আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে ‌'১১তম নাসরীন স্মৃতি পদক ২০১৭' পেলেন গাইবান্ধার অঞ্জলী রাণী দেবী, বুলবুলি বেগম ও কুড়িগ্রামের ফিরোজা খাতুন। যৌন হয়রানি ও বাল্যবিবাহ বন্ধ এবং ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা—এই তিন শ্রেণিতে তাদের এই সম্মাননা প্রদান করা হয়।
 
পরে ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলের পরিচালনায় 'বিউটি রিডিফাইন্ড' শিরোনামে এসিড সহিংসতার শিকার নারীদের অংশগ্রহণে বর্ণাঢ্য ফ্যাশন শো অনুষ্ঠিত হয়।
 
মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে এই পদক অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ।
 
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া স্টিফেন ব্লুম বার্নিকাট, মাইক্রোসফট বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোনিয়া বশির কবীর এবং আয়োজক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আসগর আলী সাবরী প্রমুখ।
 
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন 'নাসরীন স্মৃতি পদক' জুরি বোর্ডের সদস্য ইউবিকো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এস এম আকবর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহনাজ হুদা, ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, ডিবিসি চ্যানেলের সম্পাদক নবনীতা চৌধুরী ও একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন নাসরীন পারভীন হকের বড় বোন শিরীন হক, অভিনয় শিল্পী সূবর্না মোস্তাফা প্রমুখ।
 
বক্তারা জানান, ২০০৬ সাল থেকে অ্যাকশনএইড যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত স্থাপন, ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা (যিনি অন্য নারীদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন) এবং বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সোচ্চার নারীদের এই সম্মাননা প্রদান করে আসছে।
 
তারা জানান, ২০১৭ সালে ৩টি বিষয়ে ১৮টি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে।
 
১৯৫৮ সালের ১৮ নভেম্বর নাসরীন পারভীন হক জন্মগ্রহণ করেন। প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল হক ও কবি জায়েদা খাতুনের ছোট সন্তান তিনি। বিশিষ্ট কলাম লেখক ও সাংবাদিক নুরুল ইসলাম ভুূঁইয়া তার জীবনসঙ্গী, তাঁদের একমাত্র কন্যা জামিলা।
 
নাসরীন হক ছিলেন একাধারে একজন নিবেদিতপ্রাণ উন্নয়নকর্মী, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম কাণ্ডারি, পরিবেশ আন্দোলনের সাহসী সৈনিক, বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় জাতিসত্তার মানুষের অধিকার বাস্তবায়নের পথিকৃৎ, এসিড সহিংসতার শিকার নারীর অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করার সংগ্রামে অগ্রদূত, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ ও নারী-পুরুষ বৈষম্য দূরীকরণে বলিষ্ঠ নেতৃত্বদানকারী। তার উদ্যোগের সূত্রে পরবর্তী সময়ে তৈরি হয়েছে 'এসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশন'।
 
এসিড আক্রমণের শিকার নারীকে আলোয় আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন নাসরীন হক। তিনিই  প্রথম এসিড সন্ত্রাসের শিকার নারীদের জনসম্মুখে নিয়ে আসেন এবং তাদের নিয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত যান। এসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রথম স্বতন্ত্র আইন যা ২০০১ সালে প্রণীত হয়, তার পেছনে যিনি সবচেয়ে বেশি কাজ করেছেন, তিনি হলেন নাসরীন হক। এসিড সারভাইভারদের তিনি নিয়ে গড়ে তোলেন পঞ্চম সুর নামের একটি সংগঠন।
 
প্রতিবন্ধী নারীর জন্যে বিশেষ সুযোগ সৃষ্টিতে তার নিরলস প্রচেষ্টা ও অবদানও কম নয়। ২০০৩ সালে তিনি অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দেন। তিনিই অ্যাকশনএইডে প্রথম অধিকারভিত্তিক প্রয়াসের মাধম্যে উন্নয়ন ইস্যুকে দেখার কাজ শুরু করেন। আদিবাসী ইস্যুতেও তার কাজ ও অবদান ছিল ব্যাপক। যেকোন ইস্যু নিয়ে কাজ করতে গিয়ে নারীকে রাখতেন কেন্দ্রবিন্দুতে। গোলাপী ফিতা বেঁধে অক্টোবর মাসে স্তন ক্যান্সার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো ছিল নাসরীন হকের আরেকটি প্রয়াস।
 
এ ছাড়া তামাক বিরোধী আন্দোলন, টানবাজার থেকে যৌনকর্মীদের উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলন, এইচআইভি পজেটিভদের নিয়ে কাজ, নারী ও শিশু পাচার নিয়ে সংসদীয় পর্যায়ে কাজ করা, নারীর ওপর যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ, অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় কাজ, কর্মজীবী নারীদের শিশু রক্ষণাবেক্ষণ সবই ছিল তার আন্দোলনের বিষয়। দত্তক ও নাগরিকত্ব নিয়ে আইন সংস্কারের জন্যেও নাসরীন হক কাজ করেছিলেন।
 
২০০৬ সালের ২৪ এপ্রিল গাড়ি দুঘর্টনায় তিনি মারা যান।

বিষয় : নাসরিন স্মৃতি পদক

মন্তব্য করুন