উত্তরা ফ্ল্যাট প্রকল্প

কার ঘরে কে বসত করে

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

শেখ আবদুল্লাহ

বহুকাল ধরেই অভিযোগ শোনা যায়, বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা বিত্তবানদের জন্যই ফ্ল্যাট বানিয়ে থাকেন। বাস্তবেও দেখা যায়, বেসরকারি খাত যেসব আবাসন প্রকল্প নেয়, অতিরিক্ত দামের কারণে সেখানে ফ্ল্যাট কেনার সামর্থ্য থাকে না সাধারণ আয়ের মানুষের। সে জন্য নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের আবাসন নিশ্চিত করতে ঢাকার আশপাশে বেশ কয়েকটি প্রকল্প নেয় সরকার। কিন্তু অতিরিক্ত দামের কারণে সেখানেও ঠাঁই হচ্ছে না বিশাল এ জনগোষ্ঠীর। ঘুরেফিরে উচ্চবিত্তরাই সরকারি আবাসন প্রকল্পের ফ্ল্যাটের মালিক হচ্ছেন। ফলে যাদের জন্য এসব প্রকল্প নেওয়া, তাদের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে। জীবনযাত্রার সব দিক সামলে এত দাম দিয়ে ওই সব ফ্ল্যাট কিনতে পারছেন না গড়পড়তা আয়ের মানুষ। মধ্যবিত্তের হাত ফসকে তাদেরই জন্য তৈরি ফ্ল্যাট চলে যাচ্ছে বিত্তশালীদের আয়ত্তে।

সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) 'ঢাকাস্থ উত্তরা ১৮ নম্বর সেক্টরে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য অ্যাপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণ (প্রথম সংশোধন)' শীর্ষক প্রকল্পের নিবিড় পর্যবেক্ষণ করেছে। আইএমইডির পর্যবেক্ষণেই সরকারি আবাসন প্রকল্পে নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের সুযোগ না হওয়ার চিত্র উঠে এসেছে।

২০১১ সালের অক্টোবরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) রাজউকের প্রকল্পটি অনুমোদন করে। ৯ হাজার ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্প প্রথমে ২০১৬ সালের জুনে শেষ করার লক্ষ্য ছিল। যদিও পরে প্রকল্পটির ব্যয় ও সময় দুটোই বাড়ানো হয়। ২০১৭ সালের অক্টোবরের এক একনেক সভায় প্রকল্পটির ব্যয় ১৭ দশমিক ২৩ শতাংশ বাড়িয়ে ১০ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা ধরা হয়। আর বাস্তবায়ন মেয়াদ করা হয় চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল স্বল্প ও মধ্যম আয়ের লোকদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে ফ্ল্যাট তৈরি করে ঢাকা শহরের কেন্দ্রে জনসংখ্যার চাপ কমানো।

প্রকল্পে 'এ', 'বি' ও 'সি' তিনটি ব্লকে ১৮৩টি ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। সেখানে থাকবে মোট ১৫ হাজার ৩৭২টি ফ্ল্যাট। এর মধ্যে 'এ' ব্লকে ৭৯টি, 'বি' ও 'সি' ব্লকে ৫২টি করে মোট ১০৪টি ভবন নির্মাণের কথা। কিন্তু 'এ' ব্লকের ৭৯টি ছাড়া বাকি ভবনগুলোর নির্মাণকাজ শুরুই হয়নি এখনও। 'এ' ব্লকের প্রতিটি ভবন ১৬ তলাবিশিষ্ট। নিচের দুটো তলা পার্কিংয়ের জন্য রেখে বাকি ১৪ তলায় ছয়টি করে মোট ৮৪টি ফ্ল্যাট তৈরি করা হয়েছে প্রতিটি ভবনে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন এক হাজার ৬৫৪ বর্গফুট ধরে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের 'এ' ব্লকের চার হাজার ২৫৫টি ফ্ল্যাটের গ্রহীতাদের আয়ের সীমা বিশ্নেষণে দেখা গেছে, ৬৮ ভাগ মালিক মধ্যবিত্ত আর ৩২ ভাগ উচ্চবিত্ত। ফ্ল্যাটের মালিকদের মধ্যে কোনো নিম্ন মধ্যবিত্ত বা নিম্ন আয়ের মানুষ নেই। ফ্ল্যাটের উচ্চমূল্যের কারণে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের মানুষ এসব ফ্ল্যাট কিনতে পারছেন না। এর ফলে প্রকল্পের প্রথম ও প্রধান উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হচ্ছে না। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একই  অবস্থা গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও রাজউকের নেওয়া অন্যান্য প্রকল্পেও। মিরপুর-মোহাম্মদপুরে যেসব প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, সেখানেও নিম্ন আয়ের মানুষের সুযোগ হচ্ছে না।

আইএমইডির এ মতামতের সঙ্গে রাজউকও একমত। এ জন্য সংস্থাটি প্রকল্পের অন্য দুই ব্লকের ডিজাইন পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ বিষয়ে রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন) মেজর (অব.) প্রকৌশলী শামসুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট ভবন নির্মাণ প্রকল্পটি তিনটি ব্লকে করা হচ্ছে। 'এ' ব্লকের কাজ শেষ হয়েছে। এই ব্লকের ফ্ল্যাটের আয়তন ও নকশা যা, তাতে স্বল্প আয়ের মানুষ সুযোগ পাননি- এ কথা ঠিক। এর পরিপ্রেক্ষিতে 'বি' ও 'সি' ব্লকের নকশা পরিবর্তনের কথা ভাবা হচ্ছে। পাশাপাশি ফ্ল্যাটের আয়তনও ছোট করার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে স্বল্প আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকে।

আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব সভাপতি আলমগীর শামসুল আলামীন সমকালকে বলেন, ভবন নির্মাণে উপকরণের মূল্য, শ্রম মজুরি, ব্যাংক ঋণের সুদহার সবই ঊর্ধ্বমুখী। ফলে নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের শহরে নিজস্ব আবাসন নিশ্চিত করতে হলে সরকারকে বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে। প্রকল্পের জমি দিতে হবে কম মূল্যে। পাশাপাশি বিশেষ তহবিল গঠন করে ফ্ল্যাট ক্রেতাদের দীর্ঘ মেয়াদে পরিশোধে সুবিধা দিয়ে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে ফ্ল্যাটের সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করে দিতে হবে। নতুবা সরকার যত কথাই বলুক, নিম্ন ও নিম্ন মধ্যবিত্তদের আবাসন নিশ্চিত করতে পারবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার যেসব আবাসন প্রকল্প নিয়েছে, সেগুলোর ডিজাইন নিম্ন ও নিম্ন মধ্যম আয়ের মানুষের সঙ্গে খাপ খায় না। প্রকল্পগুলোর ফ্ল্যাটের আয়তন বেশি। মোট প্রকল্পের অর্ধেকের কম জায়গায় আবাসন ভবন বানানো হচ্ছে। আর যেভাবে মূল্য পরিশোধের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে, তাতে স্বল্প আয়ের মানুষ তার সুযোগ নিতে পারছে না। এ জন্য সরকার যদি আন্তরিকভাবে স্বল্প আয়ের মানুষের আবাসন দিতে চায়, তাহলে এ ধরনের প্রকল্পের নকশায় পরিবর্তন আনতে হবে। সহজ ও দীর্ঘমেয়াদি মূল্য পরিশোধের সুযোগ রাখতে হবে। নতুবা ভবন নির্মাণ উপকরণ, শ্রম ও জমির মূল্য যে পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে, তাতে ঢাকা ও এর আশপাশে নিম্ন ও নিম্ন মধ্যম আয়ের মানুষের নিজস্ব ঠিকানার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে।

ঢাকা মহানগরে প্রায় দুই কোটি লোকের বসবাস। ব্যাপক ঘনবসতি ও নানা কারণে বিশ্বের বসবাস-অযোগ্য সিটির মধ্যে ঢাকা শহর তিন নম্বরে এখন। পরিকল্পিত নগরায়ণ না হওয়ায় এ মহানগরী অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা হয়ে পড়েছে, সৌন্দর্যের বালাই নেই। তিলোত্তমা ঢাকাকে বিশ্ববাসীর কাছে আকর্ষণীয় শহরে রূপান্তর করতে হলে নিম্ন আয়ের মানুষের পরিকল্পিত আবাসনের ব্যবস্থার বিকল্প নেই। কিন্তু এ নগরীর জমি ও ফ্ল্যাটের যে মূল্য, তাতে এ আশা এখনও বহুদূর। তা ছাড়া সরকারও খুব আন্তরিক নয় বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।