কেউ নেই পাশে

প্রকাশ: ০৭ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সমকাল প্রতিবেদক

::ফাইল ছবি

সম্রাটের মতোই চলাফেরা করতেন ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। তার হুঙ্কারে টুঁ শব্দ করার সাহস ছিল না কারও। সবসময় শত শত নেতাকর্মী আর ক্যাডারবেষ্টিত হয়ে চলাফেরা করতে পছন্দ করতেন ক্যাসিনো-কাণ্ডে আলোচিত এই যুবলীগ নেতা। যেখানে যেতেন সেখানেই তার সামনে-পেছনে থাকত শত শত মোটরসাইকেল আর গাড়ির বহর। মনে হতো, সত্যিই কোনো সম্রাট যাচ্ছেন চারপাশে পাইকপেয়াদা নিয়ে।

ঢাকায় ছিল সম্রাটের বিশাল রাজত্ব। কাকরাইলে ব্যক্তিগত অফিসের সামনে দিন-রাত ভিড় করে থাকত তার সাঙ্গোপাঙ্গরা। শুধু নেতাকর্মীই নয়, সরকারি পদস্থ অনেকেও তার সঙ্গে দেখা করতে লাইন ধরতেন। সিনেমা ও নাটকপাড়ার কিছু নায়িকারও আনাগোনা ছিল নিয়মিত।

কিন্তু রাতারাতি সবকিছু বদলে গেছে। শত শত সাঙ্গোপাঙ্গ, ঘনিষ্ঠজন, অনুগত মানুষ- তাদের কেউই এখন আর নেই তার পাশে। ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত দলের প্রভাবশালী কোনো নেতাও কথা বলছেন না তার পক্ষে। গতকাল রোববার ভোরে গ্রেফতার হওয়ার পর সংগঠন থেকেও ছুড়ে ফেলা হয়েছে তাকে। যুবলীগ থেকে বহিস্কার করা হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ মহানগর শাখার সভাপতি সম্রাটকে। এখন তার ঠঁাঁই হবে কারাগারে, একজন বন্দি হিসেবে।

অনিয়ম, দুর্নীতি, ঘুষ-বাণিজ্য ও ক্যাসিনো জুয়ার বিরুদ্ধে অভিযানের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর নির্দেশনার পর গত ১৮ সেপ্টেম্বর র‌্যাব প্রথম গ্রেফতার করে দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে। গ্রেফতারের পর তাকেও সংগঠন থেকে বহিস্কার করা হয়। ওইদিন সিলগালা করা হয় তার নিয়ন্ত্রিত মতিঝিলের ফকিরাপুল ইয়ংমেনসসহ ঢাকার চারটি ক্যাসিনো ক্লাব। পরে আরও একাধিক ক্যাসিনো ক্লাবে অভিযান চালায় র‌্যাব-পুলিশ। ক্যাসিনো-কাণ্ডে একে একে গ্রেফতার হন যুবলীগের গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীম, কৃষক লীগ নেতা সফিকুল আলম ফিরোজসহ বেশ কয়েকজন। খালেদ ও জি কে শামীম গ্রেফতার হওয়ার সময় থেকেই চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণসহ নানা অভিযোগের কারণে সম্রাটের নামও সামনে চলে আসে।

খালেদ যেদিন গ্রেফতার হন সেদিন রাতে কাকরাইলে রাজমণি সিনেমা হলের উল্টোপাশের ভবনে নিজের কার্যালয়ে সহস্রাধিক নেতাকর্মী নিয়ে অবস্থান করেন সম্রাট। ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি নেতাকর্মী নিয়ে সেখানেই অবস্থান করেন- এমনটাই ধারণা ছিল সবার। নেতাকর্মীর ভিড় ছিল অফিসের সামনে ও আশপাশে। তবে ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে তার অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়। অবশ্য গতকাল র‌্যাব জানায়, সম্রাটকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার এড়াতে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন এবং এ জন্য তিনি নানা পন্থা অবলম্বন করেছিলেন।

কাকরাইলের রাজমণি সিনেমা হলের আশপাশের একাধিক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, সম্রাটের অফিসের নিচে রাত-দিন শত শত নেতাকর্মীর ভিড় থাকত। এমন কোনো দিন নেই যে, সেখানে অন্তত ৫০০ মানুষের খাবার রান্না হয়নি। এসব খাবারের খরচ বহন করতেন সম্রাট। মনে হতো মিছিল-সমাবেশ হচ্ছে। নেতাকর্মীর ভিড়ে সাধারণ মানুষের পথ চলতেও সমস্যা হতো। এমনও হয়েছে, চলার পথে কোনো নেতাকর্মীর গায়ে রিকশার চাকা লাগায় তাৎক্ষণিকভাবে রিকশাওয়ালাকে বেধড়ক পিটিয়েছে নেতাকর্মীরা। নেতাকর্মী ছাড়াও নানা ধরনের মানুষের যাতায়াত ছিল তার কাছে। অফিস থেকে ফিল্মি স্টাইলে বের হতেন সম্রাট, ঢুকতেনও ফিল্মি স্টাইলে।

তবে ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে তার অফিসের সামনে লোকজন কমতে থাকে। আর গতকাল ছিল একেবারেই নেতাকর্মীশূন্য। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আর গণমাধ্যম কর্মী ছাড়া সারাদিন তাদের কেউই ছিল না সেখানে। অবশ্য সন্ধ্যার দিকে র‌্যাব যখন সম্রাটকে তার কার্যালয় থেকে বের করে নিয়ে আসছিল, তখন সেখানে তার শ'খানেক সমর্থককে জড়ো হয়ে স্লোগান দেওয়ার চেষ্টা করতে দেখা যায়। তবে দায়িত্বরত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের সরিয়ে দেন।

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্রাটকে নিয়ে নেতাকর্মীদের নানা ধরনের ছবি পোস্ট করতে দেখা গেছে। তার পাশে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলতে হুমড়ি খেয়ে পড়ত নেতাকর্মীরা। তার সম্পর্কে নানা গুণগান গেয়ে ছবিসহ ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে দেখা গেছে অসংখ্য নেতাকর্মীকে। কিন্তু গতকাল তিনি গ্রেফতার হওয়ার পর ফেসবুকে কাউকেই তার পক্ষে কোনো শব্দও লিখতে দেখা যায়নি।