ঢাকা বুধবার, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

দুর্ভোগের আরেক নাম সমিতির 'চেক পয়েন্ট'

রাজধানীতে বাসে চড়লেই ২০ টাকা!

দুর্ভোগের আরেক নাম সমিতির 'চেক পয়েন্ট'

রাশেদ মেহেদী

প্রকাশ: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ১৯:২৯

রাজধানীর গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা ও যাত্রীদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। যার অন্যতম কারণ মালিক সমিতির 'চেক পয়েন্ট' ব্যবস্থা। বাস ভাড়া দ্বিগুণের বেশি করার কৌশল হিসেবে এই 'চেক পয়েন্ট' ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে মূলত গত অক্টোবর থেকে। এ ব্যবস্থা কার্যকর করে বিভিন্ন লোকাল বাসে সিটিংয়ের নামে সর্বনিম্ন ২০ টাকা ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। অবশ্য সমিতির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হচ্ছে, এভাবে ভাড়া আদায়ের ব্যাপারে তারা কিছু জানেন না।

এই 'চেক পয়েন্ট' ব্যবস্থার কারণে যাত্রীকে নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই অস্বাভাবিক বাড়তি ভাড়া গোনার আশঙ্কায় বাস থেকে নেমে যেতে হচ্ছে। কারণ চেক পয়েন্ট পেরিয়ে যে কোনো দূরত্বে নামার জন্য নতুন করে আবারও ২০ টাকা আদায় করা হচ্ছে যাত্রীদের কাছ থেকে। এসব বাসে যাত্রীদের টিকিটও দেওয়া হয় না। গায়ে সিটিং সার্ভিস লেখা থাকলেও প্রায় সব বাসেই দাঁড়িয়ে, এমনকি ইঞ্জিন কাভারের ওপর গাদাগাদি করে লোক নেওয়া হচ্ছে।

চেক পয়েন্ট ব্যবস্থা রাস্তায় সিটিং সার্ভিস বাসগুলোর বেপরোয়া প্রতিযোগিতা আরও বাড়িয়েছে। কোন বাস আগে চেক পয়েন্টে যাবে, তা নিয়ে চালকদের মধ্যে চলছে রেস।

বাড়তি ভাড়া গুনছে যাত্রীরা :পরিবহন শ্রমিকরা বলছেন, মালিক সমিতির নতুন নিয়ম অনুযায়ী প্রতি কিলোমিটার হিসাবের পরিবর্তে এখন বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হচ্ছে 'চেক পয়েন্ট টু চেক পয়েন্ট' হিসেবে। প্রতিটি রুটকে আট থেকে দশটি চেক পয়েন্টে ভাগ করেছে সমিতি। এক চেক পয়েন্ট থেকে পরের পয়েন্টের সর্বনিম্ন ভাড়া ২০ টাকা। যাত্রীর গন্তব্য নয়- বাস কয়টি চেক পয়েন্ট অতিক্রম করল, ভাড়া গুনতে হচ্ছে সে হিসেবে।

যেমন, উত্তরা-মতিঝিলের বাস শতাব্দী পরিবহনে উত্তরা থেকে খিলক্ষেত চেক পয়েন্ট পর্যন্ত ভাড়া ২০ টাকা। এই চেক পয়েন্ট পার হলেই যাত্রীকে পরবর্তী চেক পয়েন্টের ভাড়া বা আরও ২০ টাকা দিতে হবে। অর্থাৎ কোনো যাত্রী খিলক্ষেত পার হয়ে কুড়িলে নামলেও তাকে ৪০ টাকা ভাড়া দিতে হবে। আবার খিলক্ষেত থেকে তিব্বত চেক পয়েন্ট পর্যন্ত ভাড়া ২০ টাকা। তাই তিব্বত পার হয়ে সাত রাস্তা নামতে হলেও যাত্রীকে ৪০ টাকা ভাড়া দিতে হবে। কোনো যাত্রী এভাবে ভাড়া দিতে না চাইলে সোজা গাড়ি থামিয়ে রাস্তার মাঝখানেই নামিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, রাজধানীতে এখন আর একটিও লোকাল বাস সার্ভিস নেই। সব রুটের সব বাসই এখন 'চেক পয়েন্ট' ব্যবস্থায় কথিত সিটিং সার্ভিসে পরিণত হয়েছে। চেক পয়েন্টগুলোতে একজন চেকার থাকেন। তিনি বাসের ভেতরে উঠে যাত্রীসংখ্যা গুনে একটি ওয়ে বিলে স্বাক্ষর করেন। মনজিল পরিবহন নামে একটি বাসে চলাচলের সময় দেখা যায়, বাসে আট থেকে ১০ জন বাড়তি যাত্রী দাঁড়িয়ে ছিলেন। তেজগাঁও এলাকায় পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সামনে চেক পয়েন্টে ওয়ে বিলে চেকার স্বাক্ষর করার সময় এ ব্যাপারে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। কিন্তু তিনি কিছু না বলে স্বাক্ষর করে চলে যান। পরে ভাড়া আদায়কারী পরিবহন শ্রমিক কামরুল তার ভাষায় জানান, 'চেকাররে ১০ ট্যাকা দিছি। কিচ্ছা শ্যাষ।' বাসের যাত্রী অহিদুল সাত রাস্তায় নামতে চাইলে তার কাছে বাড়তি ২০ টাকা ভাড়া দাবি করেন কামরুল। শেষমেশ ১০ টাকা নিয়ে তাকে নামতে দেওয়া হয়।

ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা বেড়েছে :সরেজমিনে ঢাকার বিভিন্ন রুট- যেমন গুলিস্তান থেকে ফার্মগেট হয়ে মিরপুর, উত্তরা থেকে মহাখালী, সাতরাস্তা হয়ে মতিঝিল, আজিমপুর থেকে মানিক মিয়া এভিনিউ হয়ে উত্তরা রুটের বাসগুলোতে ঘুরে সবখানেই এই 'চেক পয়েন্ট' ব্যবস্থা দেখা যায়। একাধিক কোম্পানি তাদের একই রুটে চলাচলকারী বাসের জন্য নির্দিষ্ট দূরত্বে এসব চেক পয়েন্ট স্থাপন করেছে। আইনবহির্ভূত এসব চেক পয়েন্টের কারণে রাস্তায় ট্রাফিক সিগন্যাল ছাড়াই গাড়ি থামছে এবং বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, কারওয়ান বাজার ক্রসিং পার হয়ে হাতিরঝিল রাস্তার মুখে উত্তরা-গুলিস্তান রুটের তিন নম্বর বাসের চেক পয়েন্ট রয়েছে। এখানে একের পর এক তিন নম্বর রুটের বিভিন্ন কোম্পানির বিভিন্ন বাস দাঁড়ানোর কারণে রাস্তায় যানবাহন চলাচল বিঘ্নিত হচ্ছে। এক বাস আরেক বাসকে ওভারটেক করে পথ আগলে দাঁড়াচ্ছে। এতে কারওয়ান বাজার এবং বাংলামটর বাস স্টপেজের মাঝখানে আরও একটি বিশৃঙ্খল পয়েন্টের সৃষ্টি হয়েছে। একইভাবে উত্তরা-মতিঝিল রুটের শতাব্দী পরিবহনের বাস তেজগাঁও এলাকার বিজয় সরণি-তেজগাঁও ক্রসিংয়ের ঠিক আগে চেক পয়েন্টে দাঁড়াচ্ছে। এখানে এমনিতেই প্রায়ই যানজট থাকে। তার মধ্যে নতুন চেক পয়েন্ট বিশৃঙ্খলা আরও বাড়িয়েছে। প্রগতি সরণিতে কোকাকোলা মোড়ের আগে চেক পয়েন্টে থেমে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে রাইদা, আকাশ, সুপ্রভাত, অনাবিল প্রভৃতি পরিবহনের বাস।

সরেজমিনে দেখা যায়, মহাখালী ফ্লাইওভারের ওপর আজিমপুর-উত্তরা রুটে চলাচলকারী বিকাশ পরিবহনের তিনটি বাস বেপরোয়া গতিতে একে অপরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যাচ্ছে। বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়েই তিনটি বাস বিপজ্জনকভাবে ফ্লাইওভারের নিচের চেক পয়েন্টে এসে থামল। কোন বাসে চেকার আগে উঠবেন, তা নিয়েও ঝগড়া করতে দেখা গেল বাসের কন্ডাক্টর ও হেলপারদের।

এ রুটের নিয়মিত যাত্রী রাফি উদ্দিন জানান, এ রুটে বিকাশ এবং ভিআইপি পরিবহন নামে দুটি বাস সার্ভিস আছে। দুটি সার্ভিসেই সর্বনিম্ন ভাড়া ২৫ টাকা। আগে ভিআইপি পরিবহন কাউন্টার ভিত্তিতে টিকিটের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। তখন এর সর্বনিম্ন ভাড়া ছিল ৪০ টাকা। বিকাশ পরিবহনে বাসের ভেতরেই টিকিট দেওয়া হতো। গত অক্টোবর থেকে দুটি বাসেই টিকিট ব্যবস্থা উঠে গিয়েছে। চালু করা হয়েছে এই 'চেক পয়েন্ট' ব্যবস্থা। আগে ভিআইপি সার্ভিসে অপেক্ষাকৃত ভালো বাস ছিল, বাড়তি যাত্রী নেওয়া হতো না। এখন এই সার্ভিসের ভালো বাসগুলো সরিয়ে নিম্নমানের বাস দেওয়া হয়েছে। গাদাগাদি করে যাত্রী নেওয়া হচ্ছে।

উত্তরা-মতিঝিল থেকে মিরপুরের বিভিন্ন রুটে চলাচল করা যাত্রীরা জানান, এই রুটে ভাড়া সবচেয়ে বেশি। বেশিরভাগ বাসেই সর্বনিম্ন ২৫ টাকা ভাড়া, কোনো কোনো বাসে সর্বনিম্ন ৩০ টাকা ভাড়াও নেওয়া হচ্ছে। সরেজমিনে দেখা যায়, মিরপুর থেকে কালসি হয়ে চলাচল করা বসুমতি, প্রজাপতি, পল্লবী সুপার, তেঁতুলিয়া প্রভৃতি পরিবহনের বাসে সর্বনিম্ন ভাড়া ৩০ টাকা। সরেজমিনে 'চেক পোস্ট' ব্যবস্থার একই চিত্র দেখা যায় গ্রগতি সরণি দিয়ে বিভিন্ন রুটে চলাচল করা বাসগুলোতেও।

সংশ্নিষ্টদের বক্তব্য :ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ সমকালকে বলেন, এভাবে চেক পয়েন্ট বসানো বা ভাড়া আদায়ের ব্যাপারে তাদের কোনো কিছু জানা নেই। তিনি বলেন, মালিক সমিতি কোনো ভাড়া নির্ধারণ করে না। ভাড়া অনুমোদন করে বিআরটিএ। সমিতির নির্দেশনা আছে, বিআরটিএ অনুমোদিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া যাবে না। যারা এ নির্দেশ না মেনে নিজেরা নানা ধরনের ব্যবস্থা চালু করে বা অনিয়ম করে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মালিক সমিতি বিআরটিএকে সহায়তা করে থাকে।

আরও পড়ুন

×