রাজধানী

ওয়ারীতে ১১০ কোটি টাকার সম্পত্তি

এক জমি বিক্রির বায়না আটজনের কাছে!

প্রকাশ: ১৩ জানুয়ারি ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ইন্দ্রজিৎ সরকার

অভিযুক্ত জিন্নাত আলী বেবী

রাজধানীর ওয়ারী এলাকায় ২.২৩৭ একর জমি কেনার জন্য বিক্রেতা জিন্নাত আলী বেবীর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিলেন ব্যবসায়ী শাহ আলম। জমির দাম ঠিক হয়েছিল ১১০ কোটি দুই লাখ টাকা। জমি কেনার জন্য বায়না হিসেবে ১০ কোটি টাকাও দেন শাহ আলম। কিন্তু বেবী বায়না দলিল রেজিস্ট্রি করে না দিয়ে টালবাহানা শুরু করেন। নিরুপায় হয়ে একপর্যায়ে আদালতে যান ভুক্তভোগী। পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে থলের বিড়াল। জানা যায়, সাবেক সচিবের মেয়ে বেবী একই জমি বিক্রির কথা বলে আরও অনেকের কাছ থেকেই অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। শাহ আলমসহ এমন অন্তত আটজন ক্রেতার খোঁজ মিলেছে, যাদের কাছ থেকে মোট ১১ কোটি ৪১ লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ঢাকা মহানগর অঞ্চলের বিশেষ পুলিশ সুপার আবুল কালাম আজাদ সমকালকে বলেন, জমি বিক্রির নামে বাদীর সঙ্গে প্রতারণা করেছেন বেবী। বায়না বাবদ দেওয়া টাকা ফিরে পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন শাহ আলম।

মামলাটির তদন্ত শেষ পর্যায়ে। শিগগিরই আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।

তদন্ত সূত্র জানায়, অভিযুক্ত জিন্নাত আলী বেবীর বাবা প্রয়াত শেখ মোহাম্মদ আলী সচিব ছিলেন। উত্তরাধিকার সূত্রে বেবী তার বাবার সম্পত্তি পান। ওয়ারী থানা এলাকার ওই জমিতে বাড়ি ও সেমিপাকা পুরনো টিনশেড ঘর রয়েছে। ব্যবসায়ী আলমের কাছে বেবী এই সম্পত্তি বিক্রির প্রস্তাব দেন। এ নিয়ে আলোচনার পর দু'জনের মধ্যে চুক্তিও হয়। তাতে বলা হয়, সম্পত্তির বায়না দলিল করার দুই বছরের মধ্যে ১০০ কোটি দুই লাখ টাকা পরিশোধ করলে সাফ কবলা দলিল ক্রেতাকে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। এরপর ২০১৮ সালের ১৬ এপ্রিল সাক্ষীদের উপস্থিতিতে বায়না বাবদ ১০ কোটি টাকা দেন বাদী। এ সময় ৩০০ টাকার নন-জুডিসিয়াল স্ট্যাম্পে বায়নানামা দলিল তৈরি হয়। তবে বেবী হঠাৎ জানান, সম্পত্তির মূল কাগজপত্র রেজিস্ট্রি অফিসে নিয়ে যেতে ভুলে গেছেন। কিন্তু মূল কাগজপত্র ছাড়া রেজিস্ট্র্রি সম্ভব নয় বলে জানিয়ে দেন সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তা।

এ পর্যায়ে বেবী মৌখিকভাবে অঙ্গীকার করেন, ২০ এপ্রিল যাবতীয় কাগজপত্র এনে দলিল নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন। কিন্তু পরে তার দেখা পাওয়াই মুশকিল হয়ে পড়ে। 'আজ নয় কাল' বলে তিনি সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন। শাহ আলম তার পাওনা টাকা পরিশোধ, না হয় জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার জন্য বারবার তাগাদা দিলেও বেবী সাড়া দেননি। এ অবস্থায় গত বছরের ৮ মে টাকা ফেরত চেয়ে লিগ্যাল নোটিশ পাঠান শাহ আলম। নোটিশ পাওয়ার পরও বেবী টাকা পরিশোধ করেননি এবং কবে করবেন সে বিষয়েও কিছু জানাননি। এরপর ২৫ মে বাদী নিজে তার বাড়িতে গিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার কথা বলেন। তখন বেবী স্পষ্ট জানান, তিনি জমি দেবেন না, টাকাও ফেরত দিতে পারবেন না।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইর এসআই মাসুদ খান সমকালকে বলেন, জিন্নাত আলী বেবী তার প্রয়াত বাবার পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে বেশ কয়েকজনের কাছে একই জমি বিক্রির কথা বলে বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নিয়েছেন। মামলার বাদীর কাছ থেকেও তিনি ১০ কোটি টাকা নেন। এ ছাড়া কামাল হোসেনের কাছ থেকে ১৬ লাখ, হাবিবুল হুদার কাছ থেকে ১০ লাখ, সৈয়দ মাহবুবুর রহমানের কাছ থেকে পাঁচ লাখ, শরীফ ও চান্দুর কাছ থেকে পাঁচ লাখ, বাবুলের কাছ থেকে পাঁচ লাখ ও বদরুল হাসানের কাছ থেকে এক কোটি টাকা নেন বেবী। এসব প্রতারণার ঘটনায় তার বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় ২০১৭ সালের ২৩ জুলাই তার সাজা হয়। তবে তখন তিনি 'পলাতক' থাকায় সাজা কার্যকর হয়নি।

মামলার বাদী শাহ আলম ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বেশিরভাগ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করেন। তার পক্ষে বিষয়টি দেখভাল করেন তার খালাতো ভাই শাহ জালাল। তিনি বলেন, বেবী তার বাবার পরিচয় দিয়ে নিজেকে বিপদগ্রস্ত দাবি করে জমি বিক্রির জন্য শাহ আলমের কাছে আসেন। তখন তার বৃদ্ধ মাও সঙ্গে ছিলেন। ফলে তার প্রতারণার উদ্দেশ্য থাকতে পারে বলে মনে হয়নি; কিন্তু টাকা নেওয়ার পর বেবীর ভিন্ন রূপ দেখা যায়।

অভিযোগের ব্যাপারে জানতে বেবীর আজিমপুরের ঠিকানায় গিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। ওই বাড়ির বাসিন্দারা জানান, বেশিরভাগ সময় তিনি বাড়িতে থাকেন না। তার নামে মামলা থাকায় তিনি 'অন্য কোথাও' থাকেন।

এই মামলার বাদীপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জে গ্রেফতার হওয়ার পর বেবী কারাগারে রয়েছেন।

বিষয় : ওয়ারী কোটি টাকার সম্পত্তি রাজধানী জমি বিক্রি