ঢাকা শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪

দাতা সংস্থার চাপ সামাল দিতে ওয়াসার কৌশল

দাতা সংস্থার চাপ সামাল দিতে ওয়াসার কৌশল

অমিতোষ পাল

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২২ | ১২:০০

হাইকোর্ট গত ২৩ অক্টোবর এক রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপিতে বলেছিলেন, 'সাংবাদিকরা তাঁদের তথ্যের উৎস প্রকাশ করতে বাধ্য নন। তাদের সোর্স প্রকাশ না করার ক্ষেত্রে আইন সুরক্ষা দিয়েছে। আর দুর্নীতিবিষয়ক তথ্য সংগ্রহে সাংবাদিকরা যে কোনো সরকারি-বেসরকারি অফিসে যেতে পারবেন। সংবাদের সোর্স জানাতে সাংবাদিকদের বাধ্য করা যাবে না। তবে কোনো সংবাদে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে, তিনি প্রেস কাউন্সিলে প্রতিকার চাইতে পারবেন।'

এই রায়ের ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় ঢাকা ওয়াসা কয়েকটি পত্রিকায় একটি 'বিশেষ বিজ্ঞপ্তি' দেয়। সেখানে বলা হয়, 'ইদানীং লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, কয়েকটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় ঢাকা ওয়াসা সম্পর্কে বিশেষ করে প্রকল্পসমূহের উপর মিথ্যা তথাকথিত দুর্নীতির তথ্য ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হচ্ছে। এরূপ বিভ্রান্তিকর তথ্য জনমনে ও ঢাকা ওয়াসার সম্মানিত গ্রাহকদের মধ্যে ঢাকা ওয়াসার কার্যক্রম সম্পর্কে বিরূপ ধারণার সৃষ্টি করছে। এমতাবস্থায় ঢাকা ওয়াসার যে কোনো প্রকল্পের উপর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা প্রমাণাদিসহ সরাসরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বরাবরে লিখিতভাবে দাখিল করার জন্য বিনীত অনুরোধ করা হলো। তথ্য প্রদানকারীর সকল গোপনীয়তা রক্ষা করা হবে। নগরবাসীর সেবা প্রদানের স্বার্থে এটি অত্যন্ত জরুরি। জনস্বার্থে- ঢাকা ওয়াসা।' শুধু এখানেই থেমে থাকেনি ঢাকা ওয়াসা, কয়েকটি গণমাধ্যমে চিঠি দিয়ে প্রতিবেদন সম্পর্কে প্রমাণাদিও চেয়েছে।

সংশ্নিষ্টরা মনে করেন, ঢাকা ওয়াসা ভালো করেই জানে, কোনো গণমাধ্যমই তাদের কাছে প্রমাণাদি সরবরাহ করবে না। তখন ওয়াসা একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে নিজেদের সাফাই গাইবে। সেখানে তুলে ধরা হবে, ওইসব গণমাধ্যম প্রতিবেদনের পক্ষে কোনো প্রমাণাদি দেখাতে পারেনি। এর পর বিষয়টি দাতা সংস্থাগুলোর কাছে উপস্থাপন করা হবে। অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে দেওয়া দাতা সংস্থাগুলোর চাপ সামলানোর জন্যই এমন উদ্যোগ নিয়েছে।

ঢাকা ওয়াসার উপপ্রধান জনতথ্য কর্মকর্তা এ এম মোস্তফা তারেকের সই করা একটি গণমাধ্যমের বার্তা সম্পাদকের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, 'স্বনামধন্য কয়েকটি পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে ঢাকা ওয়াসার নানা প্রকল্পের মোট ৩ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। দুর্নীতির বিষয়ে আপনার পত্রিকা থেকে যেভাবে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, তাতে মনে হয়, আপনাদের কাছে উপযুক্ত প্রমাণ আছে। দুর্নীতির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতকল্পে ও সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে প্রমাণাদি অত্যন্ত জরুরি। এমতাবস্থায় আপনাদের কাছে যদি ঢাকা ওয়াসার বিভিন্ন প্রকল্পের দুর্নীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের প্রমাণাদি থাকে, তবে তা সরাসরি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বরাবর লিখিত আকারে প্রদান করার জন্য বিনীতভাবে অনুরোধ করা হলো। নগরবাসীর সুষ্ঠু সেবাদানের স্বার্থে বিষয়টি জরুরি বলে বিবেচনা করবেন।'

আদালতের রায়ের সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার এ ধরনের উদ্যোগকে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন অনেকেই। ঢাকা ওয়াসা বোর্ডের সদস্য ও বিএফইউজে-বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব দীপ আজাদ সমকালকে বলেন, 'ওয়াসা এ ধরনের বিজ্ঞপ্তি কখনোই দিতে পারে না। তারা চাইলে প্রতিবাদপত্র দিতে পারে। ওই গণমাধ্যম সেটা প্রকাশ না করলে প্রয়োজনে প্রেস কাউন্সিলে যেতে পারে।'

সাবেক প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক ড. গোলাম রহমান বলেন, 'কোনো সুনির্দিষ্ট প্রতিবেদনের বিষয়ে ওয়াসা চাইলে প্রতিবাদপত্র দিতে পারে। যৌক্তিক মনে করলে পত্রিকাটি ছাপতে পারে। আবার অযৌক্তিক মনে করলে নাও ছাপতে পারে। ওয়াসার আহ্বানে কোনো পত্রিকা সাড়া দিয়ে প্রমাণাদি দিতেও পারে। এখানে দেখতে হবে, তারা কোনো প্রতিবাদপত্র দিয়েছিল কিনা।'

ঢাকা ওয়াসা ও সংস্থার এমডি তাকসিম এ খানকে নিয়ে প্রথম সারির গণমাধ্যমে যেসব নেতিবাচক বা অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিবেদন সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে, সেসব প্রতিবেদনের কোনো প্রতিবাদপত্র ঢাকা ওয়াসা পাঠায়নি।

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত ২৬ অক্টোবর ঢাকা ওয়াসা ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে। প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে গণমাধ্যমে যেসব অনিয়ম-দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলো তদন্ত করে ওই কমিটিকে ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

ওয়াসার এক কর্মকর্তা বলেন, যাঁদের দিয়ে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে তাঁদের মধ্যেই কয়েকজন আছেন এসব দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ঢাকা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মিজানুর রহমান সমকালকে বলেন, 'বিভিন্ন পত্রিকায় কেন এসব প্রতিবেদন হচ্ছে, প্রতিবেদনে কী আছে, আমরা সেগুলো পর্যালোচনা করব।'

এ ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খানের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে ঢাকা ওয়াসার মুখপাত্র এ এম মোস্তফা তারেক বলেন, 'আপনারা যারা প্রতিবেদন লেখেন, তাঁরা একটি বেজ ধরে আগান। যদি প্রমাণ থাকে, তাহলে আমরা সহজেই চিহ্নিত করতে পারব। এ জন্য আপনাদের সহযোগিতা চেয়েছি।'

আরও পড়ুন

×