আক্ষেপ রয়েই গেল রিকশাচালক নূরের

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০১৯     আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

নিহতদের স্বজনদের আহাজারি- সমকাল

রিকশাচালক বাবা নূর ইসলাম বাসায় ফেরার পর বেলুন কিনে দেওয়ার বায়না ধরেছিল ১১ বছরের শিশু ফরহাদ হোসেন রুবেল। টাকা না পেয়ে মুখ কালো করে বাসা থেকে বের হয়ে যায় সে। কিছুক্ষণ পর নূর ইসলাম বাসা থেকে বের হলে তার পিছু নেয় ছেলে। আবারও একই আবদার।

তবে এবারও তিনি বেলুন কিনে দিতে রাজি হননি। এরপর কিছু দূর যেতেই পেছনে বিস্ফোরণের বিকট শব্দে ফিরে তাকান। অজানা আশঙ্কায় কেঁপে ওঠে তার বুক। দৌড়ে গিয়ে দেখেন, কালো ধোঁয়ার মধ্যে কাতরাচ্ছে শিশুরা। কারও হাত, কারও পা দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্ত। এর মাঝেই খুঁজে পান প্রাণের নিধিকে। সারা শরীরে আঘাতের চিহ্ন, নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে এসেছে। রক্তাক্ত সন্তানকে বুকে তুলে নেন তিনি। বুকের ওপরই মারা যায় তার আদরের সন্তান।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বারান্দায় হাউমাউ করে কাঁদছিলেন নূর ইসলাম। বলছিলেন, বছরখানেক আগে মোটরসাইকেলের চাকায় পা ভেঙেছিল রুবেলের। লাখ চারেক টাকা ঋণ করে ছেলের চিকিৎসা করিয়েছেন। ছেলেটা সুস্থও হয়ে উঠেছিল। ভোলার চরফ্যাসনে গ্রামের বাড়িতে থাকত সে। স্থানীয় স্কুলে পড়ত। তাকে নিয়ে অনেক বড় স্বপ্ন ছিল বাবার। পড়ালেখা করে সে একদিন অনেক বড় চাকরি করবে। অভাব দূর হবে দরিদ্র পরিবারের। তাই তাকে ঢাকার স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার জন্য কিছুদিন আগে গ্রামের বাড়ি থেকে নিয়ে আসেন। এর আগে তার বড় ছেলে জিহাদ হোসেন পানিতে ডুবে মারা যায়। চার ছেলের মধ্যে দু'জনেরই হলো অকালমৃত্যু।

বুধবার বিকেলে রূপনগরে ওই বিস্ফোরণে হতাহতদের পরিবারের গল্প বড়ই করুণ। বেলুন বিক্রেতার পিছু নিয়েছিল একদল শিশু। ওদের চোখেমুখে ছিল বেলুন ওড়ানোর স্বপ্ন। মুহূর্তেই সেখানটা রক্তে ভেসে যায়। আকাশ ভরে ওঠে করুণ আর্তনাদে। বিস্ফোরণে আহত শিশুদের বাঁচার চিৎকারে, স্বজনের আর্তনাদে গোটা এলাকাই বিষাদময় হয়ে ওঠে।

স্থানীয় কামরুলের বস্তি ও ফজর মাতব্বরের বস্তির লোকজন জানান, গ্যাস বেলুনের বিক্রেতা মাঝেমধ্যে ১১ নম্বর সড়কের শেষ মাথায় বস্তিমুখে আসেন। শিশুরা পিছু নেয় তার। কেউ কেউ বেলুন কেনে। এক বেলুনের পেছনে পেছনে ছুটতে থাকে কয়েক শিশু। যারা কিনতে পারে না, বিক্রেতার পিছু পিছু দৌড়ে দেখে বেলুন ওড়ানোর দৃশ্য। বুধবারের ঘটনার সময়ও সেখানে সেই নিয়মিত দৃশ্যের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু বিস্ফোরণে সব শেষ হয়ে যায়।

ঘটনাস্থলের অদূরে ঝালমুড়ি বিক্রি করছিলেন হোসেন আলী। তিনি বলেন, বিস্ফোরণের পর শিশুদের ছিন্নভিন্ন দেহ ১০ থেকে ১২ হাত দূরে গিয়ে পড়ে। রাস্তায় রক্ত, কারও স্যান্ডেল উড়ে গেছে, কারও হাত-পা। তিনি কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলেন না। বিস্ফোরণের পর ধোঁয়া কেটে গেলে দেখেন বিভীষিকা। কী করবেন বুঝতে পারছিলেন না। ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে হোসেন আলী থরথর করে কাঁপছিলেন।

আফজাল মিয়া নামে আরেকজন জানান, রক্তাক্ত এক নারীও দৌড়াচ্ছিলেন। কিছুদূর গিয়ে তিনি পড়ে যান। একটি শিশুও দৌড়াচ্ছিল। শিশুটির পেট দিয়ে রক্ত ঝরছিল। এমন পরিস্থিতিতে কী করবেন, তিনি বুঝতে পারছিলেন না।

ওই বিস্ফোরণে আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন জান্নাত আক্তার (২৮)। গৃহকর্মী এই নারীর ডান হাতটি উড়ে গেছে। হাসপাতালে সম্বিৎ ফিরে এলে তিনি তার হাতটি খুঁজছিলেন।

যন্ত্রণাকাতর জান্নাত ঘটনার বিবরণ দেওয়ারও চেষ্টা করছিলেন। বলছিলেন, দিনভর বাসায় কাজ শেষে তিনি রূপনগর বাজারে গিয়েছিলেন। পেঁপে আর মুরগি কিনে বাসায় ফেরার পথে মেয়ে সুমাইয়ার জন্য বেলুন কিনতে দাঁড়িয়েছিলেন। হঠাৎ করেই বিস্ফোরণ। এরপর কী হয়েছিল তার আর মনে নেই। শুধু দেখেন শরীর রক্তে ভিজে গেছে।

ফজর মাতব্বরের বস্তির বাসিন্দা রাশিদা বেগম ঘটনাস্থলের পাশেই পিঠা বিক্রি করেন। ঘটনার সময় তিনি নিজের পসরা সাজাচ্ছিলেন। হঠাৎ করেই তিনি শব্দ পান। এরপর চারপাশ ধোঁয়ায় ভরে যায়। রাশিদা জানান, বাচ্চাদের চিৎকার শুনে ধোঁয়ার মধ্যেই দৌড়ে যান তিনি। নিজের ছেলেকে খুঁজতে থাকেন। দেখেন, অনেক শিশু রক্তাক্ত অবস্থায় ছটফট করছে। অনেকের সঙ্গে তিনিও রক্তাক্ত লোকজনকে উদ্ধার করেন।