রূপনগরে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ

'আমি মইরা যাইতেছি আমারে বাঁচান'

প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সমকাল প্রতিবেদক

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রণায় কাতর হাত হারানো জান্নাত বেগম— সমকাল

রূপনগরে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে ডান হাত হারানো জান্নাত বেগম শুয়ে আছেন হাসপাতালের বিছানায়। তার চোখেমুখে তীব্র যন্ত্রণা ও আতঙ্কের ছাপ। মাঝেমধ্যে দুর্বলভাবে কিছু বলার চেষ্টা করছেন। তবে তা প্রায় শোনাই যায় না। খুব কাছে গিয়ে কান পাতলে কিছুটা বোঝা যায়। তিনি বলছেন- 'ব্যথা, খুব ব্যথা, সহ্য করতে পারি না ভাই।' কখনও বা বলেন– 'আমি মইরা যাইতেছি, আমারে বাঁচান।'

গতকাল শুক্রবার এমন চিত্রই দেখা গেছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। স্বজনরা জানান, সবসময় জান্নাতের পাশে কাউকে থাকতে হয়, নইলে তিনি খুব ভয় পান ও কাঁদতে শুরু করেন। প্রায় একই অবস্থা এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অপর ছয়জনের। তারা সবাই যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন।

ঢামেক হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক আলাউদ্দিন জানান, আহতদের শারীরিক অবস্থা আগের মতোই, শঙ্কামুক্ত নয়। সবাইকে গভীর পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

বুধবার বিকেলে রাজধানীর রূপনগর আবাসিক এলাকার ১১ নম্বর সড়কের পূর্বপ্রান্তে বেলুনে গ্যাস ভরে বিক্রি করছিলেন আবু সাঈদ নামে এক ব্যক্তি। এ সময় তাকে ঘিরে ভিড় জমিয়েছিল স্থানীয় শিশুর দল। হঠাৎ তার গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে আগুন ধরে যায়। এতে সাত শিশু নিহত হয়। আহতদের কারও হাত উড়ে যায়, কারও নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসে।

ঢামেক সূত্র জানায়, বিস্ফোরণে গুরুতর আহত সাতজন এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তারা হলেন- বেলুন বিক্রেতা আবু সাঈদ, রিকশাচালক জুয়েল সরদার, ছয় বছরের শিশু মিজান, নয় বছরের জনি ও মুস্তাকিম, ১১ বছরের সিয়াম এবং গৃহকর্মী জান্নাত। তাদের মধ্যে সংকটাপন্ন মিজান নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)

চিকিৎসাধীন। বাম হাত ও ডান পায়ে আঘাত পাওয়া সাঈদ পুলিশ হেফাজতে ১০১ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি আছেন। জুয়েলের বাম হাত ও জনির মুখমণ্ডলসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত। দগ্ধ শিশু সিয়াম ও মুস্তাকিমের চিকিৎসা চলছে বার্ন ইউনিটে।

জান্নাতের দেবর মনিরুল ইসলাম সমকালকে জানান, ঘটনার দিন তার ভাবি বাজার করে শিয়ালবাড়ি বস্তিতে ফেরার সময় সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়। এতে তার ডান হাত উড়ে যায়। পেটেও মারাত্মক জখম হয়। পেটে সেলাই দিতে হয়েছে। ক্ষত স্থানটি দেবে গেছে। তার হাতের বিচ্ছিন্ন অংশটি পুলিশের কাছে ছিল। প্রথমে তারা সেটি দিতে চায়নি। এরপর বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি অনেক অনুরোধ করে হাতটি নিয়ে আসেন ঢামেক হাসপাতালে। তবে চিকিৎসকরা জানান, ওই হাত আর জুড়ে দেওয়া যাবে না। তার ভাবি এখনও ভুল করে বাম হাত দিয়ে তার ডান হাতটি খোঁজেন।

প্লাস্টিকপণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের কর্মী মনিরুল জানান, তার ভাই নজরুল ইসলাম পেশায় রিকশাচালক। তাদের সুমাইয়া নামে পাঁচ বছর বয়সী একটি মেয়ে আছে। ঢামেকের চিকিৎসকরা জান্নাতের ব্যাপারে পর্যাপ্ত মনোযোগ দিচ্ছেন না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ঢামেক হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি শিশু মিজানের বাবা রোকন মিয়া পেশায় ভ্যানচালক। তিনি জানান, ঘটনার পর প্রথমে সন্তানকে খুঁজেই পাচ্ছিলেন না। পরে সন্ধ্যায় ঢামেক হাসপাতালে এসে দেখেন, তার ছেলে এখানে ভর্তি। তবে নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে আসায় তার অবস্থা গুরুতর। এখনও সে অচেতন অবস্থায় আছে। চিকিৎসকরা তার ব্যাপারে আশাব্যঞ্জক কিছু বলতে পারছেন না।

বিস্ফোরণের সময় সিলিন্ডারের ভাঙা টুকরা লেগে রিকশাচালক জুয়েল সরদারের বাম হাত ভেঙেছে। তার স্ত্রী রুপালি জানান, হাত ভাঙা ছাড়াও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত পেয়েছেন জুয়েল। তার শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা। একটু পরপরই তিনি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন।

আহত শিশু জনির চোখমুখসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লেগেছে। হাসপাতালের বিছানায় ব্যথায় ছটফট করছে ছোট্ট শিশুটি। তার মা পারভিন আক্তার জানান, সন্তানের কষ্ট দেখে তিনি কান্না চেপে রাখতে পারছেন না। ওর বাবা সুলতান মিয়া রিকশার গ্যারেজে কাজ করেন।

এদিকে চিকিৎসাধীন বেলুন বিক্রেতা আবু সাঈদকে এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। রূপনগর থানার ওসি আবুল কালাম আজাদ জানান, বৃহস্পতিবার আদালতকে জানানো হয়েছে, আসামি আবু সাঈদ এখনও চিকিৎসাধীন। তিনি সেরে উঠলে তাকে আদালতে হাজির করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি ১ ডিসেম্বর এ মামলার এজাহার গ্রহণ ও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দিন ধার্য করা হয়েছে।