ঝিলপাড় বস্তি নিয়ন্ত্রণকারীদের দামি বাড়ি-গাড়ি

কোটিপতি বস্তিওয়ালা

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সাহাদাত হোসেন পরশ

প্রায় ৯ বছর ধরে রূপনগরের ঝিলপাড় বস্তিতে বাস করেছেন শারমিন বেগম। তার গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠির কৃষ্ণকাঠিতে। আগুনে সর্বস্ব হারিয়ে শারমিন আশ্রয় নিয়েছেন রূপনগরের ডি-ব্লকে ৪ নম্বর সড়কের একটি বাসার সামনে। রোববার সকালে যখন শারমিনের সঙ্গে কথা হয় তখন তার চোখেমুখে অনিশ্চয়তার ছাপ।

শারমিন জানান, মাসে ২ হাজার ১০০ টাকা ভাড়ায় বস্তির একটি খুপরি ঘরে কোনোমতে থাকত তার পরিবার। এখন সেটাও নেই। শুক্রবার আগুন লাগার পর এক কাপড়ে বের হয়েছেন। এরপর আশ্রয় নিয়েছেন আক্তার মিয়ার বাড়ির সামনে। ঝিলপাড় বস্তিতে আক্তারের নিয়ন্ত্রণাধীন খুপরি ঘরেই থাকতেন শারমিন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঝিলপাড় ও পাশের আরামবাগ বস্তিতে আক্তার মিয়ার দুই শতাধিক ঘর রয়েছে। একেকটির ভাড়া দুই হাজার থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত। এই হিসাবে বস্তি থেকে মাসে অন্তত ৪ লাখ টাকা আয় করেন তিনি।

সমকালের অনুসন্ধানে জানা যায়, ঝিলপাড় বস্তি নিয়ন্ত্রণকারী প্রায় সবার রয়েছে আক্তার মিয়ার মতো কোটি  কোটি টাকার সম্পদ। অনেকের আছে একাধিক ফ্ল্যাট বাড়ি এবং দামি গাড়ি। গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের জায়গা দখল করে গড়ে ওঠা ঝিলপাড় বস্তির একেকটি অংশ একেকজন নিয়ন্ত্রণে নিয়ে শত শত খুপরি তৈরি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। বস্তির নিচু ঘরগুলোই তাদের ওপরে ওঠার সিঁড়ি। এলাকায় তাদের পরিচিতি 'কোটিপতি বস্তিওয়ালা' হিসেবে।

রূপনগর থানার পেছনে মূল সড়ক থেকে ৫-৬ ফুট নিচে ঝিলপাড় বস্তি। সেখানে ছোট-বড় ও টিনশেড দোতলা ১০ হাজারের মতো ঘর রয়েছে। কোটিপতি বস্তিওয়ালাদের কেউ কেউ এক সময় এখানেই বসবাস করতেন। মাদক কারবার, গ্যাস-পানি-বিদ্যুতের অবৈধ সংযোগ ও ডিশ ব্যবসা করে তারা রাতারাতি ধনকুবের হয়েছেন। বস্তির 'নিচু জায়গা' ছেড়ে তারা আলিশান বাড়িতে উঠেছেন। গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। তবে যে বস্তি তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন এনে দিয়েছে, সেই 'সোনার ডিম পাড়া হাঁস' তারা ছাড়তে পারেননি। তাই কোটিপতি বস্তিওয়ালারা এখনও এই বস্তিতে যান। তবে সেটা নিজেদের আলিশান বাড়ি আরও আলোকিত করতে। মাইনের বিনিময়ে বস্তির টাকা তুলতে অনেকেই রেখেছেন ম্যানেজার। বস্তির খেটে খাওয়া মানুষদের বহু কষ্টের টাকায় দিন দিন তারা আরও বড় হচ্ছেন। খুপরি ঘরের সুখ-দুঃখ কোটিপতি বস্তিওয়ালাদের পর্যন্ত পৌঁছে না। মাস গেলে হাতে টাকাটা এলো কি-না, সেটাই তাদের চিন্তা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রূপনগরে একাধিক বাড়ির মালিক ফকির কবির আহমেদ। ডি-ব্লকে তার একটি আলিশান আটতলা বাড়ি রয়েছে। তার আরেকটি বাড়ি রয়েছে রূপনগর থানার উল্টো পাশে। সেটি তার ছেলে সুমন দেখভাল করেন। এ ছাড়া রূপনগরে ওয়াসা ভবনের পাশেই প্লট ও দোকান রয়েছে কবিরের। ওই এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরে আধিপত্য বজায় রেখেছেন কবির। রূপনগরের ডি-ব্লকের বাড়ির পেছনের বস্তিতে দুই শতাধিক খুপরি ঘর রয়েছে তার। মাসে সেখান থেকে প্রায় ৬ লাখ টাকা পেয়ে থাকেন তিনি। রূপনগরের ডি ব্লকের ২৮/৬ নম্বর বাড়িটি শাহাবুদ্দিন মুন্সী বাকে ওরফে বারেকের (মৃত)। ওই বাড়ির পেছনের বস্তির একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন বাকেরের স্ত্রী। মাসে বস্তি থেকে লক্ষাধিক টাকা আয় করেন তিনি।

ঝিলপাড় বস্তি নিয়ন্ত্রণকারীদের আরেকজন জাহাঙ্গীর হোসেন। যুবলীগ নেতা পরিচয় দিয়ে এলাকায় জাহাঙ্গীরের পোস্টারও দেখা গেছে। রূপনগরের একাধিক পুরনো বাসিন্দা জানান, জাহাঙ্গীরের পরিবার এক সময় ঝিলপাড় বস্তিতে বসবাস করত। তার পরিবারের সদস্যরা শুরুতে বস্তি এলাকায় বাংলা মদ বিক্রি করতেন। এর পর ধীরে ধীরে তারা অর্থ-বিত্তের মালিক হলে বস্তি ছেড়ে দেন; ঘরবাড়ি তৈরি করতে থাকেন। তবে বস্তিকেন্দ্রিক কারবার ছাড়তে পারেননি।

বর্তমানে বাংলা মদের কারবার তারা ছেড়ে দিলেও বস্তিতে কয়েকশ' ঘর তুলে ভাড়া তোলেন। ঝিলপাড় বস্তি নিয়ন্ত্রণকারীদের আরেকজন ডিশ বাবু। রূপনগর এলাকায় ডিশ ব্যবসা করেন তিনি। তাই এলাকায় 'ডিশ বাবু' নামে পরিচিত। ঝিলপাড় বস্তিতে ডিশের ব্যবসা ছাড়াও বেশ কিছু ঘর ছিল তার। এসব ঘর থেকে লাখ লাখ টাকা আয় ছিল ডিশ বাবুর। এ ছাড়া বস্তিতে শত শত খুপরি ঘরের মালিক ছিলেন খলিলুর রহমান ওরফে বাইট্টা খলিল ও হেলাল মিয়া। খলিল ও হেলালের রয়েছে লাখ লাখ টাকার সম্পদ ও বাড়ি।

কোটিপতি এক বাড়িওয়ালার ম্যানেজার সমকালকে জানান, তার মালিকের ৩৭টি ঘর ছিল। একেকটি ঘরের ভাড়া ছিল আড়াই থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। এই টাকা প্রতি মাসে ১০ তারিখের মধ্যে মালিকের কাছে পৌঁছে দিতেন তিনি। ঘরগুলো দেখভাল করার বিনিময়ে তাকে একটি বাসায় পরিবার নিয়ে বিনা খরচে থাকতে দিতেন মালিক।

ঝিলপাড় বস্তিতে বেশ কিছু ঘর রয়েছে স্থানীয় হেলাল মিয়ার। তিনি অবশ্য সমকালের কাছে দাবি করেন, বস্তিতে ঘরবাড়ি তৈরি বাবদ অনেক টাকা বিনিয়োগ করেছেন তিনি। অল্প টাকায় থাকার ব্যবস্থা করে দিয়ে গরিবদের উপকারই করছেন তারা।

রূপনগরের একাধিক বাসিন্দা জানান, প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই দীর্ঘ দিন ধরে বস্তিকেন্দ্রিক রমরমা বাণিজ্য করে আসছিল একটি প্রভাবশালী চক্র। গ্যাস-বিদ্যুৎ ও পানির অবৈধ লাইনের বিনিময়ে তোলা অর্থ তারা ভাগবাটোয়ারা করে নিত। বস্তির নিয়ন্ত্রণকারীদের অনেকে এলাকার স্থানীয় কাউন্সিলরের লোক বলে পরিচয় দিত। ভয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বস্তির এক বাসিন্দা জানালেন, দীর্ঘ দিন ধরে বসবাসের সুবাদে ওই বস্তিতে তাদের ৭টি ঘর রয়েছে। তবে প্রভাবশালী অনেকে তার ঘরগুলো দখল করার চেষ্টা করছে। বস্তিতে যাদের ঘর রয়েছে তারাই দখল আরও বাড়িয়ে নিতে পরিকল্পিতভাবে সেখানে আগুন দিয়েছে বলে দাবি তার।

অবশ্য আগুন লাগার কারণ নিয়ে নানামুখী বক্তব্য পাওয়া গেছে। কেউ বলছেন, প্লাস্টিকের পাইপলাইনের মাধ্যমে অবৈধভাবে গ্যাস সরবরাহ করতে গিয়ে আগুনের সূত্রপাত। আবার কেউ বলছেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগেছে। এমন জনশ্রুতিও আছে, বস্তিতে বসবাসকারী স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়েছিল। ওই সময় স্বামী রাগ করে গ্যাসের সিলিন্ডার ছুড়ে মারে। সেটা বিস্ম্ফোরিত হয়ে অগ্নিকাণ্ড ঘটে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্থানীয় এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা সমকালকে বলেন, বস্তি ঘিরে অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করা হবে। গ্যাস সংযোগ দিয়ে সেখানে লাখ লাখ টাকা তোলা হতো। এ বিষয়টি আগে নজরে আসেনি। এখন এসব করতে দেওয়া হবে না।

রূপনগর থানার আওয়ামী লীগ সভাপতি ও উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর রজ্জব হোসেন বলেন, 'বস্তিতে এত গোমর ছিল, তা জানা ছিল না। লাখ লাখ টাকার সম্পদ থাকার পরও যারা বস্তিতে দুই থেকে তিনশ' ঘর তুলে ভাড়া তুলত, তাদের আর ওই কারবার করতে দেওয়া হবে না। প্রকৃতভাবে যারা নিঃস্ব তারা বস্তিতে ঘর পাবে।

রজ্জব হোসেন দাবি করেন, যারা বস্তি নিয়ন্ত্রণ করত তারা ভোল পাল্টে নব্য আওয়ামী লীগার সেজেছে। তারা কেউ তার লোক নয়। তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।