রূপনগরের 'রাজা' কাউন্সিলর রজ্জব

ঝিলপাড় বস্তি ঘিরে রমরমা বাণিজ্য

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০১৯     আপডেট: ২১ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

বিশেষ প্রতিনিধি

রূপনগরের ঝিলপাড় বস্তি থেকে অবৈধ গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ ও ডিশ লাইন থেকে মাসে আয় হতো অন্তত দুই কোটি টাকার বেশি। তবে এই অর্থের সামান্য অংশ সরকারি সংস্থায় জমা হতো। বাকি টাকা একটি সিন্ডিকেট ভাগ-বাটোয়ারা করত। মাদক কারবার থেকেও আয় হতো বিশাল অঙ্কের টাকা। এছাড়া বস্তির প্রায় ১৫ হাজার ঘর ভাড়া দিয়ে চলত লাখ লাখ টাকার বাণিজ্য। অভিযোগ আছে, প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তা ও সদস্যদের ম্যানেজ করেই কয়েক দশক ধরে এই বাণিজ্য চালাচ্ছিল একটি সিন্ডিকেট। ক্ষমতার পালাবদলে বস্তির নিয়ন্ত্রণকারীদের অধিকাংশ তাদের রাজনৈতিক পরিচয় বদলে ফেলে। সর্বশেষ ঝিলপাড় বস্তিতে যারা আধিপত্য কায়েম করে আসছিল, তারা ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও রূপনগর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি রজ্জব হোসেনের লোক হিসেবে পরিচিত। এলাকার বাসিন্দারা জানান, নেপথ্যে রজ্জবই বস্তির নিয়ন্ত্রণ করতেন। সেখান থেকে তোলা অর্থের একটি বড় অংশ রজ্জবের কাছে

চলে যেত। শুধু বস্তি নয়, রূপনগর ও আশপাশ এলাকার পরিবহন থেকে চাঁদা তোলা ও মাদক কারবারিদের সহায়তারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। সিসিটিভি লাগিয়ে ঝিলপাড়ের কুখ্যাত মাদক কারবারি নজু সর্দারকে সহায়তা করতেন রজ্জব। এক সময় পরিবহন শ্রমিক ছিলেন তিনি। এখন বিপুল বিত্তবৈভবের মালিক। তার মালিকানাধীন একাধিক সুরম্য বাড়ি ও গাড়ি রয়েছে। অল্প সময়ে এত সম্পদের নেপথ্যে রয়েছে তার দখলদারিত্ব আর চাঁদাবাজি। জনশ্রুতি আছে, রূপনগরের অলিখিত রাজা হচ্ছেন রজ্জব। আর রজ্জব স্থানীয় এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লার সঙ্গে তার সখ্যকে ব্যবহার করেন নিয়মিত।

এ ব্যাপারে স্থানীয় এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা সমকালকে বলেন, 'রজ্জবের বিভিন্ন অভিযোগের ব্যাপারে কানাঘুষা রয়েছে। আমার কানেও কিছু এসেছে। এলাকার খবর নিয়ে এই অভিযোগের সত্যতা মিললে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেব। অন্যায় করলে কেউ ছাড় পাবে না। বস্তির কুখ্যাত মাদক কারবারি নজুর আস্তানা এমপি হিসেবে আমি নিজেই ধ্বংস করেছি।'

এলাকাবাসীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঝিলপাড় বস্তি থেকে নিয়মিত গ্যাসলাইন ও বিদ্যুতের অর্থ তুলতেন দুলাল। এক সময় দুলাল যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরে যুবলীগের রাজনীতিতে জড়ান। প্রতি ঘর থেকে চুলা হিসেবে ৫০০-১০০০ টাকা তুলতেন তিনি। ওই টাকা তুলে কাউন্সিলর রজ্জবের মেয়ের জামাই সোহেল রানাকে একটি ভাগ দিতেন। বস্তির অবৈধ অর্থের আরেকটি ভাগ চলে যায় পল্লবী থানা যুবলীগের সভাপতি তাইজুল ইসলাম বাপ্পীর পকেটে। বাপ্পীর টাকা তোলেন ইকবাল হোসেন খোকন ওরফে পেতলা খোকন। এছাড়া বস্তি ঘিরে অর্থের সুবিধা পেত স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শওকত আলী খোকন, ভাগ্নে রনি, ডিশ বাবু, ওয়াজেদ, রাসেল, খলিলুর রহমান ওরফে বাইট্টা খলিল, ফকির কবির আহমেদ, ফারুক, সালাম মিয়া, গালকাটা বাবু, লন্ড্রি বাবু, জাহাঙ্গীর হোসেন ও হেলাল মিয়া। তাদের মধ্যে রাসেল কাউন্সিলের শ্যালক ও রনি ভাগ্নে। অন্যরা রজ্জবের আশীর্বাদপুষ্ট।

রজ্জব হোসেন


এলাকার একাধিক বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রূপনগর এখন প্রায় এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করছেন কাউন্সিলর রজ্জব। এলাকায় কেউ তার ভয়ে কথা বলতেও সাহস পান না। ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ তার হাতে রয়েছে। রূপনগরের আরামবাগে তার দশতলা বিশিষ্ট একটি সুরম্য বাড়ি রয়েছে। কয়েক কোটি টাকা খরচ করে বিদেশ থেকে মার্বেল পাথর এনে ওই বাড়ি তৈরি করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, ওই বাড়ির ছাদে সুইমিং পুলও রয়েছে। অভিযোগ আছে, ঈদগাহ মাঠের জায়গা দখল করে ওই বাড়ি করেছেন তিনি। এছাড়া রূপনগরের মিল্ক্ক ভিটা রোডে আরও একটি ১২ তলার ভবন রয়েছে তার। ওই ভবনটি 'রিও ফ্যাশন' নামে একটি পোশাক কারখানাকে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। রূপনগর ছাড়াও পল্লবী ও আশপাশ এলাকায় আরও একাধিক বাড়ি, প্লট ও ফ্ল্যাট আছে তার। তার রয়েছে একাধিক দামি ব্র্যান্ডের গাড়ি। পূরবী হলের সুপার মার্কেট দখল করে সেখান থেকে লাখ লাখ টাকা কামানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া মিরপুরে ডেল্টা হাসপাতাল অবৈধভাবে নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অভিযোগও আছে। রূপনগর থেকে পূরবী ও পল্লবী প্লাজা থেকে বেড়িবাঁধ পর্যন্ত অবৈধ অটোরিকশার দুটি রুট রয়েছে। এই রুটে কয়েকশ' রিকশা চলাচল করে। দিনে রিকশাপ্রতি ৪০০ টাকা চাঁদা তোলা হয়। অভিযোগ আছে, এই টাকার ভাগও পান রজ্জব। এ ছাড়া তার ভাগ্নে রনি মামার প্রভাব খাটিয়ে রূপনগরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জায়গা দখল করেছে। রনির বিরুদ্ধে মাদক ও অপহরণ মামলা রয়েছে। ব্যবসায়ী আসলাম ও বাবুল হত্যা মামলার আসামি রজ্জব এখন রূপনগরের উঠতি সন্ত্রাসীদেরও ছত্রছায়ায় রাখেন। রজ্জবের একজন বিশ্বস্ত সহচর জিতু ওরফে নাড়া জিতু। অভিযোগ আছে, পুলিশের মিরপুর বিভাগের একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও রূপনগর থানার কয়েকজন পুলিশ সদস্যের সঙ্গে গভীর সখ্য রয়েছে রজ্জব ও তার সাঙ্গোপাঙ্গর। তারা নিয়মিত মাসোহারা পেয়ে থাকে। এ ছাড়া রজ্জবের এক বেয়াই এই বাণিজ্যে জড়িত।

পুলিশ ও র‌্যাবের অন্তত তিনজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, রজ্জবের কারণে দীর্ঘ দিন ধরে ঝিলপাড় বস্তিতে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছিল না। পুলিশের তালিকাভুক্ত কুখ্যাত মাদক কারবারি নজু সর্দার রজ্জবের আশীর্বাদ নিয়ে দাপটের সঙ্গে কারবার চালাত। গত বছর নজু র‌্যাবের সঙ্গে 'বন্দুকযুদ্ধে' নিহত হয়। তবে এর আগে কয়েক দফা নজুকে গ্রেফতার করতে ঝিলপাড়, চলন্তিকা বস্তিতে অভিযান চালিয়ে ব্যর্থ হন পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা। কারণ বস্তিতে ঢোকার মুখে কাউন্সিলের কার্যালয় ও আশপাশে সিসিটিভি লাগিয়ে নজুকে সহায়তা করা হতো। অভিযানে আসার পরপরই খবর চলে যেত মাদক কারবারিদের কাছে।

রূপনগরের একাধিক বাসিন্দা জানান, কেবল বস্তির হাজার হাজার ঘরে অবৈধভাবে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের লাইন দেওয়ায় প্রায়ই দুর্ভোগে পড়তেন এলাকাবাসী। ঢাকার অন্যান্য এলাকার তুলনায় রূপনগরে গ্যাসের সংকট প্রকট। আর প্রায়ই লোডশেডিং ও পানির সমস্যা দেখা দিত। শুধু গ্যাস বাবদ বস্তি থেকে মাসে তোলা হতো প্রায় কোটি টাকা। পানি বাবদ তোলা হতো ২৫ লাখ টাকার বেশি। বিদ্যুৎ বাবদ প্রায় ২৫ লাখ টাকা তুলত চাঁদাবাজরা। বস্তিবাসী নিয়মিত গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের খরচ পরিশোধ করলেও তা সরকারি কোষাগারে খুব কম অংশ জমা পড়ত। এলাকাবাসীর চাপে কোনো কোনো সময় অবৈধ গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের লাইন কাটতে গিয়ে তোপের মুখে পড়তে হয়েছিল সরকারি সংস্থাকে। আবার নেপথ্যে সরকারি সংস্থার কিছু অসাধু সদস্য এসব বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেন। বস্তির অবৈধ কারবারের কথা এলাকার গণ্যমান্যরা একাধিকবার মেয়রকে জানিয়েছেন।

রজ্জবের ভাষ্য :অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে কাউন্সিলর রজ্জব হোসেন সমকালকে বলেন, 'সামনে নির্বাচন। একটি কুচক্রী মহল আমার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে নানা অভিযোগ তুলছে। বস্তিতে ঘিরে অনিয়ম ছিল- এটা আমার জানা ছিল না। বস্তিতে কোনো সমস্যা হলে সেখানে যেতাম। তবে সেখান থেকে তোলা চাঁদার ভাগ পেতাম না। আমার জামাই ও কোনো আত্মীয় বস্তির বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত নয়।'

রজ্জব আরও বলেন, 'গার্মেন্টস ভাড়া, ঠিকাদারি, সাপ্লাইয়ের ব্যবসা রয়েছে আমার। মাদক কারবারে সহায়তা ও নজুর সঙ্গে সখ্য থাকার বিষয়টি সঠিক না।'

বিষয় : ঝিলপাড় বস্তি ঘিরে রমরমা বাণিজ্য