৪০তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারে প্রথম হয়েছেন জান্নাতুল ফেরদৌস। খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ২০১২-১৩ বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন জান্নাতুল। বর্তমানে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে এমবিএ করছেন। প্রথম বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিয়েই সফল হওয়ার গল্প জানিয়েছেন তিনি।

আপনার শৈশবের বেড়ে ওঠার গল্প জানতে চাই।
--আমার শৈশব কেটেছে ঢাকার যাত্রাবাড়ী ও টিকাটুলীতে। আমার বাবা বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মরত ছিলেন। সেই সুবাদে ঢাকাতেই আমার বেড়ে ওঠা। আমি এ কে হাইস্কুল হতে মাধ্যমিক পাস করি। এর পর উচ্চ মাধ্যমিকে হলিক্রস কলেজে ভর্তি হই। সে সময় যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের কাজ চলছিল। সে কারণে বাসা থেকে যাতায়াত কষ্টকর ছিল। ফলে কলেজ পরিবর্তন করে বাসার কাছে দনিয়া কলেজ থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হই। পরে কুয়েটে মেক্যানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হই।

বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিয়েছিলেন কবে থেকে?
--আসলে বিসিএস নিয়ে ভাবনা এসেছে হুট করেই। গ্র্যাজুয়েশনের পর আমি বাংলাদেশের বড় দুটি করপোরেট হাউসে জব করি প্রায় এক বছর। এর পর মনে হলো এই কাজগুলো আমার জন্য না। আসলে ছোটবেলা থেকেই মানুষের সঙ্গে কাজ করার, তাদের সম্পর্কে জানার ইচ্ছাটা আমার প্রবল। ভেবে দেখলাম, সরকারি চাকরির মাধ্যমেই বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের একদম কাছাকাছি যাওয়া যায়, তাদের জন্য কাজ করা যায়। এ ছাড়া সরকারি চাকরিতে বৈচিত্র্যও অনেক। এই ভাবনাগুলো থেকেই মূলত বিসিএস নিয়ে ভাবনা শুরু করা।

 বিসিএসের জন্য পড়াশোনার রুটিন কী ধরনের ছিল?
--বিসিএসের পড়ালেখার জন্য রুটিন খুবই গুরুত্বপর্ণ। রুটিনমাফিক পড়ালেখা করলে সেই পড়ালেখা গোছানো হয়। বিসিএস প্রিলি ও রিটেনে যেহেতু ১০ থেকে ১৫টি বিষয় থাকে, তাই রুটিন করে সব বিষয় পড়াশোনা করা উচিত। তবে আমার ধরাবাঁধা কোনো রুটিন ছিল না। যখন ভালো লেগেছে, পড়েছি। আবার যখন অন্য কাজ করতে ইচ্ছা হয়েছে, সেটা করেছি। সার্কুলার দেওয়ার পর থেকে ৪০তম বিসিএসের ফলাফল পর্যন্ত সময়টা ছিল চার বছরের এক দীর্ঘ যাত্রা। এর মধ্যে বৈশ্বিক অতিমারি কয়েকবার হানা দিয়েছে। পারিবারিক কারণে ছয় মাস যুক্তরাজ্যে ছিলাম এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে এমবিএ কোর্সে ভর্তি হয়েছি। ফলে এমবিএর পড়ালেখা এবং সংসার সামলিয়ে আমাকে পড়ালেখা করতে হয়েছে। খুব বেশি পড়ার সুযোগ আমি পাইনি। তবে যতটুকু পড়েছি, সেটা বিষয়ভিত্তিক সিলেবাস অনুযায়ী। পরীক্ষার সময় মাথা ঠান্ডা রেখে উত্তর করার চেষ্টা করেছি। যেহেতু ছোটবেলা থেকে পরীক্ষার উত্তরপত্রে গুছিয়ে লেখার একটা অভ্যাস ছিল; তাই তুলনামূলক কম পরিশ্রমে আমি লিখিত পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ণ হতে সক্ষম হই। মৌখিক পরীক্ষার পূর্বে প্রিলিমিনারি পরীক্ষার পিএসসি প্রদত্ত সিলেবাস অনুযায়ী প্রস্তুতি গ্রহণ করি। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমার মৌখিক পরীক্ষা ভালো হয়। আমি ভেবেছিলাম, সবকিছু ঠিক থাকলে আর ভাগ্য সহায় হলে আমার পছন্দের প্রশাসন ক্যাডারে সুপারিশ পেতে পারি। ফল যখন প্রকাশিত হলো তখন এক অনন্য অনুভূতি। আমি আসলে কল্পনা করিনি যে প্রথম হব। দেখলাম যা চেয়েছি তাই পেয়িছি।

নতুনদের বিসিএস প্রস্তুতি সম্পর্কে পরামর্শ কী?
--সব পড়াশোনা সিলেবাস অনুযায়ী করতে হবে। যদি বর্ণনামূলক লেখায় দুর্বলতা থাকে, তবে বাংলা ও ইংরেজিতে মুক্তহস্তে লেখা চর্চা করতে হবে। পড়ালেখার জন্য রুটিন খুবই প্রয়োজনীয়। রুটিনমাফিক পড়ালেখা করলে সেই পড়ালেখা গোছানো হয়। বিসিএস প্রিলি ও রিটেনে যেহেতু ১০ থেকে ১৫টি বিষয় থাকে, তাই রুটিন করে সব বিষয় পড়াশোনা করতে হবে। তিনটি বিষয় নতুন পরীক্ষার্থীদের অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে-
ক. সিলেবাস অনুযায়ী পড়াশোনা;
খ. বিগত বছরের প্রশ্ন পর্যালোচনা;
গ. পরীক্ষা কেন্দ্রে মাথা ঠান্ডা রেখে উত্তর করা।
যে বিষয়গুলোতে দুর্বলতা আছে, সেগুলো চর্চা করে একটা নূ্যনতম দক্ষতা নিয়ে আসতে হবে; যাতে দুর্বল বিষয়গুলোর পরীক্ষা মোটামুটি ভালো হয়। কখনোই কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে অন্য বিষয়গুলোকে অবহেলা করা যাবে না।
প্রিলি পরীক্ষার সময় আন্দাজে উত্তর করা উচিত নয়। অন্যদিকে লিখিত পরীক্ষায় কোনো প্রশ্ন ছেড়ে আসা উচিত নয়।

লিখিত পরীক্ষার জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিলেন?
-- বিসিএস লিখিত পরীক্ষার পূর্বে বিগত বছরগুলোর প্রশ্ন ও সিলেবাস পর্যালোচনা করে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো যেমন বাংলাদেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, সংবিধান, ভৌগোলিক অবস্থান, সমসাময়িক বিষয়াদি, অর্থনৈতিক সমীক্ষা, দৈনন্দিন বিজ্ঞান, সাধারণ গণিত, বাংলা ও ইংরেজি ব্যাকরণ এবং বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্য সম্পর্কে ধারণা নিয়েছি। লিখিত পরীক্ষার পূর্বে একটু লম্বা সময় পেলেও গুছিয়ে প্রস্তুতি নিতে পারিনি। পরে পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশের পর সময় পেয়েছিলাম প্রায় ২০ দিন। এই ২০ দিনে রুটিনমাফিক সব বিষয়ে গুছিয়ে পড়াশোনা করেছি।

ভাইভার প্রস্তুতি কেমন ছিল?
--৪০তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা বৈশ্বিক অতিমারির কারণে বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে মৌখিক পরীক্ষার সময় নিয়ে একটু অনিশ্চয়তায় ছিলাম। এর মাঝে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে এমবিএ প্রোগ্রামে ভর্তি হই। যার কারণে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ধারাবাহিকভাবে প্রস্তুতি নিতে পারিনি। তবে মৌখিক পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশের পর এক মাস সময়ে প্রিলিমিনারি পরীক্ষার সিলেবাস অনুযায়ী প্রস্তুতি গ্রহণ করি।