'বিদায় বন্ধুরা, দেখা হবে অন্য কোথাও'

মিরপুরে বন্ধ ফ্ল্যাটে স্বামী-স্ত্রী ও সন্তানের লাশ

প্রকাশ: ১১ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সমকাল প্রতিবেদক

বুধবার গভীর রাতে একাধিক বন্ধুর মোবাইল ফোনে এসএমএস পাঠান মিরপুরের ব্যবসায়ী এসএম বায়েজিদ (৪৫)। মেসেজটি ছিল এমন- 'বিদায় বন্ধুরা, দেখা হবে অন্য কোথাও।' এর আট-দশ ঘণ্টা পরই গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে বাসায় মিলল বায়েজিদসহ তার স্ত্রী-সন্তানের লাশ। পুলিশ ও স্বজনদের ধারণা, স্ত্রী কোহিনুর পারভীন অঞ্জনা (৩৭) ও একমাত্র সন্তান কলেজ পড়ূয়া ফারহানকে বিষক্রিয়ায় হত্যার পর বায়েজিদ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় কাপড় পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন।

গার্মেন্টস ব্যবসায় লোকসান করে ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিপুল অঙ্কের টাকা ঋণী ছিলেন বায়েজিদ। পাওনাদারদের চাপ ছিল। কীভাবে ঋণ পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে হতাশায় ছিলেন তিনি। বাবা-মায়ের সঙ্গে দূরত্বও ছিল তার।

বায়েজিদের ফ্ল্যাট থেকে একাধিক চিরকুট উদ্ধার করেছে পুলিশ। কোনোটিতে লেখা সংসারে তার অনেক অভাব। কোনোটিতে লেখা তিনি অনেক ঋণী। পাওনাদাররা তাকে চাপ দিচ্ছেন। ব্যবসাও নেই। কীভাবে টাকা পরিশোধ করবেন, ভেবে কূল পাচ্ছেন না।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বায়েজিদ গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ছিলেন। লোকসানের পর তার গার্মেন্ট বন্ধ হয়ে যায়। কাফরুল থানার পাঁচ নম্বর লেনের ১০/১ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার একটি ফ্ল্যাটে স্ত্রী অঞ্জনা ও ছেলে ফারহানকে নিয়ে বসবাস করতেন তিনি। এটি তার স্ত্রীর বোন ফ্রান্স প্রবাসী রিনার বাসা। গতকাল দুপুর পৌনে ১২টার দিকে বিকল্প চাবি দিয়ে ওই ফ্ল্যাটের দরজা খুলে তিনজনের লাশ দেখতে পান স্বজনরা। অঞ্জনা ও ফারহানের লাশ খাটে পাশাপাশি এবং একই কক্ষে বায়েজিদের লাশ ঝুলছিল সিলিং ফ্যানে। রাত সাড়ে ৮টার দিকে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। এর আগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন ঘটনাস্থল থেকে মৃত্যুর আলামত সংগ্রহ করে। ফারহান মিরপুর চিড়িয়াখানা রোডে অবস্থিত মিরপুর কমার্স কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র।

বায়েজিদের পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, তার বাবার নাম আবুল কাসেম সরকার। কাফরুল থানার দুই নম্বর লেনের স্থায়ী বাসিন্দা। একই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা আব্দুল কুদ্দুসের মেয়ে কোহিনুর পারভীন অঞ্জনার সঙ্গে প্রেম করে বিয়ে করেন বায়েজিদ। প্রেমের বিয়ে হওয়ায় বায়েজিদের সঙ্গে তার বাবা-মায়ের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সঙ্গেই তার সখ্য বেশি ছিল। বাবার নিজস্ব বাড়ি থাকলেও তিনি থাকতেন স্ত্রীর বোন রিনার বাড়িতে। ভাড়া দিতেন নামকাওয়াস্তে। বায়েজিদের বাল্যবন্ধু সাহিদুজ্জামান বলছিলেন, তারা একই স্কুল ও কলেজে পড়ালেখা করেছেন। আনুমানিক ১৯৯৭ সালের দিকে বায়েজিদ সাভারের হেমায়েতপুরে গার্মেন্ট ব্যবসা শুরু করেন। গার্মেন্টসটিতে শুধু পর্দার কাপড় তৈরি হতো। অনেক দিন চালানোর পর সেটিতে বড় অঙ্কের লোকসান হয়। এরপর কিছু দিন বিরতি দিয়ে অন্য ব্যবসা শুরু করেন। সেখানেও লোকসান হয়। এক পর্যায়ে কালশীতে রেস্টুরেন্টের ব্যবসা শুরু করেন তিনি। বছর না যেতে সেটিও বিক্রি করে দিতে হয়। প্রায় দেড় বছর আগে মিরপুরের পর্বতা সেনপাড়ায় আবার গার্মেন্টসের ব্যবসা শুরু করেন। লোকসান হওয়ায় গত জুন মাসে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। এর পর থেকে বেকার ছিলেন তিনি।

স্বজনরা জানিয়েছেন, ছয় দিন আগে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে সিলেটে ঘুরতে যান বায়েজিদ। মঙ্গলবার রাত ১টার দিকে সেখান থেকে বাসায় ফেরেন। এরপর বুধবার সারাদিনে একবারও বায়েজিদ এবং তার স্ত্রী-সন্তানকে বাড়ির তিনতলার ফ্ল্যাট থেকে নামতে বা উঠতে দেখেননি বাড়িটির দারোয়ান আব্দুল জলিল। তিনি জানান, বুধবার দুপুরে তাকে বায়েজিদ ফোনে বলেছিলেন, তিনি গাজীপুরে আছেন। বাসায় কেউ গেলে গাজীপুর থাকার বিষয়টি তিনি যেন তাদের জানান। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে চারজন পাওনা টাকা চাইতে আসেন। বায়েজিদ বাসায় নেই বলে জানিয়ে দেন তিনি। কিন্তু তারা জোর করে তিনতলায় ওঠেন। বায়েজিদের ফ্ল্যাটে নক করে সাড়া না পেয়ে ফিরে যান তারা। পরে ১১টার দিকে বায়েজিদের এক বন্ধু এসেও ভেতর থেকে দরজা বন্ধ পান। পরে তিনি অঞ্জনার ভাই ফারুককে বিষয়টি জানান। ওই বন্ধুকেও রাতে বায়েজিদ এসএমএস পাঠিয়েছিলেন। পৌনে ১২টার দিকে ফারুক বিকল্প চাবি নিয়ে দারোয়ানকে সঙ্গে করে তিনতলায় ওঠেন। দরজা খুলেই বেডরুমে একই খাটে মা-ছেলে এবং ফ্যানে বায়েজিদকে ঝুলতে দেখে তারা চিৎকার করে বেরিয়ে যান। খবর পেয়ে পুলিশ আসে ঘটনাস্থলে। আব্দুল জলিল বলেন, প্রায়ই বিভিন্ন লোকজন পাওনা টাকা চাইতে বায়েজিদের কাছে আসত। মাঝে মধ্যে ব্যাংকের লোকজনও আসত। তবে কোন ব্যাংকের তা তারা বলেননি।

অঞ্জনার বোন নাজনীন পারভীন স্বপ্না জানান, তারা পাঁচ বোন ও এক ভাই। অঞ্জনা সবার ছোট। সংসারের বিষয় নিয়ে অঞ্জনা কখনও তাকে কোনো কিছু জানাননি।

বাড়িটির এক নারী বাসিন্দা বলেন, বায়েজিদ ছেলে হিসেবে ভালো। তবে নিজের পরিবারের সঙ্গে তার মান-অভিমান ছিল। প্রেম করে অঞ্জনাকে বিয়ে করায় বায়েজিদের বাবা-মা মেনে নিতে পারেননি। বায়েজিদও আর বাবার বাড়িতে যাতায়াত করতেন না।

একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যুর খবরে শত শত মানুষ ভিড় জমায় বাড়িটির সামনের সড়কে। ভিড়ের মধ্য থেকে কয়েকজন জানান, বায়েজিদ তাদের বুধবার দিনগত রাত সাড়ে ৩টার দিকে 'বিদায় বন্ধুরা, দেখা হবে অন্য কোথাও' লিখে মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। রাত গভীর হওয়ায় তাদের অনেকেই মেসেজ পড়েননি। সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ায়ও আগে সেটি খেয়াল করেননি। অনেকের সেই এসএমএস পড়া হয়নি। এসএমএসের প্রকৃত অর্থ এমন হতে পারে, সেটি চিন্তায়ও করেননি তারা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) কামাল হোসেন বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, স্ত্রী ও সন্তানকে বিষজাতীয় কিছু খাইয়ে হত্যার পর বায়েজিদ ফ্যানের সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তবে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। তিনি বলেন, ওই ফ্ল্যাট থেকে একাধিক চিরকটু পাওয়া গেছে। তার সারমর্ম এমন- বায়েজিদের সংসারে অভাব এবং তিনি অনেক ঋণী। এডিসি কামাল বলেন, অভাব ও ঋণগ্রস্ত থাকায় এই ঘটনা ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে।