ডেঙ্গু দূরে থাক, কোনো রোগেই সেবা মেলে না

প্রকাশ: ০৭ আগস্ট ২০১৯      

কামরান সিদ্দিকী

রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল -ফাইল ছবি

কমলাপুর রেলস্টেশনের কর্মচারী রঞ্জন কুমার রায় সম্প্রতি জ্বরাক্রান্ত হয়ে আশপাশের কোনো হাসপাতালে ঠাঁই না পেয়ে ভর্তি হন রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতালে। কিন্তু সেখানে ডেঙ্গু পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাই পাশের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে গিয়ে পরীক্ষা করেন তিনি। তবে এখন পর্যন্ত তিনি রেলওয়ে হাসপাতালেই ভর্তি আছেন। সেখানে ভর্তি হওয়া আরেক রোগী হামিদ রানাও ডেঙ্গু শনাক্ত করেছেন বাইরের অন্য একটি হাসপাতালে পরীক্ষা করে।

মঙ্গলবার সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর বুকে মনোরম পরিবেশে গড়ে ওঠা দৃষ্টিনন্দন রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গু তো দূরে থাক, অন্য কোনো রোগেরও পরীক্ষা করার ব্যবস্থা নেই। 'জেনারেল হাসপাতাল' নাম হলেও এখানে সাধারণ রোগীর তেমন দেখা মেলে না। যারা আসেন তারা কোনো ওষুধও পান না। ৭৫ শয্যাবিশিষ্ট এ হাসপাতালে গতকাল মোট ১৬ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। এর মধ্যে আটজন ডেঙ্গু আক্রান্ত।

এদিকে পাশেই মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল। ডেঙ্গু রোগী সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে এ দুটি হাসপাতাল। অথচ বড় অবকাঠামো থাকার পরও রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতালকে কার্যকর করা হচ্ছে না। সংশ্নিষ্টরা জানাচ্ছেন, মূলত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের রশি টানাটানিতে এ হাসপাতাল থেকে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা দেওয়া যাচ্ছে না। প্রায় অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে আছে প্রায় সাড়ে ৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতাল।

হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত ঢাকা বিভাগীয় চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. আইএস আব্দুল আহাদ সমকালকে বলেন, এ হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার জন্য ১০টি কিট দেওয়া হয়েছিল। সেগুলো শেষ হয়ে গেছে। তাই এখন ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে পারছি না। রোগী এলে তাদের অন্য হাসপাতালে পরীক্ষা করার পরামর্শ দিচ্ছি। তবে রোগী ভর্তি করানো হচ্ছে।

৭৫টি আসন থাকলেও রোগীর সংখ্যা এত কম কেন- এমন প্রশ্নে চিকিৎসা কর্মকর্তা বলেন, একটি জেনারেল হাসপাতালে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকা প্রয়োজন, তা এখানে নেই। বাজেট খুব কম। যে পরিমাণ সরঞ্জাম ও উপকরণের চাহিদা দেওয়া হয়, তার পাঁচ ভাগের এক ভাগ পাওয়া যায়। ৪০টি বেড সক্রিয় আছে। অন্যগুলো অকার্যকর। ছোটখাটো অপারেশন করা গেলেও পর্যাপ্ত জনবল ও সরঞ্জাম না থাকায় বড় ধরনের কোনো চিকিৎসা করানো যায় না।

হাসপাতালটি মূলত রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীন। রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে 'বাংলাদেশ রেলওয়ে হাসপাতাল, ঢাকা' নামে চালু হয়েছিল এটি। তবে এখানে সবার চিকিৎসার সুযোগ করে দিতে ২০১৫ সালে রেলপথ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। একই বছরের ৩০ এপ্রিল এটি নতুন করে উদ্বোধন করেন তখনকার স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম ও রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক। তখন এটির নতুন নাম দেওয়া হয় 'রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল, ঢাকা'। পরের বছর এ ব্যাপারে প্রজ্ঞাপনও জারি হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে সেখানে চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আবার রেলওয়ের নিজস্ব চিকিৎসকও রয়েছেন।

উভয় প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, দায়িত্বরত চিকিৎসকদের মধ্যে কর্তৃত্ব নিয়ে ঠেলাঠেলি আছে। কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করবেন, তা নিয়ে চলছে রশি টানাটানি। গতকাল মঙ্গলবার সেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে নিয়োগ করা হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট ডা. সৈয়দ ফিরোজ আলমগীরকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে মোবাইল ফোনে তিনি বলেন, 'অসুস্থ হয়ে ছুটিতে আছি।' দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যকার সমঝোতা চুক্তিকে 'অসম্পূর্ণ' মন্তব্য করে তিনি বলেন, এ হাসপাতালকে পরিপূর্ণভাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে না দেওয়া পর্যন্ত এটিকে কার্যকর করা যাবে না। এটি পরিচালনার কোনো নীতিমালা (কোড) নেই। গত তিন বছরে এ বিষয়ে অনেকবার বলেছি। কোনো উদ্যোগ নেই।

মুগদায় 'ঠাঁই নেই ঠাঁই নেই' দশা : ৫০০ শয্যাবিশিষ্ট রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে গতকাল পর্যন্ত শুধু ডেঙ্গু রোগীই ভর্তি ছিল ৪৯২ জন। অন্যান্য রোগী মিলিয়ে মোট ১১০০ জন ভর্তি আছেন এখানে। চাহিদা অনুযায়ী বেড না থাকায় অস্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা এখানে মশারি ছাড়াই শুয়ে আছেন।

মঙ্গলবার এ হাসপাতাল পরিদর্শনে আসেন ব্যবস্থাপনা কমিটির চেয়ারম্যান ও স্থানীয় সাংসদ সাবের হোসেন চৌধুরী। এ সময় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, যেভাবে এই হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে, তাতে ভেতরে আর ঠাঁই দেওয়া যাবে না। হাসপাতালের সামনে খালি জায়গায় প্রয়োজনে অস্থায়ী ডেঙ্গু ক্যাম্প স্থাপন করা হবে। এখানে এ পর্যন্ত ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে ৭০০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তবে নয়জন মারা গেছেন। তিনি জানান, তিনটি থানা নিয়ে তার সংসদীয় আসন। সেখানে ১০টি হাসপাতালে জুলাই-আগস্টে দুই হাজার রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৬০০ জনের ডেঙ্গু পজিটিভ পাওয়া গেছে।

চাপ কমছে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে : রাজধানীর শাহজাহানপুরের ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গু রোগীর কোনো সিট ফাঁকা ছিল না। এখানে ১৫৯ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছেন। হাসপাতালের কর্তব্যরত আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) একেএম জুবায়ের বলেন, আজ (গতকাল) থেকে রোগীর চাপ কমছে। অনেকে সুস্থ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন। সে তুলনায় রোগী আসার হার এখন কম। ঢাকা ফাঁকা হতে শুরু হয়েছে। সে কারণেও এটা হতে পারে।