সরেজমিন

'ডেঙ্গু, এইডা আবার কী রোগ বাবা'

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

জয়নাল আবেদীন

রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মাথায় পানি ঢালছেন স্বজন-সমকাল

রাজধানীর মহাখালী এলাকার সাততলা বস্তিতে ১৭ বছরের ছেলেকে নিয়ে কণিকা রানীর কষ্টের সংসার। গত ১৫ আগস্ট বাবার মৃত্যুর খবরে ছুটে যান বরগুনায়। বাবা হারানোর শোকের মধ্যেই তিনি খবর পান শহরে থাকা ছেলে হৃদয় চন্দ্র দাশ তীব্র জ্বরে কাবু। জ্বরের অবস্থা বেগতিক দেখে রাতেই এক আত্মীয় হৃদয়কে নিয়ে যান কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। পরদিন সকালে বরিশাল থেকে ফিরে সরাসরি হাসপাতালে যান কণিকা।

গত শুক্রবার বিকেলে সমকাল প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে চোখেমুখে বিস্ময় তার। বলেন, 'ডাক্তার বলছে ডেঙ্গু হইছে। ডেঙ্গু, এইডা আবার কী রোগ বাবা? আমরা তো কিছুই বুঝতে পারতাছি না।'

কণিকা যখন ডেঙ্গু নিয়ে বিস্ময় জাগানিয়া মন্তব্যটি করছিলেন, চারপাশে তখন মশারি টানানো শতাধিক রোগী। ডেঙ্গু কর্নারে অন্য কোনো রোগী নেই। কিন্তু ডেঙ্গু রোগ সম্পর্কে নূ্যনতম ধারণাহীন কণিকার বিস্ময় কিছুতেই কাটে না। বাংলাদেশে ডেঙ্গু রোগের বয়স ১৯ বছর- এ প্রতিবেদকের কাছে তথ্যটি শুনে হতবাক তিনি। বলেন, 'আমরা গরিব মানুষ। এত খোঁজখবর তো রাখি না। অন্য সময় জ্বর হলে এমনিই সাইরা যায়। এবার দেখতাছি  এই জ্বরে অনেক মানুষ কষ্ট করছেন।'

বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছিল হৃদয়। তখনও মাথা, ঘাড়সহ সমস্ত শরীরে ব্যথা। হৃদয়ের বয়স যখন তিন বছর, তখন মারা যান বাবা রতন চন্দ্র দাশ। তারপর পোশাক কারখানায় কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন মা কণিকা। কিন্তু ঈদের পর বাবার মৃত্যু এবং ছেলের ডেঙ্গু জ্বরের কারণে চাকরিটাও ছেড়ে দিয়েছেন তিনি।

জানা গেছে, ২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশে ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ। সম্প্রতি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এ দেশেও বেড়েছে এডিস মশার দ্বারা সংক্রমিত এই ভাইরাস রোগ। চলতি বছর বাংলাদেশে ৬১ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রার দীর্ঘস্থায়িত্ব, নির্মাণাধীন স্থাপনা ও বাসাবাড়ির নানা জায়গায় সৃষ্ট কৃত্রিম জলাশয়ে এডিস মশার প্রজনন হয়। এসব বিষয়ে জনসচেতনতার পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে ডেঙ্গু জ্বরের কারণ, লক্ষণ ও প্রতিকার নিয়ে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে না। কুর্মিটোলার পাশাপাশি রাজধানীর আরও কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে আলাপ করে এ তথ্য মিলেছে।

ইস্কাটনের দিলু রোডে একটি ভাড়া বাসায় স্ত্রী, দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকেন একটি প্রতিষ্ঠানের চাকুরে শামসুদ্দিন। গত ১৮ জুলাই রাতে তিন বছর বয়সী ছেলে আল-আমীন জ্বরে আক্রান্ত হয়। প্রতিকার হিসেবে তিনি ছেলের মুখে তুলে দেন দুই চামচ নাপা সিরাপ। দু'দিন কেটে গেলেও জ্বর কমে না। ছোট্ট ছেলেটি শরীরের নানা অঙ্গে ব্যথার কথা জানায়। কর্মস্থল থেকে ফিরে ছেলেকে ভাত খাওয়ানোর চেষ্টা করেন তিনি। খেতে না চাইলে মেজাজ বিগড়ে যায় শামসুদ্দিনের। না খেয়ে খেয়ে জ্বর বাঁধিয়েছে বলে ছেলেকে বকুনি শুরু করেন। এভাবে কেটে যায় আরও দু'দিন। পরে পার্শ্ববর্তী আদ-দ্বীন হাসপাতালে নিয়ে গেলে রক্ত পরীক্ষায় জানা যায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত সে। হাসপাতাল থেকে হাসপাতাল ঘুরে আপ্রাণ চেষ্টার পরও আল-আমীনকে বাঁচানো গেল না। ৩১ জুলাই মারা গেল ছোট্ট ছেলেটি। সমকাল প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে ডুকরে কেঁদে ওঠেন বাবা-মা। বলছিলেন, 'বুঝতেই পারিনি ওর ডেঙ্গু হয়েছে। উল্টো ছেলেটিকে বকেছি। শেষ পর্যন্ত বাঁচাতেও পারলাম না।'

মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নবম তলায় চিকিৎসাধীন সোহানা আক্তার (৩৫) দক্ষিণ মুগদায় একটি বস্তিতে থাকেন। স্বামী জাফর উল্যাহ রিকশা চালান। ঈদের পরদিন (১৩ আগস্ট) তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। স্থানীয় ফার্মেসি থেকে কেনা ওষুধ সেবন করেও জ্বর ছাড়ে না। এভাবে ছয় দিন কেটে গেলে তারপর দ্বারস্থ হন হাসপাতালের। রক্ত পরীক্ষার পর জানতে পারেন ডেঙ্গু হয়েছে। এর আগে জানতেনই না এমন একটি রোগ বাংলাদেশে আছে। সোহানার স্বামী সমকাল প্রতিবেদককে বলেন, 'দেশে নতুন নতুন কত রোগ আইতাছে হিসাব নাই। এই ডেঙ্গুর কথা জীবনেও হুনি নাই। হুনলে কি আর এতদিন ঘরে বইসা থাকতাম!'

মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক নন্দিতা পাল জানান, 'রোগীরা নানারকম প্রশ্ন করে- জ্বর কেন হলো, কতদিনে সেরে উঠবে। আশ্চর্যের বিষয় হলো অনেকে ডেঙ্গু সম্পর্কে জানেই না। ডেঙ্গু কী রোগ সেটিও অবাক হয়ে জানতে চায়।' ডেঙ্গু নিয়ে নিম্নশ্রেণির মানুষের মাঝে ব্যাপক পরিসরে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলেও মনে করেন তিনি।

অনেকের ধারণা, এটি ছোঁয়াচে রোগ : কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের ষষ্ঠ তলায় ডেঙ্গু কর্নারে চিকিৎসাধীন হাফেজ সাইফুল ইসলামের (২৪) পাশে কাউকে দেখা গেল না। রোগীর সঙ্গে আলাপের এক পর্যায়ে হাজির হলেন মো. মানিক নামে একজন। রোগীর খালাত ভাই পরিচয় দিয়ে তিনি বলেন, 'কালাচাঁদপুরে একটি মেসে থাকে সাইফুল। মা-বাবাসহ আত্মীয়স্বজন গ্রামের বাড়িতে। তবে তার এক চাচা হাসপাতালে ওকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু হাসপাতালে মশারি টানানো এত রোগী দেখে তিনি ঘাবড়ে গিয়েছেন। তার ধারণা, এই রোগীদের স্পর্শে থাকলে তিনিও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হবেন।'

মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের দশম তলায় করিডোরে শুয়ে কাতরাচ্ছিলেন সকিনা খাতুন (৪২)। আলাপকালে জানা গেছে, দিনমজুর স্বামী তাকে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। হাসপাতালে এত রোগীর মধ্যে থেকে তিনিও যদি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে পড়েন, তাহলে সংসার চলবে কীভাবে- এই ধারণায় স্বামীকে হাসপাতাল থেকে বাসায় পাঠিয়ে দেন। তবে সকাল-বিকেল এসে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে যান তার স্বামী।

চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গু জ্বর কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়। তবে আক্রান্ত ব্যক্তিকে কোনো স্বাভাবিক এডিস মশা কামড় দিলে সেই মশাও ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণুবাহক হয়ে পড়ে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের উদ্দেশে চিকিৎসকের পরামর্শ, জ্বর হলে অবহেলা করে অনেকে ইচ্ছামতো ওষুধ সেবন করেন। জ্বরের পাশাপাশি একপর্যায়ে ব্যথা অনুভব হলে ব্যথানাশক ওষুধও সেবন করেন অনেকে। এগুলো ভয়ঙ্কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। জ্বর হলে ডেঙ্গু হয়েছে কি-না তা পরীক্ষা করে নিতে হবে। পাশাপাশি নিম্নস্তরে ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টিরও উদ্যোগ নিতে হবে।