গা ঢাকা দিচ্ছেন বিতর্কিত নেতাকর্মীরা

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

অমরেশ রায়

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর বিতর্কিত নেতাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অভিযান শুরু হচ্ছে। কোনো অবস্থায়ই কোনো অপরাধীকে ছাড় না দেওয়ার পক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। যুবলীগ নেতাদের পরিচালিত অবৈধ জুয়ার আসর ক্যাসিনোতে র‌্যাবের অভিযানের পাশাপাশি এক নেতাকে গ্রেফতারের পর অন্যদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় আতঙ্কে রয়েছেন ক্ষমতাসীন দল ও সহযোগী সংগঠনের অপরাধে যুক্ত নেতাকর্মীরা।

এদিকে, রাজধানীর চার ক্যাসিনোয় অভিযান এবং অস্ত্র, মাদকসহ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেফতারের পর যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর বক্তব্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে ক্ষমতাসীন দলে। অনেকেই এ বক্তব্যকে প্রকারান্তরে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়চেতা ভূমিকার প্রতি এক ধরনের 'চ্যালেঞ্জ' বলেই মনে করছেন।

সরকার ও দলের নীতিনির্ধারক কয়েকজন নেতা বলছেন, টানা ১০ বছর ক্ষমতায় থাকার সুবাদে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর এক শ্রেণির নেতাকর্মী নানা অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে অন্য দল থেকে ক্ষমতাসীন দলে যোগদানকারী হাইব্রিড নেতাকর্মীদের অনেকে মন্ত্রী-এমপিদের ছত্রছায়ায় থেকে এসব অপরাধ করে আসছেন, যা দল ও সরকারের ভাবমূর্তিকে চরমভাবে বিপন্ন করে তুলেছে। এর ফলে সরকারের বিস্ময়কর উন্নয়ন ও অগ্রগতির অনেকটাই ম্লান হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পর দল ও সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায় আর কোনো ছাড় দিতে নারাজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

নীতিনির্ধারক এই নেতারা জানাচ্ছেন, দুর্নীতি-সন্ত্রাস ও মাদকের বিরুদ্ধে আগে থেকেই কঠোর মনোভাব দেখাতে শুরু করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এমন প্রেক্ষাপটে দলীয় নেতাকর্মীদের কারও কারও বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ আসার পর তিনি পুরোপুরি 'জিরো টলারেন্স' অবস্থান নিয়েছেন। তাছাড়া আওয়ামী লীগের এবারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর অন্যতম প্রধান অঙ্গীকারই হচ্ছে মাদক, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি রোধ করে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এবারের এ অভিযান শুরু হয়েছে। আগামী ২১ ও ২২ ডিসেম্বর দলের ২১তম জাতীয় সম্মেলনের আগেই আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বে গুণগত পরিবর্তন আনতেও এই কঠোর অবস্থান নিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কোনো রকম অনৈতিক অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর 'জিরো টলারেন্স' নীতির অংশ হিসেবেই সম্প্রতি ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই পদ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব থেকে রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও গোলাম রাব্বানীকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে আল নাহিয়ান খান জয় ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে লেখক ভট্টাচার্যকে দায়িত্ব দিয়ে ছাত্রলীগে শুদ্ধি অভিযান শুরু করা হয়। এর পরপরই বুধবার বিকেল থেকে রাতভর র‌্যাব রাজধানীর চার ক্যাসিনোতে অভিযান চালিয়ে সেগুলো বন্ধ করে দেয়। এ সময় মাদক, অস্ত্রসহ যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেফতার করা হয়। বিপুল পরিমাণ টাকা, ডলারসহ মাদক উদ্ধার এবং ১৮২ জনকে আটক করে বিভিন্ন মেয়াদে সাজাও দেওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য স্থানসহ মূল দল আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠনগুলোর অপরাধে যুক্ত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও একই পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিতও দিয়ে রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনগুলোর অনেক নেতার নানা অপকর্মের তথ্যও প্রধানমন্ত্রীর কাছে রয়েছে। এসব নেতা কোথায় কী করছেন সে সম্পর্কে দলের বিভিন্ন সূত্র এবং একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে নিয়মিত তথ্যও পান তিনি। তাদের অনেকের আমলনামাও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন তিনি। বিতর্কিতদের একাধিকবার সতর্ক করায় কেউ কেউ ইতিমধ্যে সতর্ক হয়ে নিজেদের শুধরে নিলেও বেশিরভাগই এখনও বেপরোয়াই রয়ে গেছেন। এ কারণেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সর্বাত্মক অ্যাকশন শুরু হয়েছে।

গা ঢাকা দিচ্ছেন বিতর্কিতরা :যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেফতারের পর আতঙ্ক ও ভয় ছড়িয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের বিতর্কিত ও নানা অপকর্মে জড়িত অন্যান্য নেতাকর্মীর মধ্যে। যেকোনো সময় গ্রেফতারের আশঙ্কায় অনেকে গা ঢাকাও দিয়েছেন। আতঙ্কে রয়েছেন তাদের প্রশ্রয়দাতা কিংবা সুযোগ-সুবিধা পাওয়া নেতা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও। সব মিলিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন অপরাধমূলক কার্যক্রমে যুক্ত ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলের অভ্যন্তরে শুদ্ধি অভিযান এবং সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, অবৈধ অস্ত্র, মাদকসহ নানা অপরাধে জড়িত নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়ার পরপরই অপকর্মে জড়িত নেতাকর্মীদের মধ্যে আতঙ্কাবস্থা দেখা দিয়েছিল। চাঁদাবাজিসহ নানা অপকর্মে জড়িত ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতাকে অব্যাহতি দেওয়ার পর সেই আতঙ্ক আরও বাড়ে। আর বুধবার যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেফতারের পর অপরাধে জড়িত বিতর্কিত নেতারা আত্মগোপনে যেতে শুরু করেছেন।

এদিকে শোভন-রাব্বানীর পরিণতি দেখে যারা তাদের চারপাশে ছিলেন, তাদের হয়ে টেন্ডার ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করতেন, তারাও আতঙ্কে রয়েছেন। একই আতঙ্কাবস্থা দেখা দিয়েছে মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায় যুক্ত নেতাদের মধ্যেও। তাদের অনেকে কয়েকদিন ধরে সাংগঠনিক যোগাযোগও বন্ধ রেখেছেন। কেউ কেউ গা ঢাকাও দিয়েছেন।

এ ঘটনার পরপরই রাজধানীর চার ক্যাসিনোয় অভিযানের পাশাপাশি যুবলীগ নেতা খালেদকে গ্রেফতার করায় যুবলীগের অনেক নেতা বুধবার রাত থেকেই আত্মগোপনে চলে গেছেন। অভিযান চলার সময় ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী সম্রাট হাজারখানেক নেতাকর্মী নিয়ে রাজধানীর কাকরাইলে সংগঠনের কার্যালয়ে অবস্থান নেন। গতকাল বৃহস্পতিবারও অভিযুক্ত নেতাদের তালিকার শীর্ষে অবস্থানকারী এই নেতা কার্যালয়েই অবস্থান করেছেন। অন্যদিকে নগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেফতার ও তার পরিচালিত ক্যাসিনোতে অভিযান চলার সময় তার অনুসারী ও ক্যাডাররা কিছু সময় তৎপর থাকলেও পরে তারা প্রায় সবাই গা ঢাকা দিয়েছেন।