পানির 'খনিতে' নেই পানি

ঢাকা ওয়াসার তেঁতুলঝোড়া ভাকুর্তা ওয়েল ফিল্ড প্রকল্পে জলে যাচ্ছে ৫৭৩ কোটি টাকা

প্রকাশ: ২৭ জুন ২০১৯     আপডেট: ২৭ জুন ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

অমিতোষ পাল

ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খান ২০১৭ সালের ২১ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দিয়েছিলেন, 'ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের জন্য সাভারের ভাকুর্তায় একটি পানির খনি পাওয়া গেছে। হিমালয় থেকে একটি চ্যানেল হয়ে ভাকুর্তায় এসে পানি জমা হচ্ছে। গভীর নলকূপের মাধ্যমে সেই খনি থেকে প্রতিদিন ১৫ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করা হবে। পানি উত্তোলন করলেও সেখানে শূন্যতা সৃষ্টি হবে না। হিমালয়ের পানি চ্যানেল দিয়ে এসে শূন্যস্থান ভরাট করবে।'

পানি উত্তোলনের জন্য ঢাকা ওয়াসা ৫৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ওই এলাকায় ৪৬টি গভীর নলকূপ স্থাপন প্রকল্প গ্রহণ করে। এরই মধ্যে ১৫টি নলকূপ চালু হয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে দৈনিক পাঁচ কোটি লিটার পানি উত্তোলনের পরই এলাকায় দেখা দেয় করুণ চিত্র। আশপাশের বাসিন্দাদের সাধারণ নলকূপগুলোতেও পানি ওঠা বন্ধ হয়ে যায়। কিছুদিন পর ওয়াসার গভীর নলকূপগুলোতেও পানির পরিমাণ কমতে থাকে। বর্তমানে প্রতিদিন অল্পস্বল্প পানি উঠছে। এখন ওই এলাকায় চলছে পানির জন্য হাহাকার। ঢাকা ওয়াসার 'তেঁতুলঝোড়া-ভাকুর্তা ওয়েল ফিল্ড' প্রকল্পের পরিচালক নুরুল ইসলাম বলেন, পাম্প থেকে পানি উত্তোলন শুরু হওয়ায় ওই এলাকার অনেক নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে, এটা আমরাও শুনেছি। ওই এলাকার পানির সংকট মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।

তিনি বলেন, শুস্ক মৌসুমে ওই এলাকায় আগেও পানির সংকট হতো। ওয়াসার পাম্প চালু হওয়ায় সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। পুরোদমে চালু হলে কী অবস্থা দাঁড়াবে, সেটা নিয়েও তারা চিন্তাভাবনা করছেন। ওই এলাকায় কিছু টিউবওয়েল করে দেওয়া হবে অথবা পাম্প থেকে এলাকাবাসীকে পানি উত্তোলনের সুযোগ করে দেবেন তারা। এ ছাড়া ওই এলাকায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। নানা দিক নিয়ে ভাবা হচ্ছে। এলাকাবাসীর ভোগান্তি দূর করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।

জানা যায়, ওই এলাকায় পাম্প বসানোর আগে ১৭০ থেকে ২০০ ফুট গভীরতায় পাইপ স্থাপন করলেই ভরপুর পানি উঠত। সেখানে এখন ৩০০ ফুট গভীরেও পানি মিলছে না। ফলে প্রায় ১৫ লাখ

লোক অধ্যুষিত ওই এলাকায় পানির জন্য হাহাকার শুরু হয়েছে।

ওয়াসা জানায়, প্রকল্পটি হাতে নেওয়ার আগে তারা গবেষণা করে পানির খনির অস্তিত্ব পেয়েছিল। এ কাজে সহযোগিতা করেছিল ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং (আইডব্লিউএম)। এ প্রসঙ্গে আইডব্লিউএমের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মনোয়ার হোসেন বলেন, ওয়াসা কীভাবে এটা করল, তার জানা নেই। এটা কি জমজমের কূপ যে যতই পানি নাও, কমবে না। সেখানে কোনো পানির খনি আছে বলেও তার জানা নেই।

এ প্রসঙ্গে পানি বিশেষজ্ঞ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক ম ইনামুল হক বলেন, সেখানে পানি আছে বলে তারও জানা নেই। ওয়াসা কিসের ভিত্তিতে এটা করল, এটা তারাই বলতে পারবে। এখন সেখানে পানি পাওয়া না গেলে এই পুরো প্রকল্পের অর্থই পানিতে যাবে। এই দায় কে নেবে? এর জবাব ওয়াসাকেই দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, পানির স্তর নিয়ে জরিপ করা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু ওয়াসা এটা করেনি। ফলে এ সমস্যা তৈরি হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খানের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে ওয়াসা থেকে জানানো হয়, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য এক মাসের ছুটিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। এ ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কাশেম বলেন, তিনিও বিষয়টি শুনেছেন। এখন তারা চিন্তা করে দেখবেন, কীভাবে সমস্যার সমাধান করা যায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নলকূপের পানি ব্যবহার করে নিত্যপ্রয়োজনীয় কাজ চালানোর পাশাপাশি পশুপালন, শাকসবজি চাষসহ কৃষিকাজ করতেন। ঢাকা ওয়াসার পানি উত্তোলন শুরুর পর তা আর সম্ভব হচ্ছে না।

ভাকুর্তার রাজা মার্কেট এলাকার বাসিন্দা আল আমিন বলেন, 'ওয়াসার পাম্প থেকে পানি ওঠানো শুরু হলে আমাদের টিউবওয়েলে আর পানি উঠছে না। অথচ আমাদের টিউবওয়েলের গভীরতা প্রায় ৩০০ ফুট। এখন চাচাদের ৪০০ ফুট গভীর নলকূপ থেকে পানি নিয়ে প্রয়োজন মেটাচ্ছি।'

ভাকুর্তা বাজার এলাকার বাসিন্দা মো. সেলিম বলেন, 'আমাদের নলকূপের গভীরতা ৩০০ ফুট। চেপে পানি ওঠানো যায় না। তবে মোটরে পানি উঠছে। ৫০০ লিটারের ট্যাঙ্ক ভরতে সময় লাগছে এক ঘণ্টা। অথচ আগে ১০ মিনিটে ভরা যেত।'

তেঁতুলঝোড়ার শ্যামপুরের বাসিন্দা নাজমুল ইসলাম জানান, বাড়িতে ২৪০ ফুটের দুটি টিউবওয়েল রয়েছে। ওয়াসা পানি উত্তোলন শুরু করায় এখন ওই দুটি টিউবওয়েলে পানি উঠছে না। বাসায় ভাড়াটিয়া থাকায় ৪০০ ফুট গভীর করে মোটরচালিত নতুন টিউবওয়েল বসিয়েছেন।

গৃহবধূ ছিনু রানী দাস বলেন, 'আমরা খুবই কষ্টে আছি। কত কষ্টে পানি সংগ্রহ করছি, তা বলে বোঝানো যাবে না। এ বাসা-ও বাসা থেকে বালতি ভরে পানি টানতে টানতে হাত ও কোমরে ঠোসা (ফোসকা) পড়ে গেছে। এভাবে কি চলা যায়? প্রতিদিন অনেক পানি লাগে। রান্নাবান্না, গরুর খাবার তৈরি এবং আঙিনার শাকসবজি বাগানেও পানি দিতে হচ্ছে।'

আরেক বাসিন্দা ঝুনু দাস বলেন, 'আমাদের কষ্ট কেউ দেখছে না। আমাদের এলাকা তো ভালোই ছিল। কখনও পানির কষ্ট করিনি। সরকার এখানে ওয়াসার পাম্প বসিয়ে আমাদের কষ্টে ফেলেছে।' দুই হাতের ফোসকা দেখিয়ে তিনি বলেন, 'দূর-দূরান্ত থেকে পানি টেনে সংসার চালানো আর সম্ভব হচ্ছে না। এভাবে তো জীবন চলছে না।'

সুমা দাস বলেন, '৩০০ ফুট গভীর নলকূপেও পানি উঠছে না। আগে এই টিউবওয়েলের পানি দিয়েই প্রয়োজনীয় কাজ সারতাম। কয়েকটি চাপ দিলেই বালতি ভরে যেত। আর এখন ১২০ বার চাপ দিয়ে একটি ছোট বালতি ভরতে হয়।'

জানা যায়, ওই এলাকায় পানির খনি পাওয়ার দাবি করেই ২০১২ সালের জুন মাসে সাভারের তেঁতুলঝোড়া ও ভাকুর্তা এলাকায় এই গভীর নলকূপ স্থাপনের প্রকল্প হাতে নেয় ওয়াসা। এ জন্য ব্যয় ধরা হয় ৫৭৩ কোটি টাকা। এ প্রকল্পের আওতায় ৪৬টি পাম্প বসানোর কথা। আর পাম্পের পানি শোধনে স্থাপন করা হয় দুটি আয়রন অপসারণ প্ল্যান্ট। এ ছাড়া একটি ভূ-উপরিস্থ জলাধার, একটি অফিস ভবন এবং ৪২ কিলোমিটার পানি সরবরাহ লাইন স্থাপন করা হয়। ২০১৬ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার কথা থাকলেও ওয়াসা তা পারেনি। দুই দফা সময় বাড়ানো হয়।

বিষয় : পানির 'খনিতে' নেই পানি