রাজধানীর খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মতিঝিলের আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে চলতি শিক্ষাবর্ষে বিভিন্ন শ্রেণিতে এক হাজার ৯৮১ ছাত্রছাত্রী অতিরিক্ত ভর্তি করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের মতিঝিল মূল ক্যাম্পাসসহ বনশ্রী ও মুগদা শাখা মিলিয়ে বিভিন্ন শ্রেণিতে এ বছর মোট ভর্তি করা হয় ৬ হাজার ৫৮৫ জনকে। তাদের মধ্যে মেধায় ভর্তি হয়েছে ৪ হাজার ৬০৪ জন। বাকি ১ হাজার ৯৮১ জনকে অবৈধভাবে ভর্তি করা হয়। চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি গভর্নিং বডির বিশেষ সভায় এসব ভর্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) এক তদন্তে অতিরিক্ত ভর্তিতে অনিয়মের এ চিত্র উঠে এসেছে। অভিভাবকদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই এ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভর্তি বাণিজ্যের অভিযোগ করা হচ্ছিল। চলতি বছরও এ অভিযোগ ওঠার পর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মাউশির দুই কর্মকর্তা আইডিয়াল স্কুলে সরেজমিন তদন্ত করেন। তদন্তকারী কর্মকর্তারা হলেন_ মাউশির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন উইংয়ের (সেসিপ) উপপরিচালক মো. ওসমান

ভূঁইয়া ও উপপরিচালক (ফিন্যান্স অ্যান্ড প্রকিউরমেন্ট) মোহাম্মদ তাজিব উদ্দিন। গত ২৫ জুন তারা তদন্ত করে মাউশির মহাপরিচালকের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। এরপর মহাপরিচালক সেটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক শাখায় পাঠিয়ে দেন। গতকাল বুধবার এ প্রতিবেদন সমকালের হাতে এসেছে।

এ বিষয়ে তদন্ত দলের প্রধান মাউশির উপপরিচালক ওসমান ভূঁইয়া এ নিয়ে সমকালের কাছে মুখ খুলতে চাননি। আরেক কর্মকর্তা তাজিব উদ্দিন মাউশি থেকে গোপালগঞ্জে বদলি হয়েছেন।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি বছর আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিটি শাখায় অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। ২০১৫ সালে সব শাখা মিলে এ বিদ্যালয়ে ২ হাজার ১৭৪ জনকে ভর্তি করা হয়েছিল। এ বছর সেই তুলনায় ২ হাজার ৪৩০ জন ছাত্রছাত্রী বেশি ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কোনো লটারি বা পরীক্ষা নেওয়া ছাড়াই সরাসরি ১৯৮১ জনকে ভর্তি করা হয়েছে। এই শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকে প্রথম শ্রেণিতে লটারিতে হেরে গিয়েও পরে ভর্তি হতে পেরেছে। অভিভাবকদের দাবি, কিছু তদবিরে আর বাকি পুরোটাই অর্থের বিনিময়ে বাড়তি এই ভর্তি করা হয়েছে।

মাউশির তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি বছর মেধার বাইরে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতিঝিল মূল ক্যাম্পাসে (বাংলা মাধ্যমে) ৪৩৯ জন, মতিঝিল মূল ক্যাম্পাসে (ইংরেজি মাধ্যমে) ২২৭ জন, বনশ্রী শাখায় বাংলা মাধ্যমে ৫৬৩ জন, বনশ্রী শাখায় ইংরেজি মাধ্যমে ২৫৭ জন এবং মুগদাপাড়া শাখায় ৪৯৫ জন ছাত্রছাত্রী অতিরিক্ত ভর্তি করা হয়। এই মোট ১ হাজার ৯৮১ জনকে অতিরিক্ত ভর্তি করতে গভর্নিং বডির (বিশেষ কমিটি) চলতি বছর ৬ জানুয়ারির সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ওই সভার সিদ্ধান্তে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন শাখায় কিছু সংখ্যক আসন খালি থাকার বিষয় বিবেচনা করে ১৯৮১ জন অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ভর্তির সময় শিক্ষার্থীপ্রতি বাংলা মাধ্যমে আট হাজার এবং ইংরেজি মাধ্যমে ১০ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির স্কুল শাখায় সর্বমোট ২০ হাজার ২৩৯ জন ছাত্রছাত্রী ও কলেজ শাখায় (শুধু মেয়েদের) প্রায় ৫ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। ২৫ হাজার ছাত্রছাত্রীর এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীর সংখ্যা ৬৫২ জন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঐতিহ্যবাহী এ প্রতিষ্ঠানে পঞ্চম, অষ্টম ও এসএসসির ফল ভালো হওয়ায় স্কুল পর্যায়ে ভর্তির অতিরিক্ত চাপ বেড়েছে। ছাত্র এবং ছাত্রী উভয়ই এখানে অধ্যয়ন করে। এ ধরনের ভর্তির জন্য গভর্নিং বডিকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়।

গভর্নিং বডির কাছে বিভিন্ন পর্যায়ের সুপারিশ আসে। যেমন রাষ্ট্রপতির দপ্তর, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, জাতীয় সংসদের সদস্যবৃন্দ, বিশেষ করে এই স্কুলের মূল ক্যাম্পাসসহ অপর দুটি শাখা তিনটি নির্বাচনী এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় এসব নির্বাচনী এলাকার জনপ্রতিনিধি, মন্ত্রীবৃন্দ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, বোর্ডসহ বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি-বেসরকারি উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাবৃন্দ, রাজনৈতিক ব্যক্তি, সাংবাদিক, সুশীল সমাজ ইত্যাদি পর্যায় থেকেও ভর্তির সুপারিশ এবং চাপ রয়েছে।

অভিভাবক ফোরামের বক্তব্য :অতিরিক্ত এই ভর্তিতে ব্যাপক বাণিজ্যের অভিযোগ করে আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ অভিভাবক ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু সমকালকে বলেন, কিছু তদবিরে ভর্তি হতে পারে, তবে বেশিরভাগই নগদ টাকার বিনিময়ে ভর্তি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে লাখ লাখ টাকা হাতবদল হয়েছে। পরিচালনা কমিটির সদস্যরাই এর জন্য দায়ী। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর ভর্তি বাণিজ্যের কারণে ব্যাপক দুর্নাম কুড়িয়েছে। আইডিয়াল স্কুলের প্রতিষ্ঠান প্রধানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না নেওয়া হলে এ অপকর্মের ধারা অব্যাহত থাকবে।

অধ্যক্ষের বক্তব্য :এ ব্যাপারে আইডিয়াল স্কুলের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগম বুধবার সমকালকে বলেন, অবশ্যই চলতি বছর অতিরিক্ত কিছু শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়েছে। গভর্নিং বডির অনুমোদনক্রমেই এ ভর্তি করা হয়। অতিরিক্ত ভর্তির কারণ জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বলেন, আর্থিক সংকটে তারা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছিলেন না। শিক্ষক কল্যাণ তহবিলের অর্থ ধার নিয়ে তারা বেতন দিচ্ছিলেন। নতুন বেতন স্কেলে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দিতে তারা হিমশিম খাচ্ছিলেন। এ অবস্থা কাটাতে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। তিনি আরও বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার মাধ্যমিক শিক্ষার দেখভাল করা। তারা ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দেখভাল করবে। অথচ তারা এখন প্রথম শ্রেণির ভর্তি নিয়েও মাথা ঘামাচ্ছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নামে কি আলাদা একটা মন্ত্রণালয় নেই? অধ্যক্ষ বলেন, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে মেধার বাইরে একজন শিক্ষার্থীও এ বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়নি। চলতি বছর মুগদা ও বনশ্রী শাখায় নতুন ভবন নির্মাণ করার কারণে কিছু অতিরিক্ত ভর্তি করা হয়।

ড. শাহান আরা বেগম আরও বলেন, এখানে নাকি পড়াশোনা হয় না। তাহলে ভর্তির জন্য সবাই আসেন কেন? মাউশি যে তদন্ত করল, তারা কি এখানে ভর্তির জন্য তদবির করেন না? মহাপরিচালক নিজে তার পিএর ছেলেকে ভর্তি করাতে টেলিফোন করেছিলেন।

এ ব্যাপারে মাউশি মহাপরিচালক প্রফেসর ড. এস এম ওয়াহিদুজ্জামানের বক্তব্য জানতে তার কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে জানা যায়, তিনি কানাডায় একটি সরকারি সফরে রয়েছেন।

শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ মালয়েশিয়ায় এবং শিক্ষা সচিব এস এম সোহরাব হোসাইন চীন সফরে থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

২০১২ সালে প্রকাশিত টিআইবির এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ভর্তি বাণিজ্যের বিষয়টি উঠে আসে। 'প্রাথমিক শিক্ষায় দুর্নীতি প্রতিরোধ :বাংলাদেশে সামাজিক দায়বদ্ধতার কার্যক্রম' শীর্ষক এ প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ভর্তি বাণিজ্য মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। রিপোর্টে বলা হয়, ৬৬ শতাংশ উত্তরদাতা বলেন, সন্তানকে প্রথম শ্রেণিতে (৫-৭ বছর বয়স) ভর্তিকালে তাদের নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ দিতে হয়েছে। ২০.৩ শতাংশ উত্তরদাতা জানান, পাঠ্যবই পাওয়ার জন্যও তাদের নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ দিতে হয়েছে।

মন্তব্য করুন