ঢাকা শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

১২৫ কোটি টাকার ড্রেনে নামে না বৃষ্টির পানি

১২৫ কোটি টাকার ড্রেনে নামে না বৃষ্টির পানি

বিআরটি প্রকল্পের কারণে প্রতিনিয়ত টঙ্গী-জয়দেবপুর সড়কে দুর্বিষহ যানজটে ভোগান্তি পোহাতে হয় যাত্রীদের। মঙ্গলবার তোলা সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২২ | ১৩:৩৮

গলার কাঁটায় পরিণত হওয়া বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের ১২৪ কোটি ৫২ লাখ টাকার ড্রেন দিয়ে পানি নামছে না। পৌনে ৭৩ কোটি টাকার 'হাই ক্যাপাসিটি ড্রেন' নামেই উচ্চ ক্ষমতার। এটি ময়লায় বন্ধ হয়ে আছে। পানি নিস্কাশনে খাল পুনঃখননে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দও কাজে আসেনি।

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাবে আগের দিনের বৃষ্টির পানি গতকাল মঙ্গলবার দুপুরেও জমে ছিল বিআরটি প্রকল্পের টঙ্গী-জয়দেবপুর সড়কে। পাঁচ বছর ধরে দুর্ভোগ দেওয়া বিআরটি আবারও ভুগিয়েছে। অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল; জরুরি প্রয়োজন ছাড়া উত্তরার দিকে না যেতে অনুরোধ জানায় ঢাকা মহানগর পুলিশ। তবে এতে পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
দিনভর স্থবির ছিল ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী-জয়দেবপুর অংশ। সরেজমিন দেখা যায়, টঙ্গী সেতুর পর থেকে মিলগেট পর্যন্ত সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। সড়কের দু'পাশে বিশাল গর্ত। ফ্লাইওভারের নিচের রাস্তারও একই দশা। গাড়ি চলছে হেলেদুলে।

বৃষ্টি হলে বিআরটির নির্মাণ এলাকায় দুর্ভোগ হবে- এমনটি জানা থাকলেও খানাখন্দ ভরাট এবং দু'পাশের ড্রেনগুলোয় পানি নিস্কাশনের ব্যবস্থা কেন করা হয়নি- এ প্রশ্নে সরকারি কোম্পানি ঢাকা বিআরটি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সফিকুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করেননি। প্রকল্পের সড়ক ও জনপথ (সওজ) অংশের পরিচালক এসএম ইলিয়াস শাহের সঙ্গে মঙ্গলবার সারাদিনেও যোগাযোগ করা যায়নি। প্রকল্পটির পরামর্শক দলের প্রধান হিসেবে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাজ করা ড. মাহবুবুল বারী সমকালকে জানান, বিআরটি লেনের দু'পাশে ১২ কিলোমিটার করে মোট ২৪ কিলোমিটার হাই ক্যাপাসিটি ড্রেন করা হয়ছে শুধু বৃষ্টির পানি নিস্কাশনের জন্য। কিন্তু সড়কের দু'পাশের বাজার, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পানি নিস্কাশনে পৃথক নালা নেই। তাই সব আবর্জনা বিআরটির ড্রেনে পড়ে।

ড. মাহবুবুল বারী বলেছেন, দু'পাশের স্থাপনার পানি নিস্কাশনে বিকল্প ড্রেন নির্মাণে পৃথক প্রকল্প দরকার। পরিকল্পনা অনুযায়ী, বিআরটির ড্রেনের পানি খাল হয়ে নদীতে যাবে। খালে অনেক স্থাপনা থাকায় পানি নামে না। এ জন্য সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। নির্মাণকাজের কারণে বিআরটির সব ড্রেন এখনও কার্যকর নয়। বিআরটি চালু হলে পানি নিস্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি হবে। তবে তাতে শুধু বিআরটির পানিই নামবে। জলাবদ্ধতা নিরসনে পৃথক ড্রেন লাগবে।

৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকায় সড়কের মাঝে বাসের জন্য বিশেষায়িত লেন তথা বিআরটি নির্মাণের প্রকল্পটি ২০১২ সালের। এটি ২০১৭ সালে নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকেই ভোগাচ্ছে। সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, 'সত্যি বলতে প্রকল্পটি গলার কাঁটা হয়ে গেছে। রাস্তার অবস্থান, ড্রেনেজ ব্যবস্থা খুব খারাপ।' ডিপিপি অনুযায়ী, সওজের অংশে ২৮ কিলোমিটার হাই ক্যাপাসিটি ড্রেন নির্মাণ ব্যয় ৭২ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ৫২ কোটি ৮১ লাখ টাকায় আরও ৩০ দশমিক ৩ কিলোমিটারের ড্রেন নির্মাণ করেছে সেতু বিভাগ এবং স্থানীয় প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। ২৪ কিলোমিটার পার্শ্ব নর্দমা নির্মাণ করা এলজিইডি অংশের প্রকল্প পরিচালক আল আমিন খান সমকালকে বলেছেন, মহাসড়কের দু'পাশের সংযোগ সড়ক ও ড্রেন নির্মাণকাজ অনেক আগে সম্পন্ন হয়েছে। তাহলে এসব সড়কে কেন জলাবদ্ধতা- এ প্রশ্নে তিনি বলেছেন, তিন মাস আগে থেকে প্রকল্পটির সঙ্গে এলজিইডির সম্পৃক্ততা নেই। তাই বলতে পারছেন না সেখানকার অবস্থা।
সরেজমিন দেখা গেছে, মূল সড়কের দু'পাশের হাই ক্যাপাসিটি ড্রেন আবর্জনায় ভরা। সড়কে থইথই পানিতে ভাসছে ময়লা। জলাবদ্ধতায় যানজট ভয়াবহ। গাজীপুর মহানগরের বোর্ড বাজারের রেবেকা আরিফ ব্যক্তিগত গাড়িতে প্রতিদিন উত্তরায় গিয়ে অফিস করেন। গতকাল যানজটের কারণে সকাল ৭টায় গাড়ি ছেড়ে গাজীপুরা থেকে হেঁটে যান অফিসে। সাত ঘণ্টা পর দুপুর ২টার দিকে চালককে ফোন করে জানতে পারেন, মাত্র পাঁচ কিলোমিটার এগিয়েছে তাঁর গাড়ি।

টঙ্গী সেতুর পূর্ব পাশের লেনে একটির বেশি গাড়ি চলতে পারে না। জলাবদ্ধতায় অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক) মো. আলমগীর হোসেন বলেন, বৃষ্টি হলেই ছয় লেনের সড়ক দুই লেনে পরিণত হয়।
ছালছাবিল পরিবহনের বাসচালক মোবারক হোসেন বলেন, সড়কের খানাখন্দে পানি জমে আছে। পানির কারণে গর্ত বোঝা যায় না। গাড়ি চালানো খুব কঠিন। টঙ্গী বাজার এলাকায় পথচারী আনোয়ার হোসেন বলেন, বোর্ড বাজার থেকে আসতে আড়াই ঘণ্টা লেগেছে। বাস একচুলও এগোচ্ছে না। তাই হাঁটা ধরেছেন।

বিআরটির কাজ এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও চতুর্থবারের মতো সময় বাড়িয়ে প্রকল্প মেয়াদ ২০২৩ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। জুনে কাজ শেষ হবে- প্রকল্প কর্তৃপক্ষ এমন দাবি করলেও বিআরটির বিশেষায়িত বাস কেনার দরপত্র হয়নি। তাই কাজ শেষ হলেও বিআরটি লেনে বাস কবে চলবে, তা অনিশ্চিত।

গত আগস্টে উত্তরায় গার্ডার দুর্ঘটনায় পাঁচজনসহ বিআরটির নির্মাণকাজে সাতজনের প্রাণ গেছে। তদন্তে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গেঝুবা গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেডের দায় পাওয়া গেলেও শাস্তি দেওয়া যায়নি। প্রকল্প ঝুলে যাবে- এমন আশঙ্কায় প্রতিষ্ঠানটি বাদও দেওয়া যায়নি।

প্রায় এক মাস বন্ধ থাকার পর গত ১১ সেপ্টেম্বর বিআরটির নির্মাণকাজ ফের শুরু হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) তিন সংস্থার ঋণে গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত বাসের জন্য সাড়ে ২০ কিলোমিটার বিআরটির নির্মাণকাজ ২০১৬ সালে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা ছিল।

মাটির সমতলে ১৬ কিলোমিটার বিআরটি লেন নির্মাণে চায়না গেঝুবা গ্রুপ প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ কম টাকায় কাজ নিয়েছে। সাড়ে চার কিলোমিটার ফ্লাইওভার নির্মাণে আরেক চীনা প্রতিষ্ঠান জিয়াংশু ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড গ্রুপ প্রাক্কলিত দরের চেয়ে ২৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ কম টাকায় কাজ নেয়। কম টাকায় কাজ নিয়ে তা ঠিকমতো করতে পারছে না প্রতিষ্ঠান দুটি। খরচ বাঁচাতে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে বিনিয়োগ করেনি। খোঁড়াখুঁড়ির কারণে সড়কে যানজট লেগেই আছে। জলাবদ্ধতায় ভোগান্তি ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে। আবার নির্ধারিত সময়ে পরিষেবার লাইন স্থানান্তর করে প্রকল্পের জমি ঠিকাদারকে বুঝিয়ে দিতে পারেনি সরকারি কর্তৃপক্ষ। এ কারণেই নির্ধারিত সময়ে কাজ হয়নি। এতে ভুগছে সাধারণ মানুষ।
(এ প্রতিবেদনের জন্য তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন গাজীপুর ও টঙ্গী প্রতিনিধি)





আরও পড়ুন

×