বাড়ি নিয়ে বাড়াবাড়ি যাত্রাবাড়ীতে

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

বকুল আহমেদ

কামরুল হাসান পলাশ

কামরুল হাসান পলাশ

ডেভেলপার কোম্পানির মাধ্যমে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ১০ তলা ভবন নির্মাণ করছেন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ফয়েজ আহমেদ ও তার বাবা খাজা আহমেদ। কিন্তু একই এলাকার কামরুল হাসান পলাশের চাঁদাবাজির মুখে পড়েছেন তারা। গত ২০ জুলাই রাতে ফয়েজ আহমেদের কাছে পলাশ পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দিলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এ অভিযোগে ২২ জুলাই যাত্রাবাড়ী থানায় মামলা করেছেন ফয়েজ।

পলাশের বাসা দনিয়ার রসুলপুরে। এক সময় যুবদল করতেন তিনি। পরে নাম লেখান পরিবহন শ্রমিক লীগে। এ সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর বর্তমানে নিজেকে যুবলীগ নেতা হিসেবে পরিচয় দেন তিনি।

শুধু ফয়েজ নন, অভিযোগ রয়েছে দনিয়া ও রসুলপুর এলাকায় ভবন নির্মাণ করতে অনেককেই পলাশ ও তার বাহিনীর চাঁদাবাজির শিকার হতে হয়। যাত্রাবাড়ী এলাকায় লেগুনা, অটোরিকশা ও ফুটপাত থেকেও চাঁদাবাজি করে এই বাহিনী। যদিও জীবনের ভয়ে মামলা করা দূরে থাক, মুখ খুলতেও সাহস করেন না ভুক্তভোগীরা। হুমকির মুখে কেউ কেউ মামলার পথে না হেঁটে আপস করে ফেলেন।

শনিরআখড়া থেকে নীলক্ষেত রুটে লেগুনা ব্যবসায়ী সাহাবুদ্দিন শেখ সমকালকে জানান, এসএসপি ব্যানারে তাদের ৮-১০টি লেগুনা চলে। গত অক্টোবরে পলাশ তার কাছে মাসে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদার টাকা না দিলে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। সাহাবুদ্দিন আতঙ্কিত হয়ে পলাশের সঙ্গে বিষয়টি মিটমাট করে ফেলেন।

২০১৫ সালের শুরুর দিকে দনিয়ার রসুলপুরের শফিউল্লাহর নির্মাণাধীন ভবনে নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করেন দনিয়ার রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন বাদশা। পলাশ ও তার লোকজন শফিউল্লাহর কাছে বাদশাকে নির্মাণসামগ্রী বিক্রি করতে নিষেধ করেন। এক পর্যায়ে ভবনের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন পলাশ। বাদশাকে মারধরও করা হয়। এ ঘটনায় ২০১৫ সালের ৪ এপ্রিল পলাশ, ইমতিয়াজ, মিঠু, নবীসহ অজ্ঞাত ১০-১২ জনকে আসামি করে যাত্রাবাড়ী থানায় বাদশা মামলা করেন। কিন্তু পলাশের হুমকিতে পরে মামলা চালানোর বদলে স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে বিষয়টি আপস করে ফেলতে হয় তাকে। বন্ধ করতে হয় ওই ভবনে নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করা। এ বিষয়ে জানতে বাদশার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কিছু জানাতে আগ্রহী হননি। তিনি শুধু বলেন, 'আমরা নির্ভেজাল মানুষ। ব্যবসা করে খাই। জীবনের ভয়ে অনেক কিছুই মীমাংসা করতে হয়।'

২২ জুলাই যাত্রাবাড়ী থানায় ফয়েজ আহমেদের করা চাঁদাবাজি মামলায় বলা হয়- ফয়েজ আহমেদ ও তার বাবা খাজা আহমেদদের বাড়ি (নম্বর ৮২) দনিয়ার রসুলপুরে। পুরাতন ভবন ভেঙে তারা ৮২ নম্বর হোল্ডিংয়ে ডেভেলপার কোম্পানির মাধ্যমে ১০ তলা ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেন। ২০ জুলাই রাত সোয়া ৯টার দিকে রসুলপুরের অনাবিল হাসপাতালের সামনে ফয়েজের কাছে পলাশসহ অজ্ঞাত কয়েকজন পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদার টাকা না দিলে নির্মাণাধীন ভবনের কাজ বন্ধ এবং হত্যার হুমকি দেওয়া হয় তাকে।

ফয়েজের করা মামলায় যাত্রাবাড়ী থানা পুলিশ ২২ জুলাই রাতে পলাশ ও তার ছয় সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন পুলিশ তাদের আদালতে হাজির করে। সহযোগীদের মধ্যে রয়েছেন- রাসেল আহম্মেদ (১৯), হৃদয় (১৯), সাব্বির হোসেন (১৮), সরোয়ার হোসেন সজিব (২১), সাগর আহম্মেদ (১৮) ও আবু বক্কর সিদ্দিক (১৯)। আদালতে পাঠানো পুলিশের প্রতিবেদনে বলা হয়- আসামিরা দনিয়ার রসুলপুর এলাকার পেশাদার চাঁদাবাজ এবং একটি সংঘবদ্ধ অপরাধী দলের সক্রিয় সদস্য।

এদিকে গ্রেপ্তারের কয়েকদিন পরই পলাশ জামিনে বেরিয়ে আসেন এবং ফয়েজকে মামলা প্রত্যাহার করে নেওয়ার হুমকি দেন। এ ঘটনায় ৬ অক্টোবর ফয়েজ যাত্রাবাড়ী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।

ফয়েজ বলেন, পলাশ তার কাছে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। এখন মামলা প্রত্যাহার করার জন্যে চাপ দিচ্ছেন। পলাশ হুমকি দিচ্ছেন, ফয়েজ ও তার বাবা খাজা আহমেদকে হত্যা করা হবে। তাদের বাড়ির সামনে প্রায়ই পলাশ ও তার লোকজন মোটরসাইকেল নিয়ে মহড়া দেন। এসবের মধ্যে বাবাসহ তিনি আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।

পলাশ সর্বশেষ গত ২১ নভেম্বর লালবাগ থানার একটি মামলায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। ১৫ নভেম্বর পলাশ তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে লালবাগ থানায় এ মামলা করেন লেগুনাচালক মজিবর রহমান। এজাহারে বলা হয়, মজিবর শনিরআখড়া-নীলক্ষেত রুটে লেগুনা চালান। প্রায়ই সহযোগীদের নিয়ে পলাশ ওই রুটে গাড়ি চালাতে তাকে বাধা দেন। লেগুনা চালানো বন্ধ না করায় ১৪ নভেম্বর সন্ধ্যায় তাকে মারধর করা হয়। এই মামলায় ২১ নভেম্বর পলাশ গ্রেপ্তার হন। কয়েকদিন আগে তিনি আবারও জামিন নিয়ে বেরিয়ে এসেছেন।

যাত্রাবাড়ী থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম বলেন, পলাশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ একাধিক মামলা রয়েছে। তিনি এসব মামলায় একাধিকবার গ্রেপ্তার হয়েছেন।

পলাশের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিক কল করা হয়। কিন্তু সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।