কথিত পীরের খপ্পরে পড়ে ধর্ষণ, অতঃপর খুন

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সাহাদাত হোসেন পরশ

১৪ বছরের সংসার আয়েশা আক্তার (২৭) ও মো. জসীমের। ঘরে রয়েছে ফুটফুটে দুটি সন্তান। জয় (১২) ও ঐশীকে (৯) নিয়ে সংসারে সুখের কমতি ছিল না এই দম্পতির। তবে বছর দুয়েক আগে স্ত্রীর অনুমতি না নিয়ে দ্বিতীয় বিয়ে করেন ট্রাকচালক জসীম। এরপর তাকে নিয়ে টাঙ্গাইলে বসবাস করে আসছিলেন তিনি। আর আয়েশা তার দুই সন্তানকে নিয়ে রাজধানীর ভাটারা এলাকায় ভাড়া বাসায় অন্যরকম জীবনযুদ্ধের সম্মুখীন হন। তিনবেলা কোনো রকম খাবার জোগাতে বসুন্ধরা এলাকায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন একটি বাসায়। আর চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন কীভাবে সতিনের কাছ থেকে স্বামীকে দূরে রাখা যায়। ওই চেষ্টা করতে গিয়ে এক কথিত পীরের খপ্পরে পড়েন আয়েশা। স্বামীকে ফেরত পাওয়ার আশ্বাস দিয়ে ফাঁদে ফেলেন ওই পীর, দিনের পর দিন প্রতারণা করে আসছিলেন তার সঙ্গে।। পীরের 'বাঁধা বাণ' খুলে গেলেই স্বামীকে ফেরত পাবেন- এ কথা জানিয়ে দিনের পর দিন আয়েশার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করেন ওই পীর। এর বিনিময়ে আয়েশার কাছ থেকে অর্থও হাতিয়ে নেন। এক পর্যায়ে হতাশ হয়ে আয়েশা তার অর্থ ফেরত চাইলে নতুন ফাঁদে ফেলে অচেতন করে আয়েশাকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যা করেন তিনি। রাজধানীর ভাটারা এলাকায় এমন পৈশাচিক ঘটনা ঘটলেও যিনি মামলা করেছিলেন, তাতে আয়েশার স্বামী জসীম উদ্দিনকে প্রধান আসামি করা হয়েছিল। পরে আয়েশার এ ঘটনার ছায়া তদন্ত শুরু করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। সেখানে আয়েশার হত্যার ঘটনাস্থলের কিছু আলামত ও তার এক স্বজনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বেরিয়ে আসতে থাকে চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার জন্য দায়ী কথিত ওই পীর। এখন তাকে গ্রেফতারের জন্য একাধিক জায়গায় অভিযান চালাচ্ছে ডিবি।

আয়েশার স্বজন ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ৫ জুলাই সকালে রাজধানীর ভাটারার টিনশেড কলোনির ৬ নম্বর বাসায় গিয়ে স্বজনরা দেখেন হাত-পা বাঁধা অবস্থায় আয়েশার নিথর দেহ ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে। তার হাত চৌকির এক পাশে ও পা চৌকির অপর পাশে বাঁধা। তার গলা একটি জিআই তার দিয়ে প্যাঁচানো। পরে খবর পেয়ে পুলিশ আয়েশার লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজে পাঠায়। এ ঘটনায় ভাটারা থানায় করা মামলায় আয়েশার স্বামী জসীম, তার দ্বিতীয় স্ত্রী হামিদা (৪০) ও অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করা হয়। শুরুতে ঘটনার দায়সারা তদন্ত করতে থাকে ভাটারা থানা পুলিশ। হত্যার পেছনে কী ধরনের ক্লু থাকতে পারে, সেই রহস্য উন্মোচন না করেই স্বজনদের কথামতো সাবেক স্বামী ও তার স্ত্রীকে আসামি করে মামলা করে দায় সারার চেষ্টা করা হয়।

পরে ছায়া তদন্ত করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে, সতিনের কাছ থেকে স্বামীকে ফিরিয়ে আনতে মরিয়া ছিলেন আয়েশা। স্থানীয় এক কথিত পীরের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর তার সঙ্গে ১২ হাজার টাকার চুক্তি হয় তার। ওই পীর তাকে জানান, তার সতিন তাকে এমন জাদুটোনা করেছেন, কোনোভাবে যেন জসীম তার কাছে ফেরত আসতে না পারেন। তার ওপর থেকে ওই জাদুটোনা দূর করা সম্ভব। এর উপায় হিসেবে কথিত পীর আয়েশাকে জানান, তার ওপর থেকে 'বদ নজর' দূর করতে হলে অন্য যে কোনো ব্যক্তির সঙ্গে তার শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। এটা করার পর সতিনের 'বাধা' তার ওপর থেকে সরে যাবে। এরপর ধীরে ধীরে তার স্বামী আবার তাকে ভালোবাসবেন। স্বামীর ভালোবাসা ফেরত পাওয়া ও দুই সন্তান নিয়ে সংসারে কোনোভাবে বেঁচে থাকার আশায় শেষ পর্যন্ত ওই পীরের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করতে রাজি হন আয়েশা। তবে দিনের পর দিন এমন প্রতারণার ফাঁদে ফেলে তার সঙ্গে সম্পর্ক চালিয়ে গেলেও জসীমকে ফেরত পাননি তিনি। তখন পীরের কাছে স্বামীকে ফেরত পাওয়ার অগ্রগতি জানতে চাইলে কথিত পীর জানান, তার স্বামী টাঙ্গাইল থেকে ঢাকা পর্যন্ত এসেছে। তবে ভাটারার বাসা পর্যন্ত আনতে গেলে আরেক পরীক্ষা দিতে হবে তাকে। ভণ্ড পীর আশেয়াকে জানান, হাত-পা বাঁধা অবস্থায় বাসায় ধ্যানমগ্ন থাকতে হবে। ওই সময় ওই অবস্থায় তাকে 'পানি পড়া' খেতে হবে। এই কথা জানিয়ে ৪ জুলাই আয়েশার বাসায় যান ওই পীর। এরপর বাসার মেঝেতে আয়েশাকে হাত-পা বেঁধে ফেলেন। 'পানি পড়া' খাওয়ানোর কথা বলে একটি স্পিরিটের বোতলের ভেতরে দুটি উচ্চমাত্রার ঘুমের ওষুধ খাইয়ে দেন। এরপর আয়েশা অচেতন হয়ে পড়লে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় তার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করেন ওই পীর। পরে গলায় জিআই তার পেঁচিয়ে নৃশংসভাবে খুন করেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিবির উত্তর বিভাগের ডিসি মশিউর রহমান বলেন, আয়েশাকে যে কায়দায় হত্যা করা হয়েছে, তা অত্যন্ত নৃশংস। এ ঘটনার জড়িত ব্যক্তিকে দ্রুত আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

আয়েশার ভাই শেখ ফরিদ বলেন, 'নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চর ওয়াপদায় বসবাস করার সময় পারিবারিকভাবে আয়েশার সঙ্গে জসীমের বিয়ে হয়। তবে দুই বছর আগে হঠাৎ কাউকে কিছু না জানিয়ে আরেকজনকে বিয়ে করেন তার বোনজামাই। স্বামীকে ফেরত পেতে পীর ও কবিরাজের দ্বারস্থ হয়েছিলেন তার বোন। তবে এমন নৃশংস ফাঁদে পড়ে আয়েশার জীবন যাবে, এটা কল্পনায়ও ছিল না তাদের।