চট্টগ্রামে টাওয়ার-৭১ ও জয় বাংলা ভবন নির্মাণ

কথাই শুনছে না ঠিকাদাররা

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

মসিউর রহমান খান

আগ্রাবাদে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের নির্মাণাধীন বহুতল ভবন 'টাওয়ার-৭১' ও 'জয় বাংলা' - সমকাল

কথা ছিল, চট্টগ্রামে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের জমিতে ২৯ তলাবিশিষ্ট 'টাওয়ার-৭১' ও ১৯ তলাবিশিষ্ট 'জয় বাংলা' বাণিজ্যিক ভবনের নির্মাণকাজ ঠিক সময়েই শেষ হবে। কিন্তু তিন বছর পেরিয়ে গেলেও তা শেষ হয়নি। তা ছাড়া কবে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান কাজ শেষ করে কবে নাগাদ ভবন হস্তান্তর করতে পারবে, তা-ও নিশ্চিত করে বলতে পারছে না কেউ। মন্ত্রণালয়ের দেওয়া কয়েক দফা চিঠি ও সংসদীয় কমিটির পরামর্শ ও সুপারিশ আমলে না নিয়ে এক রহস্যজনক ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো।

নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় চুক্তি অনুযায়ী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানা করা হয়েছিল। তবে তা আদায় করতে পারেনি মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের এ অসহায়ত্ব দেখে এগিয়ে আসে সংসদীয় কমিটি। একাধিক বৈঠকে তারা ভবন নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ এবং জরিমানা আদায়ের সুপারিশ করে। কিন্তু তাতেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর টনক নড়েনি। পরে মন্ত্রণালয়, কল্যাণ ট্রাস্ট ও ঠিকাদারদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়ে জুলাইয়ের শুরুতে সংসদীয় কমিটি বিশেষ বৈঠকে বসে। তাতেও ঘটেনি কোনো অগ্রগতি। নির্মাণাধীন এ দুটি বাণিজ্যিক ভবনের  অবস্থান চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে। টাওয়ার-৭১ ভবন (প্লট নম্বর ৭১) নির্মাণে ট্রাস্টের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান মদিনা ডেভেলপমেন্টস লিমিটেড আওয়ামী লীগদলীয় সংসদ সদস্য হাজি মো. সেলিমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। জয় বাংলা ভবন (প্লট নম্বর ৩৬) নির্মাণে একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে চুক্তিবদ্ধ। এগুলোর মধ্যে মূল প্রতিষ্ঠান অরগান ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড (ওডিএল) এবং সহায়ক প্রতিষ্ঠান মাহবুবুর রহমান মুকুল (এমআরএম) ও এনহেন্স কনস্ট্রাকশন।

গত জুলাইয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকের কার্যপত্রে বলা হয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী ২০১৬ সালের জুন ও অক্টোবরে ভবন দুটি হস্তান্তরের কথা ছিল। চার দফা সময় বাড়ানোর কারণে দুই ভবনের জন্য জরিমানা বাবদ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ট্রাস্টের পাওনা দাঁড়িয়েছে তিন কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে একটি টাকাও তারা পরিশোধ করেনি। তা ছাড়া ২৯ তলাবিশিষ্ট 'টাওয়ার-৭১' ভবনের স্ট্রাকচার ডিজাইন নিয়েও আপত্তি তুলেছে সংসদীয় কমিটি।

সংসদীয় কমিটির বিশেষ এ বৈঠকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কিছু অজুহাত উত্থাপন করলেও তা নাকচ হয়ে যায়। পরে সংসদীয় কমিটি চলতি মাসের, অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের মধ্যে জরিমানার টাকা পরিশোধের এবং আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নির্মাণকাজ শুরুর সিদ্ধান্ত দেয়।

কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কখনও বলছে, জমির মালিকানা নিয়ে ঝামেলা ছিল; আবার বলছে, কমিটির এই সিদ্ধান্ত একতরফা। বৈঠকে তাদের কথা বলতেই দেওয়া হয়নি। কখনও বা বলছে, হস্তান্তরের ব্যাপারে তাদের সিদ্ধান্ত মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে এ সিদ্ধান্ত যে কী, তা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সমকালকে জানাতে রাজি হয়নি। এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের অবস্থানও অস্পষ্ট। একাধিক সূত্রমতে, ভবন নির্মাণে বিলম্ব উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ট্রাস্টের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই এ রকম করা হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ইফতেখারুল ইসলাম খান বলেন, একটি বিষয় যখন মন্ত্রী বা সংসদের কাছে চলে যায়, তখন ট্রাস্টের কিছুই করার থাকে না। তিনি বলেন, মদিনা গ্রুপ বারবার তাদের অপারগতার কথা বলছে। কিন্তু তাদের যুক্তিগুলো পর্যালোচনার পর সংসদীয় কমিটি ও মন্ত্রণালয় কোনো ছাড় আর দিতে রাজি নয়।

সংসদীয় কমিটির বৈঠকে জানানো হয়েছে, জরিমানা পরিশোধের তাগিদ এবং সময় বাড়ানোর কথা জানিয়ে সংশ্নিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ট্রাস্টের পক্ষ থেকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বিশেষ বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সংসদীয় কমিটির সদস্য ও ঢাকা-৭ আসনের এমপি কাজী ফিরোজ রশীদের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দলের আরও আগেই ভবন নির্মাণ পরিদর্শনে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অনিবার্য কারণে তা বাতিল করা হয়।

এ বিষয়ে কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, চলতি সেপ্টেম্বরেই তিনি কারিগরি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নির্মাণাধীন এলাকায় যাবেন। নির্ধারিত সময়ে না যাওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, এর খরচ কে বহন করবেন, তা নিশ্চিত না করায় যাওয়া হয়নি। গাঁটের পয়সা খরচ করে যেতে রাজি নন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এর আগে গত ৩ জুলাই অনুষ্ঠিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে কাজী ফিরোজ রশীদ টাওয়ার-৭১ সম্পর্কে বলেন, চট্টগ্রামের মতো সমুদ্রের কাছাকাছি স্থানে ১৯ শতাংশ জমির ওপরে চারটি বেইজমেন্ট করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে কোনোভাবেই ২৯ তলা পারমিট করা ঠিক নয়।

এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেন কমিটির আরেক সদস্য মইনউদ্দীন খান বাদল। তিনি বলেন, আগ্রাবাদ নিয়মিতভাবে সমুদ্রের পানিতে সাধারণ জোয়ারেই ডুবে যায়। ঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করা না হলে ভবনটির অস্তিত্বই সংকটে পড়বে। কোন যুক্তিতে চট্টগ্রামের মতো স্থানে চারটি বেইজমেন্ট করা হলো, সে বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টকে অনুসন্ধানের পরামর্শ দেন কমিটি সভাপতি শাজাহান খান।

মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বৈঠকে জানান, ২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি শেয়ারিং পদ্ধতিতে চুক্তি সই হয়, যার একটি পাবে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আর একটি অংশ পাবে ট্রাস্ট। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরা স্ট্রাকচার ডিজাইনের দায়িত্বে ছিলেন। ২০১৬ সালের ২০ জুন নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও জমির মালিকানা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে কাজ এখনও শেষ হয়নি। চারবার সময় বাড়ানোর পর আগামী ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক বলেন, মদিনা ডেভেলপমেন্টস লিমিটেডকে জরিমানা করে চারবার চিঠি দেওয়া হলেও তারা জরিমানা দিচ্ছে না। ভবনও হস্তান্তর করছে না। এতে ট্রাস্ট আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের সচিব এস এম আরিফ-উর-রহমান চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে দুটি বেইজমেন্টসহ ১৯ তলাবিশিষ্ট জয় বাংলা বাণিজ্যিক ভবন সম্পর্কে বলেন, ২০১২ সালের ২ এপ্রিল চুক্তি সই হয়। ২০১৬ সালের অক্টোবরে ভবনটি বুঝিয়ে দেওয়ার কথা ছিল। চারবার সময় বাড়ানোর মধ্য দিয়ে আগামী ডিসেম্বরে ভবন হস্তান্তরের কথা রয়েছে।

এ বিষয়ে মন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল বলেন, জয় বাংলা বাণিজ্যিক ভবনে জমির পরিমাণ ২৪ শতাংশ। সাইনিং মানি বাবদ আট কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। আর ৫০ ভাগ শেয়ার রয়েছে। তিনি বলেন, ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হলেও জরিমানা পরিশোধ না করলে তা বিক্রি করতে দেওয়া হবে না।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানসহ সব পক্ষের প্রতিনিধিদের নিয়ে ৭ জুলাই অনুষ্ঠিত সংসদীয় কমিটির বিশেষ বৈঠকে জয় বাংলা ভবনের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অরগান ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের পক্ষ থেকে প্রকৌশলী এস এম আসাদুজ্জামান বলেন, চুক্তি অনুযায়ী জমি হস্তান্তরের কথা ছিল ২০১৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর। কিন্তু ট্রাস্ট বলছে, জমি হস্তান্তরের সময় ছিল ২০১৩ সালের ৫ জুন। জমি নিয়ে প্রতিবেশী মালিকের সঙ্গে সমস্যা ছিল। জরিমানার বিষয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সময়মতো ম্যাটেরিয়াল ট্রান্সফার ও কনস্ট্রাকশন প্রসেস শুরু করা যায়নি।

এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য ৯ মাসের জরিমানা এরই মধ্যে মওকুফ করা হয়েছে।

টাওয়ার-৭১ ভবন সম্পর্কে মদিনা ডেভেলপমেন্টসের জি এম নাজিমউদ্দিন জোয়ারদার বলেন, তাদের ডিড অব অ্যাগ্রিমেন্ট অনুযায়ী ২০ তলা করলে ৩৮ মাস, এর বেশি করলে ৪৮ মাস সময় পাওয়া যাবে এবং ২৫ তলা স্ট্রেইট বিল্ডিং করা যাবে তিনটি বেইজমেন্টসহ। এ ছাড়া চুক্তি অনুযায়ী, জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার করা যাবে। সে হিসেবে তারা চট্টগ্রাম ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (সিডিএ) থেকে চারটি স্ট্রেইট ২৯ তলা বিল্ডিংয়ের অনুমোদন পেয়েছেন। তিনি জানান, ডিজাইন করেছেন ইন হাউস আর্কিটেক্ট পরেশ মণ্ডল।

এ বিষয়ে কমিটির সদস্য মইনউদ্দীন খান বাদল বলেন, যিনি কন্ট্রাক্টর, তিনি কীভাবে আর্কিটেক্ট হতে পারেন? মন্ত্রী মোজাম্মেল হক বলেন, বুয়েট থেকে ভেটিং করে ইঞ্জিনিয়ারিং ছাড়পত্র নিতে হবে। এই খরচ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে বহন করতে হবে।

বৈঠকের এ পর্যায়ে কমিটি সভাপতি শাজাহান খান বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ এবং সেপ্টেম্বরের মধ্যে জরিমানা পরিশোধ না করলে কাজ চালাতে দেওয়া হবে কি-না, তা পুনর্বিবেচনা করা হবে।

কমিটির এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়ে সর্বশেষ বৈঠকে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে বলা হয়, টাওয়ার-৭১ ভবনের জরিমানা বাবদ মদিনা গ্রুপের কাছে পাওনা এক কোটি ৫০ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা। অন্যদিকে জয় বাংলা ভবনের জরিমানা বাবদ ওডিএলের কাছে পাওনা এক কোটি ৪৮ লাখ ৩৬ হাজার ৯২৫ টাকা। দুই প্রতিষ্ঠানকেই এ বিষয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

এ বিষয়ে মদিনা ডেভেলপমেন্টের জি এম সমকালকে জানান, চিঠির বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের অবস্থান তারা চিঠি দিয়ে ট্রাস্টকে জানিয়ে দিয়েছেন। চিঠিতে উল্লেখিত অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে জানতে চাইলে তারা তা জানাতে রাজি হননি। অন্যদিকে ওডিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এস এম আসাদুজ্জামান বলেন, শিগগিরই তারা তাদের অবস্থান সংসদীয় কমিটিকে লিখিত আকারে জানাবেন। তবে জরিমানা পরিশোধের বিষয়টি তাদের কেউই স্বীকার করেননি।