রাজধানী

দুই মেয়রের এক মাস

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০১৫     আপডেট: ১৫ জুন ২০১৫      

অমিতোষ পাল

ঢাকার নবনির্বাচিত দুই মেয়রের কাজে আশান্বিত হচ্ছেন রাজধানীর মানুষ। এ সময়ে দক্ষিণের মেয়র যেমন চেষ্টা করেছেন প্রত্যেকটি সড়কবাতির আলো নিশ্চিত করতে, তেমনি উত্তরের মেয়র বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে দেখেছেন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্র। চেষ্টা করেছেন নগরীকে পরিচ্ছন্ন রাখতে। আবার সুন্দরবন হোটেলের পাশের দেয়াল ধসের দুর্ঘটনায় দুই মেয়রই ছুটে গেছেন সেখানে। জলাবদ্ধতার সময়েও তাদের দেখা গেছে রাজপথে নামতে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূল্যায়নের জন্য এক মাস সময় কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। তবে এ সময়ে তাদের মধ্যে ভালো কাজ করার চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে। যদিও দু'জনই বলছেন কাজের মূল্যায়নের এক মাস সময় যথেষ্ট নয়। এ জন্য তাদের সময় দেওয়া প্রয়োজন।

উত্তরের মেয়র আনিসুল হক সমকালের কাছে প্রসঙ্গটি তুলতেই তিনি হেসে বলেন, 'এক মাস দায়িত্ব পালন করে ফেললাম?' পরে তিনি বলেন, 'মেয়র হিসেবে ৩০ দিনের কার্যকাল খুবই স্বল্প সময়। মন্তব্য করার জন্য এটা যথেষ্ট নয়। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। নগরবাসীর জন্য কী কী উদ্যোগ নিলাম বা কী করলাম, সেটা জানাতে ২০১৬ সালের ১ জানুয়ারি মন্তব্য করব।'

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন সমকালকে বলেন, অনেক আর্থিক দৈনদশা রয়েছে। এর মধ্য দিয়েও ভালো কিছু করার চেষ্টা করছি। তবে মন্তব্য করার মতো সময় এখনও হয়নি।

উন্নয়ন সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেন, মন্তব্য করার জন্য এক মাস সময় বেশি কিছু নয়। এ সময়ে তাদের কাজ সম্পর্কে বুঝতে হবে। অফিস সম্পর্কে বুঝতে হবে। তার পরও ১০০ দিনের একটি কার্যক্রম তারা হাতে নিতে পারতেন। ওই সময়ের পরে বলা যেত তারা কী করলেন।

গত ৬ মে দুই মেয়র শপথ নিলেও আনিসুল হক ও উত্তরের ওয়ার্ড কাউন্সিলররা দায়িত্ব পালন শুরু করেন ১৪ মে থেকে। আর সাঈদ খোকন ও দক্ষিণের কাউন্সিলররা শুরু করেন ১৭ মে থেকে। এ হিসেবে গতকাল এক মাস পূর্ণ করেছেন আনিসুল হক ও উত্তরের কাউন্সিলররা। বুধবার এক মাস পূর্ণ করবেন সাঈদ খোকন ও দক্ষিণের কাউন্সিলররা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই সময়ে দু'জন মেয়রই নগরীর বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে তৎপরতা দেখিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে তারা মাঠেও নেমেছেন। এলাকাবাসীর সমস্যার কথা শুনেছেন। দু-চারটি সমস্যার সমাধানও করেছেন। দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও কাজে গতি এসেছে। দুর্নীতির ব্যাপারেও তারা এখন অনেকটা সজাগ।

উত্তর সিটি করপোরেশন:  উত্তর এলাকার সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছেন আনিসুল হক। পাশাপাশি তার দেওয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বিষয়ও তিনি মাথায় রাখছেন। ঠিকাদারি কাজের দুর্নীতি-অনিয়ম রোধে সব টেন্ডার প্রক্রিয়া অনলাইনে চালু করা হয়েছে। প্রকৌশলীদের মাধ্যমে ঠিকাদারদের কাছে বার্তা পেঁৗছে দেওয়া হয়েছে, প্রয়োজনে বেশি মূল্যে উন্নয়ন কাজ বরাদ্দ নেওয়ার, কিন্তু কাজের মান যেন খারাপ না হয়। বছর ঘুরতেই যেন রাস্তা ভেঙে তছনছ হয়ে না যায়। বেশ কয়েকটি এলাকার রাস্তা সরেজমিনে ঘুরেও দেখেছেন আনিসুল হক।

রাজধানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়নে মেয়র নিজে মিরপুর, উত্তরা, গুলশান ও বনানীর বিভিন্ন ওয়ার্ড পরিদর্শন করেছেন। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ৭২টি ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন তিনি। এ জন্য জমি খোঁজার কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনেরও উদ্যোগ নিয়েছেন। এ কাজে চীন অর্থ সহায়তা দেবে বলে জানিয়েছেন আনিসুল হক।

নগরবাসীর অভিযোগ ছিল, সিটি করপোরেশন এতই নিম্নমানের বাতি রাস্তায় লাগায় যে, দু-চার দিনের মধ্যেই বাতিগুলো ফিউজ হয়ে যায়। মিরপুর এলাকায় গিয়ে নগরবাসীর কাছ থেকে এমন অভিযোগ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজনকে মানসম্মত বাতি লাগানোর নির্দেশ দেন। স্বাস্থ্য বিভাগকে বলেছেন, মশার যন্ত্রণার অভিযোগ যেন আর নগরবাসীর কাছ থেকে তাকে শুনতে না হয়। প্রয়োজনে মশার ওষুধ ও স্প্রে মেশিন কেনার জন্য বরাদ্দ বাড়িয়ে দেওয়া হবে। কেউ দুর্নীতি করলে সে ব্যাপারেও তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, দুর্নীতি করলে দু-তিন বছর পর ফাইলপত্র নিয়ে সেগুনবাগিচায় দুদক অফিসে ঘোরাঘুরি করতে হবে। আর তিনি চাকরি খেলে স্বয়ং শেখ হাসিনা ছাড়া কেউ চাকরি ফিরিয়ে দিতে পারবেন না।

ফরমালিন বা রাসায়নিকযুক্ত পণ্য বাজারে বিক্রি হচ্ছে কি-না সে জন্য প্রত্যেকটি ওয়ার্ডের কাউন্সিলরকে আহ্বায়ক করে বাজার মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে আরেকটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। বাজারে নির্ধারিত মূল্যে পণ্য বিক্রি হচ্ছে কি-না সেটাও তারা দেখাশোনা করবেন।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল স্থাপনের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির কাজ হবে উদ্যোক্তা ও জায়গা খুঁজে বের কর। পুরো শহরকে সিসিটিভির আওতায় আনার জন্য ঢাকা মেট্রোপলিন পুলিশকে নিয়ে নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটি, নগরবাসীর অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য নিষ্পত্তি কমিটি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন কমিটি, স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ও জবাইখানা কমিটি, পার্ক ও লেক উন্নয়ন কমিটি, বস্তি উন্নয়ন কমিটি, নগর বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে সবুজায়ন কমিটি, যানজট নিরসন কমিটি, বিলবোর্ড কমিটি, অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিতকরণ কমিটি গঠনসহ এ রকম আরও বেশ কিছু কমিটি গঠন করে দিয়েছেন মেয়র। এসব কমিটি এরই মধ্যে কাজও শুরু করে দিয়েছে বলে জানা গেছে।

ঢাকা উত্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সমকালকে জানান, নতুন মেয়র যেভাবে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর তৎপরতা চালাচ্ছেন, সেটা করতে গিয়ে তারাও হিমশিম খাচ্ছেন।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশন: গত শবে বরাতের রাতের আগেই দক্ষিণ এলাকার শতভাগ সড়কবাতি সংযোজনের ওয়াদা দিয়েছিলেন মেয়র সাঈদ খোকন। সেই সময়ের আগেই বিদ্যুৎ বিভাগের লোকেরা সেটা করতে পেরেছেন। এ ছাড়া বেশ কয়েকটি ওয়ার্ডে এরই মধ্যে তিনি বিনামূল্যে ওয়াইফাই চালু করেছেন। আজিমপুর কবরস্থানকে আরও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডকে পরিচ্ছন্ন রাখতে মেয়রও মাঝে মাঝে বিভিন্ন স্থানে সরেজমিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিদর্শন করছেন। নগরবাসীকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সচেতন করতে একটি র‌্যালিও করেছেন।

পাশাপাশি প্রত্যেকটি হোল্ডিংয়ের মালিককে প্লাস্টিকের ব্যাগ দেওয়ার প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ওই ব্যাগে বর্জ্য ঢুকিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে তা ফেলতে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করছে ডিএসসিসি। শিগগিরই নগরবাসীর হাতে এই ব্যাগ পেঁৗছে দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। মশা নিধনের জন্য বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম হাতে নেওয়া হয়েছে। যানজট নিরসনের জন্য মেট্রোপলিটন পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করে ডিজিটাল সিগন্যাল পদ্ধতি চালু করে যানজট নিরসনের চেষ্টা চলছে। বুড়িগঙ্গার নাব্যতা ও পানির মান ভালো করার জন্য বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মেয়র। বিশ্বব্যাংক এ খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী। অবৈধ হকারমুক্ত করতে ইতিমধ্যে গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকায় অভিযান চালিয়েছে ডিএসসিসি।

দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা ও নির্ধারিত তালিকা অনুযায়ী পণ্য বিক্রির জন্য বাজার মনিটরিং কমিটি গঠন করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকও হয়েছে মেয়রের। নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে করণীয় নির্ধারণে ঢাকা ওয়াসার সঙ্গেও বৈঠক করেছেন মেয়র। শাহবাগে একটি ফুটওভারব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাস্তার পাশে খাবার বিক্রেতাদের মধ্যে ১০০টি স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গাড়ি উপহার দিয়েছেন। রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্যও তাগিদ দিয়ে যাচ্ছেন। মাঝে মাঝেই তিনি রাজস্ব বিভাগের লোকজনের সঙ্গে বৈঠক করছেন।