কেনাকাটার ধুম রাজধানীতে

প্রকাশ: ০১ জুন ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

নাহিদ তন্ময় ও দীপন নন্দী

'নাবিলের মা, রুম্পার ড্রেস কী কালারের কিনব?'- নিউমার্কেটে পা রাখতেই ভেসে এলো কথাটা। চোখে পড়ল কথা বলছেন মধ্যবয়সী এক লোক। ফোনালাপ শেষে কথা হলো তার সঙ্গে। নাম সাঈদ আহমেদ শিপন। বললেন, রাতের ট্রেনে রাজশাহী ফিরবেন। স্ত্রী-সন্তানদের আগেই পাঠিয়ে দিয়েছেন। ঈদের কেনাকাটাও প্রায় শেষ। বাকি কেনাকাটা করতে ছুটে এসেছেন তিনি।

এ দৃশ্য ছিল দুপুরের পরে। যত সহজে 'নিউমার্কেটে পা রাখতেই' শব্দটি লেখা গেছে, ততটা সহজ ছিল না সেখানে প্রবেশ করাটা। ক্রেতার ভিড়ে পা ফেলাই ছিল কঠিন। নিউমার্কেটের মতোই পবিত্র রমজান মাসের শেষ শুক্রবারে গতকাল রাজধানী জুড়ে বিপণিবিতানগুলোয় ছিল ক্রেতার উপচেপড়া ভিড়। শেষ মুহূর্তের কেনাকাটা সারতে রাজধানীবাসী অলিগলির 'কাপড়ের দোকান' থেকে শুরু করে ভিড় জমান অভিজাত বিপণিবিতানগুলোতে। নিউমার্কেট, চাঁদনী চক, গাউছিয়া, এলিফ্যান্ট রোড,  ইস্টার্ন প্লাজা, মৌচাক মার্কেট, ফরচুন শপিংমল, আনারকলি মার্কেট, কনকর্ড টুইন টাওয়ার, ইস্টার্ন প্লাস, নাভানা বেইলি স্টার, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি, ক্যাপিটাল সিরাজ সেন্টার, পলওয়েল মার্কেট, গাজী ভবন, পীর ইয়েমেনী মার্কেট, মগবাজারের বিশাল সেন্টার, শাহবাগের আজিজ সুপার মার্কেট, বসুন্ধরা সিটি শপিংমল, যমুনা ফিউচার পার্ক, গুলশান পিংক সিটি, নাভানা টাওয়ার, কনকর্ড পুলিশ প্লাজা, বঙ্গবাজার, রাজধানী সুপারমার্কেট গতকাল ছিল ক্রেতায় ঠাসা। এ কারণে শুক্রবারের ফাঁকা ঢাকাতেও যানজট ছিল বিপণিবিতানগুলোর সামনে। তবে সন্ধ্যায় হঠাৎ ঝড়-বৃষ্টিতে বেচাকেনায় ছন্দপতন ঘটে, দুর্ভোগে পড়েন ক্রেতারা।

অভিজাত এলাকা গুলশান, বনানী, বারিধারার বিভিন্ন শপিংমল ও ফ্যাশন হাউসও ছিল জমজমাট। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে এসব এলাকার শপিংমলে আসেন। ব্র্যান্ডের জুতা এবং দেশের বিখ্যাত সব ফ্যাশন ডিজাইনারের তৈরি পোশাক পাওয়া যাচ্ছে সেখানকার বিভিন্ন দোকানে। দামটাও সাধারণের নাগালের বাইরে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত এক সপ্তাহ যাবত বেচাকেনা বেড়েছে। গুলশানের পিংক সিটি, শপার্স ওয়ার্ল্ড, নাভানা টাওয়ার, মনি ক্যাপিটাল সেন্টার ও পুলিশ প্লাজা সাজানো হয়েছে লাখ লাখ টাকা মূল্যের পোশাকে। এখানে একটি শার্ট সর্বোচ্চ ৪৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শপার্স ওয়ার্ল্ডের বিক্রেতা মোহাম্মদ সায়েম বলেন, এখানে সাধারণ ক্রেতারা খুব একটা প্রবেশ করেন না। বিত্তবানদের চাহিদা বিবেচনা করেই দোকানে মালপত্র তোলা হয়।

এখানে রয়েছে টি-শার্ট, পাঞ্জাবি, শাড়ি, লেহেঙ্গা, শার্ট, থ্রিপিস। এগুলোকে 'এক্সক্লুসিভ' বলে দাবি করছেন তারা। এসব পোশাক আনা হয়েছে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে। বিক্রেতারা বলছেন, অনেক আইটেম শুধু এক পিস করে আনা হয়েছে। ফলে অন্য কোথাও এটা পাওয়া যাবে না।

কনকর্ড পুলিশ প্লাজায় দেখা যায়, এ শপিংমলে পণ্যের দাম কিছুটা বেশি। বিক্রেতারা বলছেন, পোশাকসহ অন্যান্য পণ্যের মানের নিশ্চয়তা দিচ্ছেন তারা। এখনকার অনেক পণ্যই বিদেশি। তাই দাম চড়া হলেও মান ভালো।

নিকেতন থেকে আসা শিহাবুল আলম বললেন, পুলিশ প্লাজার সংগ্রহ খুবই ভালো। তবে দামটা একটু বেশি। তার পরও পছন্দ হওয়ায় কিনে ফেলেছেন বেশ কিছু পোশাক।

গতকাল সকাল ১১টা থেকেই ক্রেতার ভিড় জমতে শুরু করে রাজধানীর অভিজাত বিপণিবিতান বসুন্ধরা সিটিতে। মানসম্মত পোশাকের জন্য বিশেষভাবে খ্যাত এ বিপণিবিতানে গতকাল ছিল উপচেপড়া ভিড়। বিকেলের পর থেকেই এ বিপণিবিতানের ভেতরের অংশ দেখে মনে পড়ছিল কবিগুরুর 'তিল ঠাঁই আর নাহি রে' পঙ্‌ক্তি। এখানে চলন্ত সিঁড়ি ও ক্যাপসুল লিফট ফাঁকা পাওয়াটাই কঠিন ছিল। ভিড় উপেক্ষা করেই ক্রেতারা কিনেছেন নিজের ও পরিবারের সদস্যদের ঈদের পোশাক।

এখানে দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত ফ্যাশন জোনের ব্যবস্থাপক মো. সুমনের সঙ্গে কথা বলতে চাইলে প্রথমেই অপারগতা জানান তিনি। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করিয়ে বললেন, 'ভাই, ঈদের বাকি আর তিন-চার দিন। এখন কথা বলার সময় নেই। আপনার প্রশ্ন করা লাগবে না, আমিই উত্তর দিচ্ছি- বিক্রি খুবই ভালো।'

ঈদের কেনাকাটার শেষ মুহূর্তে দারুণ ভিড় জমেছিল রিচম্যান-লুবনানের শোরুমে। এখানে শার্ট ১,৭০০ থেকে ৪,০০০ টাকা, প্যান্ট ১,৯০০ থেকে ৩,০০০ টাকা, পাঞ্জাবি দুই হাজার থেকে ৪,৮০০ টাকা, পলো টি-শার্ট ১,২০০ থেকে ১,৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দামের ব্যাপারে শোরুমের কর্মকর্তা মো. জনি বলেন, মান ভালো চাইলে দাম তো একটু বেশিই হবে। মান ভালো হওয়ায় ক্রেতারা খুশি বলেও জানান তিনি।

রাজধানীর অভিজাত বিপণিবিতান যমুনা ফিউচার পার্ক গতকাল মুখর ছিল ক্রেতাদের পদচারণায়। এক ছাদের নিচে সবকিছু মিলায় জনপ্রিয়তা রয়েছে বিপণিবিতানটির। সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ক্রেতাদের কেউ কিনেছেন পোশাক, কেউ জুতা, কেউ প্রসাধনী। কেউ-বা সবকিছুই। সকাল থেকে রাত অবধি ছিল ক্রেতার ভিড়।

জুমার নামাজের পর থেকেই ক্রেতার ভিড়ে পা ফেলার জায়গা ছিল না বিশাল এ বিপণিবিতানে। বিকেলে আড়ংয়ের শোরুমে ঢুকে দেখা গেল, বিক্রয়কর্মীরা দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছেন না। আর ক্রেতারা দীর্ঘ লাইন ধরে পছন্দের পোশাক কিনছেন।

ইনফিনিটির বিক্রয়কর্মী সামিউল বলেন, রোজার শেষ মুহূর্তে সবসময়ই ক্রেতার চাপ অনেক বেশি থাকে। তাদের চাহিদা বিবেচনায় এই শেষ সময়েও নতুন কিছু কালেকশন রাখা হয়েছে। আর বেশিরভাগ চাকরিজীবী ইতিমধ্যে বোনাস পেয়েছেন। তাই যে যার বাজেটের মধ্যে প্রিয় জিনিসটি কিনছেন। যমুনা ফিউচার পার্কের কে-কদ্ধাফট, অঞ্জনস, ইয়েলো, ফ্রিল্যান্ড, রেড, সিক্স লাইফ স্টাইল, লা রিভ, প্লাস পয়েন্টসহ প্রায় সব ব্র্যান্ডের শোরুমেই গতকাল ছিল ধুম বিক্রি।

নিম্নবিত্তের ঈদের কেনাকাটার প্রিয় জায়গা বঙ্গবাজার। বঙ্গবাজারের আদর্শ হকার্স মার্কেট, মহানগরী ও বঙ্গ গুলিস্তান মার্কেট- তিনটিই এখন ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর। প্রতিদিন রাত ২টা পর্যন্ত চলেছে সেখানকার বেচাকেনা। তবে দরকষাকষি করেই সেখান থেকে কিনতে হচ্ছে পছন্দের পোশাকটি। গতকাল জুমার নামাজের পর সরেজমিন গেলে দেখা যায়, পাঞ্জাবি ও ছোট ছেলেমেয়েদের কাপড়ের দোকানে ভিড় বেশি। ভিড় ঠেলেই কথা হয় মহানগরী বঙ্গ মার্কেটের মেঘনা ফ্যাশনসের স্বত্বাধিকারী রাধেশ্যাম নন্দীর সঙ্গে। বললেন, ঈদের কেনাকাটা এখন দারুণ জমে উঠেছে। এবার তীব্র গরম থাকায় সুতি কাপড়ের বিক্রি ভালো।

বঙ্গ গুলিস্তান মার্কেটে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল তারিক আহমেদের সঙ্গে। তিনি বলেন, 'আমরা সীমিত আয়ের মানুষ। আমাদের জন্য বঙ্গমার্কেটই ভরসা। সাধ্যের মধ্যে কেনাকার শ্রেষ্ঠ জায়গা বঙ্গবাজার। বিক্রেতারা প্রচুর দাম চাচ্ছেন। কিন্তু বুদ্ধি করে দরদাম করতে হবে এখানে।' বিকেলের পর নিউমার্কেটের ছোট-বড় সব দোকানেই ছিল ক্রেতার চাপ। বিক্রেতারা জানান, তাদের মার্কেটে শাড়ি, রেডিমেড সালোয়ার-কামিজ এবং শিশুদের পোশাক বেশি বিক্রি হচ্ছে। এখানে দরদাম করে সাধ্যের মধ্যেই কেনা যায়, তাই ক্রেতার ভিড় বেশি বলে জানান চাঁদনীচকের ডালিয়া ফ্যাশনের বিক্রয়কর্মী মাসুম। তিনি বলেন, সকাল থেকে বিক্রি শুরু হয়েছে। ভালো বিক্রি হচ্ছে।

পাশের চাঁদনীচক ও গাউছিয়ায় দেখা যায়, তরুণীরা ভিড় জমাচ্ছেন অলঙ্কার ও প্রসাধনীর দোকানে। গাউছিয়ার সামনে কথা হলো লালমাটিয়ার বাসিন্দা ফারজানা আহমেদের সঙ্গে। বললেন, ঈদের পোশাক বানানো ও কেনা শেষ। এখন পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে অলঙ্কার কিনতে এসেছেন।

নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই রাজধানীর অর্ধশতাধিক স্থানের ফুটপাতে চলছে ঈদের কেনাবেচা। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধু এভিনিউ হকার্স সমিতি মার্কেট, গুলিস্তান মোড়ের চারপাশের ফুটপাত, গোলাপশাহ মাজার সংলগ্ন ফুটপাত, বঙ্গবাজার, শাহবাগ মোড় হয়ে কাঁটাবন মোড় পর্যন্ত রাস্তা, নিউমার্কেট, গাউছিয়া, চাঁদনীচক এলাকা থেকে শুরু করে সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড় পর্যন্ত ফুটপাতে যেমন ছিল ভিড়, তেমনি ছিল বিক্রি।