ঝিলপাড় বস্তি পুড়ে ছাই

দুর্ঘটনা নাকি অন্যকিছু

বস্তিটি অনেকের কাছেই ছিল 'মধুর হাঁড়ি'

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সাহাদাত হোসেন পরশ

পুড়ে যাওয়া বস্তির সামনে দাঁড়িয়ে শনিবার আহাজারি করছিলেন সেলিনা বেগম। তার পোশাককর্মী মেয়ের জমানো টাকাটাও কেড়ে নিয়েছে আগুনের লেলিহান শিখা ছবি -মাহবুব হোসেন নবীন

রাজধানীর রূপনগর থানা-সংলগ্ন সড়কের শেষ মাথায় একটি আটতলা বিলাসবহুল ভবন। এর সামনে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে জনাবিশেক লোক বিলাপ করছিলেন। তাদের মধ্যে দুই নারীর কোলে ছোট্ট দুই শিশু। তারা চিৎকার করছিল আর বলছিল, 'ঘরে যামু। ঘরে নিয়া যাও।'

শুক্রবার রাতে এখানকার ঝিলপাড় বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তাদের ঘর পুড়ে অঙ্গার হয়েছে। অবশ্য তা ভালোভাবে বোঝার মতো বয়স হয়নি এই শিশুদের। অগ্নিকাণ্ডের পর এক কাপড়ে ফুটপাতেই রাত কাটিয়েছে ওরা। তবে অনেকের অভিযোগ, এটা দুর্ঘটনা নয়। আগুন দিয়ে বস্তি পুড়িয়ে দিয়েছে কেউ। এটা করা হয়েছে দখল আরও পাকাপোক্ত করার জন্য। অনেক অনৈতিক বাণিজ্য ছিল এই বস্তি ঘিরে।

জানা গেছে, আলিশান যে বাড়ির সামনে অগ্নিকাণ্ডে সর্বস্বহারানো মানুষ আর্তনাদ করছিল, সেটির মালিক ফকির কবির আহমেদ। তার দখলে আরামবাগ ও ঝিলপাড় বস্তির দুই শতাধিক ঘর। কবিরের আলিশান বাড়ির আলোর ছিটেফোঁটাও বস্তিতে পৌঁছায় না। তবে বস্তিবাসীর টাকায়ই আলোকিত হয়েছে তার প্রাসাদোপম বাড়িটি। প্রভাব খাটিয়ে ঘরপ্রতি ৩ হাজার টাকা হিসাবে মাসে অন্তত ৬ লাখ টাকা ভাড়া আদায় করেন কবির। শুধু কবির নন, রূপনগরের ঝিলপাড় বস্তি ছিল অনেকের কাছে 'মধুর হাঁড়ি'। সরকারি জায়গা দখল করে গড়ে তোলা ওই বস্তি ঘিরে অবৈধ গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ, ডিশ লাইন বাবদ লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিত একটি সংঘবদ্ধ চক্র। শুধু অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দিয়ে ঝিলপাড় বস্তি থেকে মাসে তোলা হতো ৫০ লাখ টাকা। চার দশকের বেশি বয়সের ঝিলপাড় বস্তি ওদের কাছে 'সোনার ডিম' পাড়া হাঁস। ক্ষমতার পালাবদলেও বস্তি ঘিরে এই চক্রের কোনো সমস্যা হয় না।

আগুনে মুহূর্তের মধ্যে নিঃস্ব হয়েছে ঝিলপাড় বস্তির লক্ষাধিক মানুষ। টেলিভিশন, মোবাইল, টাকা-পয়সা, আসবাবসহ অনেকের শেষ স্মৃতিটুকুও কেড়ে নিয়েছে আগুনের লেলিহান শিখা। সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে অনেকেই এখনও কাঁদছেন। অনেকে আবার আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘরের ধ্বংসাবশেষ হাতড়ে পুরনো স্মৃতি খোঁজার চেষ্টা করছেন। হতভাগ্য অধিকাংশ বস্তিবাসীর অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে উচ্ছেদ করতেই বস্তিতে আগুন দেওয়া হয়েছে। ঈদের সময় বস্তির প্রায় ১০ হাজার ঘরের অধিকাংশ ছিল তালাবদ্ধ। ঈদে অনেকেই গ্রামের বাড়ি গিয়েছেন। বস্তির অধিকাংশ বাসিন্দা রিকশাচালক, গৃহকর্মী, পোশাক কারখানার শ্রমিক ও দিনমজুর। হতাহতের ঘটনা এড়াতে আগুন দেওয়ার জন্য এই সময়টাকেই বেছে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ বস্তির বাসিন্দাদের। অনেকে বলছেন, বস্তির বড় দখলদারদের দখল আরও বিস্তৃত করার জন্যই আগুন দেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার সন্ধ্যায় লাগা ভয়াবহ আগুন ফায়ার সার্ভিসের ২৪টি ইউনিটের চেষ্টায় রাত সাড়ে ১০টার দিকে নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে পুরোপুরি নির্বাপণ করা সম্ভব হয় রাত দেড়টার দিকে। অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ১০ জন আহত হন। ফায়ার সার্ভিসের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের ডিউটি অফিসার কামরুল হাসান জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি  গঠন করা হয়েছে। তারা আগুন লাগার কারণ ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করবে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট কিংবা বিদ্যুতের সংযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে।

বস্তিবাণিজ্যে যারা : বস্তিবাসী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঝিলপাড় বস্তিতে ঘর তুলে যারা ভাড়া দেন ও অন্যভাবে অর্থ হাতিয়ে নেন তাদের মধ্যে রয়েছেন কেবল ব্যবসায়ী 'ডিশ বাবু'। বস্তিতে তার প্রায় দুইশ' ঘর রয়েছে। ঘর ছিল খলিলুর রহমান ওরফে বাইট্টা খলিলের, ফকির কবির আহমেদ, ফারুক, সালাম মিয়া, গালকাটা বাবু, লন্ড্রি বাবু, যুবলীগ নেতা রহিম, জাহাঙ্গীর হোসেন ও হেলাল মিয়ার। প্রায় পুরো বস্তিতে প্লাস্টিকের পাইপের মাধ্যমে ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস লাইন দিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতেন যুবলীগ নেতা দুলাল। ঘরপ্রতি মাসে ৫০০ টাকা গ্যাস বিল তুলতেন তিনি। এ হিসাবে বস্তি থেকে তার অবৈধ আয় ছিল মাসে ৫০ লাখ টাকার বেশি।

রূপনগরের স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা জানান, বস্তি যাদের কোটি কোটি টাকা তৈরির রাস্তা করে দিয়েছে, এলাকার সবাই তাদের চেনে। তবে ভয়ে কেউ মুখ খোলে না। এই অবৈধ আয়ের অর্থ পৌঁছে যায় অনেকের পকেটে। ঝিলপাড় বস্তি থেকে তোলা অর্থ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অসাধু সদস্যরা পেয়ে থাকেন।

জানা গেছে, এক সময় ফকির কবির আহমেদ জাতীয় পার্টি করতেন। এরপর যোগ দেন বিএনপিতে। পরে বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। মূলত বস্তি ঘিরে প্রভাববলয় টিকিয়ে রাখতেই বারবার দল বদলান তিনি। স্থানীয় ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রজ্জব হোসেনের সঙ্গে বর্তমানে গভীর সখ্য কবিরের। 'উত্তরাধিকার সূত্রে' ঝিলপাড় বস্তিতে ১০টি ঘর পেয়েছেন ৩০ বছরের এক যুবক। ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই যুবক গতকাল সমকালকে জানান, প্রতি মাসে ঘরের ভাড়া তিনি পেলেও গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির টাকা অন্যদের দিতে হয়। যুবলীগ নেতা দুলাল গ্যাসের টাকা নেন। প্লাস্টিকের পাইপের মাধ্যমে বস্তিতে গ্যাস লাইন দেওয়ার সময় অনেকে বিরোধিতা করলেও তাতে কর্ণপাত করেননি দুলাল। এ ছাড়া এই এলাকার কাউন্সিলরের একাধিক আত্মীয়ের দখলে বস্তিতে অনেক ঘর রয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। ঝিলপাড় বস্তিতে ৩৫টি ঘরের মালিক স্থানীয় হেলাল মিয়া। তিনি সমকালকে বলেন, 'স্বাধীনতার পর থেকে বস্তিতে ঘর তুলে গরিব মানুষকে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। এখানে অনেক ইনভেস্ট করেছি। ঘর পাকা করা হয়েছে। তবে পানি ছাড়া বিদ্যুৎ ও গ্যাস লাইন অবৈধ। সংশ্নিষ্টদের ম্যানেজ করে অনেকে এই বাণিজ্য করে আসছে। অনেক আগে থেকে শুনেছি এ জায়গায় পার্ক করা হবে। জানি না আগুনের পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি-না। তবে বস্তিবাসীকে বিপদে ফেলে অন্য কিছু ভাবা উচিত হবে না।'

স্থানীয় এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ সমকালকে বলেন, যারা ৫০-১০০টি ঘর তৈরি করে ভাড়া তুলত তাদের সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া হবে। সেটা যে দলেরই হোক। নতুনভাবে এই জায়গায় বস্তির লোকজনকেই পুনর্বাসন করা হবে। বস্তি এলাকায় সুন্দর রাস্তাও তৈরি করে দেওয়া হবে।

মিরপুর ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রজ্জব হোসেন বলেন, যারা অনেক দিন ধরে বস্তি নিয়ন্ত্রণ করত নতুনভাবে তাদের ঘর তৈরি করতে দেওয়া হবে না। অবৈধভাবে মালিক বনে নিয়ে তারা বস্তির বাসিন্দাদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করত।

নদীতে ভাঙল দেশের বাড়ি, আগুনে পুড়ল ঘর : ভোলা সদরে গ্রামের বাড়ি শেখ ফরিদ হোসেনের। স্ত্রী এবং দুই সন্তান সাকিব ও রাকিবকে নিয়ে ঝিলপাড় বস্তিতে বসবাস করছিলেন তিনি। আগুনে পুড়ে সব অঙ্গার হয়েছে তার। ফরিদ বলেন, 'দেশে নদীতে ভিটা হারিয়েছি আর ঢাকায় ঘর পুড়ল। এখন কোথায় গিয়ে দাঁড়াব।' ভোলার রামদাসপুরে গ্রামের বাড়ি রাজিয়া বেগমের। স্বামী, দুই সন্তান নিয়ে বস্তিতে বসবাস করতেন তিনি। সবকিছু হারিয়ে তার চোখ ছলছল করছিল। রাজিয়া বললেন, ফ্রিজ, টিভি, হাঁড়িপাতিল কিছু বের করতে পারেননি। স্কুলে খেলাধুলাসহ ভালো ফলের জন্য অনেক সনদ পেয়েছে তার মেয়ে। পুড়ে গেছে সবই। স্থানীয়রা জানান, বস্তি যারা নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের অনেকে এক সময় বস্তিতেই ছিলেন। অনেক টাকার মালিক হওয়ার পর বস্তির ঘর ভাড়া দিয়ে তারা এখন বহুতল ভবনের মালিক হয়েছেন। অনেকে আবার ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকেন।

ঘটনাস্থলের চিত্র : গতকাল সকালে বস্তি এলাকায় গিয়ে দেখা যায় হাজার হাজার মানুষ রাস্তা, ফুটপাত, গ্যারেজ ও আশপাশের স্কুলে অবস্থান নিয়েছেন। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও অনেকে খিচুড়ি তৈরি করে বিতরণ করেন। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম ও স্থানীয় এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ। মিরপুরের ঝিলপাড় বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের সব ধরনের সহযোগিতা দানের আশ্বাস দিয়েছেন মেয়র আতিকুল। তিনি বলেছেন, বস্তিবাসীর পুনর্বাসনের জন্য ২০১৭ সালে বাউনিয়া বাঁধে জায়গা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে ইতিমধ্যে পুনর্বাসনের কাজ শুরু হয়েছে। এখানকার ১০ হাজার পরিবারকে পর্যায়ক্রমে সেখানে স্থানান্তর করা হবে। এ ছাড়া বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেনও সেখানে যান। ড. কামাল বস্তিবাসীর উদ্দেশে বলেন, 'আমি অত্যন্ত মর্মাহত, আল্লাহ আপনাদের সহ্য করার তৌফিক দিক। একটার পর একটা অগ্নিকা আর কতবার দেখতে হবে? মানুষ কবে পাবে নিরাপদে জীবনযাপনের অধিকার?'