ষার পূর্বমুহূর্তে মডেল টেস্টের মাধ্যমে নিজেকে যাচাই করে নিতে হবে। পরীক্ষার এক ঘণ্টা সময়ের প্রতিটি সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ। তাই নিশ্চিত হয়ে দাগানো বুদ্ধিমানের কাজ। প্রতিটি বই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়তে হবে। আগের বছরের প্রশ্নগুলোতে যা এসেছে, সেগুলো তো বারবার পড়বেই, অন্য বিষয়গুলোও পড়তে হবে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে বলেন, 'সবার আগে ভালো মানুষ হতে চাই।

এরপর একজন ভালো চিকিৎসক হতে চাই। আমাদের সমাজের মানুষের একটা খারাপ ধারণা রয়েছে, এই ধারণা থেকে মানুষকে ফিরিয়ে আনতে চাই।'
মীমের মা বলেন, 'আমার জীবনে একটাই চাওয়া ছিল, আমার মেয়ে বড় হয়ে চিকিৎসক হবে। সেই চাওয়া এখন পূরণ হতে চলেছে। ভাবতে পারিনি এত ভালো ফল করবে।' মীমের বাবা মোসলেম উদ্দিন সরদার বলেন, 'গ্রাম থেকে লেখাপড়া করে এত ভালো করবে, এটা ভাবতেই পারিনি। অনেক আনন্দ লাগছে, আল্লাহর কাছে অনেক শুকরিয়া। আনন্দেই আমার বুক ভরে যাচ্ছে।'