রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে অর্ধেকই ডেঙ্গু রোগী, ৭৬ শতাংশ পুলিশ

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০১৯      

 বকুল আহমেদ

লিফট থেকে আটতলায় নামতেই চোখে পড়ল একটি ওয়ার্ডের গেটের ওপর টানানো ব্যানারে লেখা- ডেঙ্গু ওয়ার্ড। তার মধ্যে ঢুকে দেখা গেল, দু'পাশে ফ্লোরে শুয়ে আছেন রোগীরা। তাদের অনেককে আগে থেকেই স্যালাইন দেওয়া হচ্ছে, কাউকে নতুন করে তা পুশ করছেন কর্তব্যরত নার্স। কেউ কেউ মোবাইল ফোনে শরীরের অবস্থা জানাচ্ছেন আত্মীয়স্বজনকে। আতঙ্কের ছাপ অনেকের চোখেমুখে।

এ দৃশ্য রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালের। মঙ্গলবার দুপুর ১টায় সেখানে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্তদের বিশেষ ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা গেল অন্তত ৯০ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। অন্যান্য ওয়ার্ডেও চিকিৎসা চলছে তাদের। বিশেষায়িত এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর প্রায় অর্ধেকই ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত। তাদের মধ্যে ৭৬ শতাংশই পুলিশ সদস্য।

পুলিশ হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. মনোয়ার হাসনাত খান সমকালকে জানান, পুলিশ সদস্য ও তাদের পরিবারের লোকজনের চিকিৎসা দেওয়া হয় এ হাসপাতালে। গতকাল দুপুর পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৩৫৩। এর মধ্যে ডেঙ্গু রোগী ১৪৮ জন। তাদের মধ্যে ১১৩ জন পুলিশ সদস্য এবং ৩৫ জন পুলিশ পরিবারের সদস্য। গত সোম ও মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২৬ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন এখানে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে বলে জানান তিনি। তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, মে মাস থেকে গতকাল পর্যন্ত ভর্তি হয়ে ৫২৩ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। বহির্বিভাগেও এক হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।

হাসপাতালটির প্যাথলজি বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. ফাহমিদা আহমেদ জানান, চার দিন হাসপাতালে কিটস না থাকায় ডেঙ্গু পরীক্ষা বন্ধ ছিল। তবে জ্বরের অন্যান্য পরীক্ষা চলছিল। সোমবার বিকেলে কিটস আনার পর থেকে আবার ডেঙ্গু পরীক্ষা শুরু হয়েছে। তিনি বলেন. দিনে প্রতিদিন এ হাসপাতালে অন্তত দুইশ' রোগীর ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৬০-৭০ জনের ডেঙ্গু ধরা পড়ছে।

হাসপাতালের পুলিশ সুপার ডা. মো. এমদাদুল হক সমকালকে বলেন, জ্বরে আক্রান্ত হলেই ডেঙ্গু আতঙ্কে পুলিশ সদস্য ও তাদের পরিবারের লোকজন পরীক্ষা করতে আসছেন হাসপাতালে। তবে যাদের ডেঙ্গু ধরা পড়ছে তাদের সবাইকে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হচ্ছে না। যাদের অবস্থা গুরুতর তাদেরই ভর্তি করা হচ্ছে। অন্যরা বাসায় থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন।

মঙ্গলবার দুপুরে হাসপাতালের দোতলায় প্যথলজি বিভাগে দেখা যায়, ডেঙ্গু পরীক্ষায় রোগীদের সিরিয়াল লেগে আছে। পর্যায়ক্রমে রোগীদের শরীর থেকে প্রয়োজনীয় রক্ত নিচ্ছেন কর্তব্যরত প্যাথলজিস্টরা। এসব রোগীর মধ্যে ৮ম শ্রেণির ছাত্র আল মাহমুদ ফাহিমের বাবা পুলিশের এএসআই আবদুল জলিল জানান, তার বাসা সবুজবাগে। চার দিন ধরে ছেলে জ্বরে আক্রান্ত। সুস্থ না হওয়ায় গতকাল ছেলের ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে আসেন।

আটতলায় ডেঙ্গু ওয়ার্ডে কথা হয় পুলিশের নায়েক শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে। মিরপুরে পুলিশের পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্টের (পিওএম) উত্তর বিভাগে কাজ করেন তিনি। থাকেন ব্যারাকে। ২ আগস্ট ডেঙ্গু জ্বর ধরা পড়ে তার। রোববার ভর্তি হন হাসপাতালে। তার শরীরে প্লাটিলেট কমে যাওয়ায় তিনি আতঙ্কিত। রোববার প্লাটিলেট ছিল ৮৩ হাজার। সোমবার দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজারে। তিনি জানান, তার ব্যারাকে আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য এ জ্বরে আক্রান্ত।

পিওএম-এর দক্ষিণ বিভাগের কনস্টেবল আশিকুর রহমান ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি বলেন, শনিবার জ্বরে আক্রান্ত হন। সোমবার ভর্তি হন হাসপাতালে। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত কনস্টেবল রানা মাহমুদ জানান, রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স ব্যারাকে থাকেন তিনি। গত রোববার তার শরীরে ডেঙ্গু ধরা পড়ে। সোমবার হাসপাতালে ভর্তি হন। এ পরিস্থিতিতে সিলেটে পরিবারের লোকজন তাকে নিয়ে খুবই চিন্তিত। তিনি বলেন, ফোনে তার স্ত্রী প্রায়ই কান্নাকাটি করছেন। অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় তিনি ঢাকায় আসতে পারছেন না।

চিকিৎসাধীন ঢাকা মহানগর পুলিশের পরিবহন শাখার নায়েক তৈয়বুর রহমান জানান, ৩১ জুলাই তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। গত শনিবার পরীক্ষা করেও ডেঙ্গু ধরা পড়েনি। পরে সোমবারের পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। প্রায় প্রতিদিনই ডেঙ্গুতে মৃত্যুর খবরে তিনি আতঙ্কিত।