শূন্যের ওপর ফ্ল্যাট!

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

অমিতোষ পাল

ফ্ল্যাট দেওয়ার কথা বলে গ্রাহকের কাছ থেকে ২০১৬ সালে প্রায় ৩৭ কোটি টাকা নিয়ে এখন ফ্ল্যাট দিতে পারছে না, আবার টাকাও ফেরত দিচ্ছে না জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। যে জমিতে ফ্ল্যাট করার কথা, তাও দখলদারদের কবল থেকে উদ্ধার করতে পারেনি সংস্থাটি। যে দশটি প্লটে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তার একটি প্লট একজন প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতার পরিবারের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

তবে সাতটি প্লট ভবিষ্যতে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অধীনে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। মাত্র দুটি প্লট গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের দখলে আছে। ফলে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের কোনোই সম্ভাবনা নেই।

অথচ তিন বছর আগে গ্রাহকের কাছ থেকে ক্যাটাগরি ভেদে তিন লাখ, চার লাখ ও ছয় লাখ টাকা করে একেকজনের কাছ থেকে জামানত হিসেবে আবেদনপত্রের সঙ্গে জমা নিয়েছে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। এ অবস্থায় উদ্বিগ্ন আবেদনকারী গ্রাহকরা। গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ধানমণ্ডি ও মোহাম্মদপুরে নেওয়া 'গৃহায়ন ধানমণ্ডি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পে' এ কাণ্ড ঘটেছে।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রাশিদুল ইসলাম সমকালকে বলেন, 'মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এ প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল। যেসব প্লটে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, এর মধ্যে বেশ কিছু প্লট দখল করার জন্য কিছু অসাধু লোক মামলা করেছে। এখন সেটা আদালতের মাধ্যমে মোকাবেলা করছি। তবে এ প্রকল্প হাতে না নিলে ওই প্লটগুলোও হাতছাড়া হয়ে যেত। প্রকল্প নেওয়ার কারণে এগুলো গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের দখলে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। প্রকল্পের একটি প্লট প্রয়াত চলচ্চিত্র পরিচালক জহির রায়হানের পরিবারকে দেওয়া হয়েছে সরকারের নির্দেশে।'

২০১৬ সালে ধানমণ্ডির ১ নম্বর সড়কের ১৩৯/এ (নতুন ২৯), ২০ নম্বর সড়কের (নতুন ১০/এ) ১৮০/এ (নতুন ৫৩), ১২ নম্বর সড়কের (নতুন ৬/এ) ৫৪০/বি (নতুন ৩৮/বি), ২ নম্বর সড়কের ১৩৯ (নতুন ৩০), ১২/এ নম্বর সড়কের ২৫২ (নতুন ৭১), মোহাম্মদপুরের আসাদ এভিনিউয়ের ই ব্লকের ৩৮/সি এবং ৩৯/সি, ইকবাল রোডের এ ব্লকের ১২/৩ নম্বর প্লটে অত্যাধুনিক অ্যাপার্টমেন্ট তৈরি করে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিকে বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর মধ্যে ধানমণ্ডির ১ নম্বর সড়কের প্লটটি প্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হানের পরিবারকে বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাকিগুলোতে হবে ফ্ল্যাট প্রকল্প। একেকটি ফ্ল্যাটের আয়তন সর্বনিম্ন ১২০০ বর্গফুট থেকে ২৫০০ বর্গফুট ধরা হয়। ফ্ল্যাটের ধরন, অবস্থান ও সুবিধা অনুযায়ী প্রতি বর্গফুটের দাম ধরা হয় পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা। মোট ২৫৩টি ফ্ল্যাট তৈরি করা হবে। এর মধ্যে ৫১টি ফ্ল্যাট সচিব ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কোয়ার্টার হিসেবে ব্যবহূত হবে। বাকিগুলো বরাদ্দ দেওয়া হবে।

আবেদনপত্র আহ্বানের পর এ ক্যাটাগরিতে ১২৩টি ফ্ল্যাটের বিপরীতে ৩২২টি, বি ক্যাটাগরির ৫২টির বিপরীতে ২১৪টি ও সি ক্যাটাগরির ২৭টির বিপরীতে ২৯৬টি আবেদনপত্র জমা পড়ে। এ ক্যাটাগরির ফ্ল্যাটের জন্য ছয় লাখ টাকা, বি ক্যাটাগরির জন্য চার লাখ ও সি ক্যাটাগরির জন্য তিন লাখ টাকা জমা দিয়ে আবেদন করেন আবেদনকারীরা। গ্রাহকের কাছ থেকে মোট জমা পড়ে ৩৬ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এ ছাড়া প্রত্যেকে তিন হাজার টাকা দাম দিয়ে আবেদনপত্র সংগ্রহ করেন। কিন্তু এর পর থেকে ওই প্রকল্পের কাজের কোনোই অগ্রগতি নেই। এ প্রসঙ্গে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রাশিদুল ইসলাম বলেন, যদি কেউ টাকা ফেরত নিতে চান, আবেদন করলে টাকা ফেরত দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো টাকা কেটে রাখা হবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন শাখার কর্মকর্তা ইমতিয়াজ মোল্লা সমকালকে বলেন, তিন বছর আগে তিন লাখ টাকা জমা দিয়ে মোহাম্মদপুরে একটা ফ্ল্যাটের জন্য আবেদন করেছিলাম। কিন্তু কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় টাকা ফেরত নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। ফেরতের আবেদন করতে গেলে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কর্মচারীরা কিছু খরচ দাবি করে। এখন কী করব বুঝতে পারছি না।

ব্যাংক কর্মকর্তা সৌমিত্র হালদার বলেন, চার লাখ টাকা দিয়ে তিনি ওই প্রকল্পে আবেদন করেছিলেন। কয়েকবার খোঁজ নেওয়ার পর তারা বলেছে, শিগগিরই কাজ শুরু হবে। এই ফ্ল্যাটের আশ্বাসে এখন নতুন ফ্লাট কিনতে পারছেন না।

ব্যবসায়ী আব্দুল্লাহ মাহমুদ বলেন, এতদিনে বুঝতে পেরেছি, এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নেই। এখন কী করব বুঝতে পারছি না।

আবেদন ছাড়াই ১০ কর্মকর্তাকে ফ্ল্যাট বরাদ্দ :এদিকে আবেদন করে টাকা জমা দেওয়ার পর ফ্ল্যাট দিতে না পারলেও জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ আবেদনপত্র ও জামানতের টাকা জমা ছাড়াই ১০ কর্মকর্তাকে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দিয়েছে। সংস্থাটির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের শীর্ষ কর্মকর্তারা সরকারের পদস্থ কর্মকর্তাদের খুশি রাখতে এটা করেছেন। অতি উৎসাহী হয়ে জামানত ছাড়াই ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

নথিপত্রে দেখা যায়, গত ৩ জানুয়ারি জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ১৯৫তম বোর্ড সভায় এসব কর্মকর্তার ফ্ল্যাট বরাদ্দের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়। জামানত ও আবেদন ছাড়াই ফ্ল্যাট পান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সাজ্জাদুল হাসান, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফয়েজ আহমদ, প্রধানমন্ত্রীর পিএস-১ তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব এস এম গোলাম ফারুক, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনিছুর রহমান, পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগের প্রধান মো. সাইদুল হক, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী দেওয়ান মো. হানজালা, ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান মুন্সী শাহাবুদ্দীন আহমেদ এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। তাদের অনেকেই বর্তমানে এসব পদে বহাল নেই। নজরুল ইসলাম খন্দকার নামের একজনকেও তাদের সঙ্গে ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, এই দশজনের নামে সাময়িক বরাদ্দপত্র দিতে হবে। এ প্রসঙ্গে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রাশিদুল ইসলাম বলেন, তাদের ফ্ল্যাট দেওয়ার ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের সুপারিশ ছিল। জামানত ছাড়াই সাময়িক বরাদ্দ দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারা ভবিষ্যতে টাকা দেবে। টাকা না দিলে তো আর ফ্ল্যাট পাবে না।

সুবিধা পাচ্ছেন শীর্ষ কর্মকর্তারাই :ওই বৈঠকে আরও সিদ্ধান্ত হয়, এ ও বি ক্যাটাগরিতে সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের যেসব কর্মকর্তা আবেদন করেছেন, তাদের মধ্যে গ্রেডেশনের ভিত্তিতে এ ক্যাটাগারি ২৪ জন ও বি ক্যাটাগরির ১০ জনকে লটারি ছাড়াই ফ্ল্যাট দিতে হবে এবং তাদের নামেও সাময়িক বরাদ্দপত্র ইস্যু করতে হবে। তবে সি ক্যাটাগরির আবেদনকারীদের বিষয়ে পরে সিদ্ধান্ত হবে। এতে ক্ষমতাশালী ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের তোয়াজ করার অভিযোগ ওঠে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। কারণ যারা তিন লাখ টাকা জামানত দিয়ে আবেদন করেছিলেন, তারা অপেক্ষাকৃত নিম্ন পদের কর্মকর্তা। তাদের দিকে নজর না দিয়ে শীর্ষ কর্মকর্তাদেরই সুবিধা দিতে বেশি আগ্রহী গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। এ প্রসঙ্গে রাশিদুল ইসলাম বলেন, আলোচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এটা তার একার মতামত নয়।