মোহামেডানসহ ৪ ক্লাবে অভিযান

ক্যাসিনোর এত সরঞ্জাম এলো কীভাবে

আমদানির মিথ্যা ঘোষণা ও চোরাপথে আনা হয়েছে বলে ধারণা

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

শেখ আবদুল্লাহ

রোববার রাজধানীর মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে অভিযান চালিয়ে জুয়ার বোর্ডসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করে পুলিশ- সমকাল

সম্প্রতি ঢাকার কয়েকটি ক্লাবে অবৈধভাবে ক্যাসিনো পরিচালনার অভিযোগে কয়েকজনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এসব ক্যাসিনো আধুনিক সরঞ্জামে সজ্জিত। ক্যাসিনোতে জুয়া খেলার জন্য বিশেষ ধরনের গেমিং টেবিল, চিপস, প্লাক, স্লট মেশিন, রুলেট হুইল, বড় বড় কাঠের বাক্সসহ (পিট) বিভিন্ন সরঞ্জাম লাগে। ফকিরাপুলের ইয়ংমেনস ক্লাব, ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, কলাবাগান ক্লাব, বনানীর আহমেদ টাওয়ারের ক্যাসিনোতে এসব সরঞ্জাম পেয়েছে র‌্যাব। বাংলাদেশে কোনো প্রতিষ্ঠান ক্যাসিনোর সরঞ্জাম তৈরি করে না। আবার বৈধভাবে আমদানিরও সুযোগ নেই। ফলে এগুলো যে বিদেশ থেকে আনা হয়েছে, তা নিশ্চিত করেই বলা যায়। কিন্তু কীভাবে এসব সরঞ্জাম দেশে এসেছে, সেই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে জনমনে।

বিদেশ থেকে আমদানি করা পণ্যের যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করে থাকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাস্টম কর্তৃপক্ষ। আর সীমান্তের চোরাচালান রোধে দায়িত্ব পালন করছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। কাস্টম ও বিজিবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলে জানা গেছে, ক্যাসিনোর সরঞ্জাম বৈধ বা অবৈধ কোনো উপায়েই দেশে আসছে বলে তাদের জানা ছিল না। তবে কাস্টমসের কর্মকর্তারা বলেছেন, মিথ্যা ঘোষণায় দেশে অনেক পণ্য আসে। যেমন- তুলার কনটেইনারে মার্সিডিজ বেঞ্জ এসেছে। ফলের ঘোষণা দিয়ে মদ-বিয়ার আনার ঘটনা ধরা পড়েছে। ফাইবার বোর্ডের ঘোষণা দিয়ে দামি টাইলস নিয়ে আসার ঘটনাও ধরা পড়েছে। ইলেকট্রনিকস পণ্যে প্রায়ই মিথ্যা ঘোষণার পণ্য জব্দ করা হয়। ফলে মিথ্যা ঘোষণায় ক্যাসিনোর সরঞ্জাম এসেছে বলে ধারণা করা যায়। অথবা পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে চোরাপথে আসতে পারে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম কাস্টমসের কমিশনার ফখরুল আলম সমকালকে বলেন, ক্যাসিনো সরঞ্জাম আমদানি হয় না। মিথ্যা ঘোষণায় এসেছে, সেটাও ধরা পড়েনি। ফলে ঢাকার ক্লাবগুলোর সরঞ্জাম কীভাবে এসেছে, তা বলতে পারব না। তবে এসব ক্লাবের সম্পৃক্তরা নিশ্চয় বলতে পারবেন, তারা কোথা থেকে কীভাবে এনেছেন।

বিজিবির পরিচালক (অপারেশন) মো. মেহফুজার রহমান সমকালকে বলেন, সীমান্ত এলাকায় পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে চোরাপথে আসা যেসব পণ্য বিজিবি জব্দ করে থাকে, তার মধ্যে কখনও ক্যাসিনো সরঞ্জাম দেখা যায়নি। এ ধরনের সরঞ্জাম ধরা পড়লে অবশ্যই বিজিবির পক্ষ থেকে রিপোর্ট করা হতো। ফলে এসব সরঞ্জাম কীভাবে দেশে এসেছে, সে বিষয়ে ধারণা নেই।

ক্যাসিনো সরঞ্জাম কোথা থেকে, কীভাবে আনা হয়েছে কেউ কিছু বলতে পারছেন না। তবে অনেকের ধারণা, পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন পক্ষকে ম্যানেজ করেই এসব সরঞ্জাম এনেছে ক্লাব কর্তৃপক্ষ। রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা বলেন, এসব বোর্ড সবাই যে চেনে, তা-ও নয়। আধুনিক প্রযুক্তির বোর্ডগুলো বিভিন্ন অংশে ভাগ করা। ফলে সব অংশ একসঙ্গে না থাকলে সেটা যে জুয়ার বোর্ড, তা অপরিচিতদের ধরতে পারা একটু কঠিন। আবার চিপস, বিভিন্ন ধরনের প্লাক কুরিয়ারের মাধ্যমে দেশে আনার সুযোগ রয়েছে। একবারে না এনে কয়েকবারে এসব প্লাস্টিক, পিতল ও কাচের সরঞ্জাম আনা যেতে  পারে।

ক্যাসিনোগুলোতে অভিযান পরিচালনাকারী র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম সাংবাদিকদের বলেছেন, এগুলো একটাও স্বীকৃত ক্যাসিনো নয়। আর বাংলাদেশের আইনে কোনো ক্যাসিনোকে লাইসেন্স দেওয়ার বিধান নেই। মূলত ক্রীড়া সংগঠনের আড়ালে এসব জুয়া খেলা আর মাদক সেবন চলছে, ক্যাসিনো সম্পূর্ণ অবৈধ।

মতিঝিল আরামবাগ এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ক্লাবগুলোতে জুয়া, মদের আসর নতুন নয়। প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন আগেই এসব ক্লাবে ক্যাসিনো গড়ে উঠেছে। ক্যাসিনোগুলোর জুয়া খেলার সরঞ্জাম একদিনে আসেনি, দীর্ঘদিন ধরেই এসেছে। তবে কোন পথে, কীভাবে জুয়া খেলার এসব সরঞ্জাম ঢাকায় আনা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ধারণা তাদের নেই বলে জানান।

ক্যাসিনোগুলোতে জুয়ার আসরের পাশাপাশি রমরমা মাদকের ব্যবসা চলে। এই চার ক্লাবের ক্যাসিনোতে প্রচুর পরিমাণে বিদেশি মদ উদ্ধার করেছে র‌্যাব। এসব মদের উৎসও অস্পষ্ট। লাইসেন্সধারী বার বা রেস্টুরেন্ট নির্ধারিত পরিমাণ মদ আমদানি বা স্থানীয় বাজার থেকে সংগ্রহ করতে পারে। তবে এসব ক্লাবের বারের লাইসেন্স নেই। সেখানে কারা মদ সরবরাহ করে, তা-ও স্পষ্ট নয়। তবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এত দিন ধরে কী করে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।