হাসপাতাল যেন মশার প্রজননক্ষেত্র

রক্ত পরীক্ষায় ভোগান্তি ভরসা 'হোম সার্ভিস'

বাড়ছে ডেঙ্গু

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০১৯     আপডেট: ২৪ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সমকাল প্রতিবেদক

মুগদা জেনারেল হাসপাতালের দুই ভবনের মাঝে জলাবদ্ধ সরু ড্রেন। এডিসের উৎপাদনস্থল সেখানকার স্বচ্ছ পানি - প্রতিবেদক

শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টা। রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সিঁড়ি বেয়ে নবম তলায় উঠতেই দেখা গেল ছোটখাটো জটলা। ভিড়ের মধ্যমণি দুই তরুণ। কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ, হাতে এক বান্ডেল ভিজিটিং কার্ড, কলম এবং একটি নোটবুক। রোগীর স্বজনরা তাদের কাছ থেকে কিছু নিচ্ছিলেন। ভিড় ঠেলে ভেতরে গিয়ে দেখা গেল, দুই তরুণ বিলি করছিলেন তাদের প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন। জ্বরে আক্রান্ত রোগীরা যেন রক্ত পরীক্ষার জন্য তাদের প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নেন। একজন আবার 'হোম সার্ভিস' থাকার কথাও জানিয়ে গেলেন।

বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রচার বেশ জনপ্রিয়তা পেয়ে গেছে ৫০০ শয্যার এই হাসপাতালে। এর জুৎসই কারণও খোলাসা করলেন কয়েকজন রোগী। ডেঙ্গু আক্রান্ত এক রোগীর মামা আবদুল গাফফার সমকালের এ প্রতিবেদককে বলেন, 'আগের রাতে ডাক্তার লিখে দেন কী কী পরীক্ষা করতে হবে। সে অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়ে রাখি। পরীক্ষার ফি জমা দিতে হয় হাসপাতালের দ্বিতীয় তলায় রূপালী ব্যাংকের শাখায়। ব্যাংক খোলে ৯টায়। কিন্তু আগে পাওয়ার আশায় সিরিয়ালে দাঁড়াই  ৭টায়। তা সত্ত্বেও ১১টার আগে টাকা জমা দিতে পারিনি। তারপর টাকা জমা দেওয়ার রশিদ নিয়ে গেলে তারা রক্ত সংগ্রহ করে। রিপোর্ট পেতে লাগে একদিন বা তারও বেশি।'

দক্ষিণ মুগদার বাসিন্দা সোহানা আক্তার (৩৫) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন ঈদের পরদিন থেকে। কিন্তু তিনি গতকাল পর্যন্ত চেষ্টা করেও হাসপাতালের ল্যাব থেকে রক্ত পরীক্ষা করাতে পারেননি। তিনি বলেন, 'শেষ পর্যন্ত আজকে (শুক্রবার) সুরাইয়া হাসপাতালের লোক এসে রক্ত নিয়ে গেল। রিপোর্টও হাসপাতালে এসে দিয়ে যাবে। টাকা একটু বেশি নিলেও দ্রুত ও সহজ পন্থায় রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে। হাসপাতালের ক্ষেত্রে এত দ্রুত সেবা মেলে না।'

একাধিক রোগী এবং তাদের স্বজনরা জানান, হাসপাতালের ভেতরে রক্ত পরীক্ষায় ভীষণ অনীহা দেখা যায়। ডাক্তার, নার্সেরা চিকিৎসা প্রদানের ক্ষেত্রে ঘাটতি না রাখলেও রক্ত পরীক্ষার বিষয়ে অপারগ ভূমিকায়। এ জন্য বাইরের লোকজন এসে ভিড় জমাচ্ছে। রোগীরাও সেদিকে ঝুঁকছেন।

হাসপাতালের ভেতরেই এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র : সকাল ৯টায় জরুরি বিভাগ থেকে বেরিয়ে মূল ভবনে ঢুকতেই বাঁয়ে নজর গেল। হাসপাতালের দুই ভবনের মাঝে সরু ড্রেনটি জলাবদ্ধ। আবদ্ধ জল অনেকটা স্বচ্ছ। ডেঙ্গুর জীবাণুবাহী এডিস মশা প্রজননের উপযুক্ত ক্ষেত্র বলেই মনে হলো। ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখা যায়, ছাদের পানি গড়িয়ে পড়ছিল এই ড্রেনে। সঙ্গে যোগ হচ্ছে বিভিন্ন তলায় থাকা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) থেকে নির্গত পানিও। ড্রেন থেকে পানি সরছে না, কারণ ড্রেনের একটু পরপরই নানারকম আবর্জনা জমাট বেঁধে রয়েছে।

হাসপাতালের দক্ষিণ পাশে দেয়াল ঘেঁষে পাইপ লাইন হয়ে যে পানি নামছে, তা স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হচ্ছে না। পশ্চিম পাশে জলাবদ্ধতা না থাকলেও রয়েছে প্রচুর আবর্জনা। সেখানে মশা-মাছি ভোঁ ভোঁ করছিল। চারপাশ ঘুরে আরও বেশ কয়েকটি স্থানে পানি আটকে থাকতে দেখা গেছে। ভবনের দ্বিতীয় তলার বারান্দা ময়লা-আবর্জনায় সয়লাব। এমনকি নবম তলায় মেডিসিন বিভাগের প্রবেশপথে লিফটের পাশেই খাবারের উচ্ছিষ্ট জমে গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। একজন রোগীর স্বজন নিজেদের বিছানার কাছাকাছি বলে কিছু আবর্জনা সরানোর চেষ্টা করছিলেন। ১২ তলায় রোগী এবং দর্শনার্থীর আনাগোনা প্রায় নেই বললেই চলে। সেখানকার শৌচাগারে দেখা যায়, পানিতে ভরে আছে দুটি বালতি। দেখে মনে হলো, কয়েকদিন ধরে সেখানে কেউ প্রবেশই করেনি।

জানা গেছে, বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৯৪ জন চিকিৎসকসহ ৩০০ স্বাস্থ্যকর্মী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরে এককভাবে মুগদা মেডিকেলে আক্রান্তের সংখ্যা বেশ লক্ষণীয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গত ১ জুলাই থেকে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এই হাসপাতালের ১৫ জন চিকিৎসক, ১৪ জন নার্স এবং ৬ জন অন্যান্য পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। হাসপাতালের অভ্যন্তরে এবং চারপাশে এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রই কি তাদের আক্রান্তের কারণ- এমন প্রশ্ন শুনে হেসে ফেলেন একজন নার্স। নাম প্রকাশ না করে তিনি বলেন, তেমনটি হতেই পারে।

ধারণক্ষমতার পাঁচগুণ রোগী : গতকাল সকাল ১০টা পর্যন্ত মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের কেবল মেডিসিন ওয়ার্ডেই চিকিৎসাধীন ছিলেন ৩১৭ জন রোগী। তাদের মধ্যে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যাই ২২৭ জন। অথচ এই ওয়ার্ডের বিছানার সংখ্যা মাত্র ৬০টি। ধারণক্ষমতার পাঁচগুণের বেশি রোগীর চাপ সামাল দিতে গিয়ে বেশ হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক-নার্সরা। গতকাল সকাল ১০টার মধ্যেই নতুন ৩০ জন রোগী ভর্তি হন। এ ছাড়া কেবিনগুলোতেও বিপুলসংখ্যক রোগী ভর্তি রয়েছেন।

হাসপাতালের অষ্টম, নবম ও দশম তলায় দেখা যায়, মূল ওয়ার্ডের ভেতরে নির্দিষ্ট বিছানা, তার পাশে ফ্লোরিং শেষে বাইরের দর্শনার্থী হলের এ-মাথা থেকে ও-মাথা কোনো অংশই বাদ নেই। এমনকি শৌচাগার, সিঁড়ি এবং লিফটের সামনেও বিছানা পেতে শুয়ে আছেন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী।

অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামাল দিতে গিয়ে দশম তলায় দর্শনার্থী হলের মধ্যেই একপাশে একটি 'নার্স স্টেশন' খুলেছে কর্তৃপক্ষ। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সেখানে দেখা যায়, একজন মাত্র নার্সকে ঘিরে ধরেছেন অন্তত ২০ জন ভুক্তভোগী। তাদের মধ্যে অনেকে নতুন ভর্তি হয়েছেন, কেউ পুরনো রোগী হাতে স্যালাইন নিয়ে দাঁড়িয়ে কিংবা তাদের স্বজন জরুরি কোনো জিজ্ঞাসার আশায়।

এত রোগীর মধ্যেও হাসিমুখে সেবা দিচ্ছেন অনেকে। কেউ আবার রোগীর সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করছেন। মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারের টোল আদায়কারী হাসিবুর রহমান (২৪) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে গত সোমবার থেকে চিকিৎসাধীন। তিনি বলেন, 'ডাক্তার-নার্সের সেবা এবং এখানকার পরিবেশ নিয়ে মোটামুটি সন্তুষ্ট। অনেক রোগী তো, তারা পেরে উঠছেন না।' দেলোয়ার হোসেন নামে আরেক রোগী বলেন, 'বারবার ডাকাডাকি করলেও নার্স পাওয়া যায় না। কিছু জানতে চাইলে দুর্ব্যবহার করেন।'