ঢাকায় চীনা নাগরিকের লাশ

খুনের পেছনে নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার লুট

সুষ্ঠু তদন্ত চাইল চীন, পুলিশ জানাল দুই-এক দিনের মধ্যে সব রহস্য উন্মোচন

প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সাহাদাত হোসেন পরশ

ছবি: ফাইল

ঢাকায় চীনা নাগরিক ও ব্যবসায়ী গাওজিয়ান হুই হত্যার নেপথ্যের কারণ অবশেষে জানা গেছে। আর্থিক, ব্যবসায়িক বা পারিবারিক কোনো বিরোধে নয়; পুলিশ বলছে, বনানীর যে বাসায় চীনা ওই নাগরিক বসবাস করতেন সেখান থেকে নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার লুটপাট করতেই টার্গেট করা হয়েছিল তাকে। এ ঘটনায় জড়িতদের ধারণা ছিল- গাওজিয়ানের বাসায় বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার আছে। তাই বাসায় হানা  দিয়ে তা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করে খুনিরা। এরই মধ্যে পরিকল্পিত এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ব্যাপারে সব তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। দুই-এক দিনের মধ্যে সংবাদ সম্মেলন করে গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরা হবে তা। গতকাল একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র সমকালকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

এদিকে ঢাকায় চীনা দূতাবাসের একটি প্রতিনিধি দল গত রোববার ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলামের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তার কার্যালয়ে। ওই প্রতিনিধি দলে ছিলেন ডেপুটি হেড অব মিশন, ফার্স্ট সেক্রেটারি ও প্রকোটল অফিসার। তারা চীনা নাগরিকের হত্যার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি করেন, যাতে প্রকৃত অপরাধীরা ধরা পড়ে। দুই-এক দিনের মধ্যে খুনের রহস্য উন্মোচিত হবে বলে চীনা প্রতিনিধি দলকে দৃঢ়তার সঙ্গে আশ্বস্ত করেন ডিএমপি কমিশনার।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, 'বাসা থেকে নগদ অর্থসহ অন্যান্য জিনিসপত্র হাতিয়ে নিতেই চীনের ওই নাগরিককে খুনিরা টার্গেট করেছিল। খুনিদের ধারণা ছিল তার বাসায় অনেক দামি মালপত্র রয়েছে। নগদ অর্থসহ ওই মালপত্র হাতিয়ে নেওয়া পরিকল্পনা করেছিল ওরা। চীনের নাগরিকের হত্যারহস্য উন্মোচন করতে শুরু থেকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তদন্ত চালায় পুলিশ। শেষ পর্যন্ত হত্যার কারণ জানা গেছে। দুই-এক দিনের মধ্যে সবকিছু আরও পরিস্কার হবে।'

ডিবির উত্তর বিভাগের ডিসি মশিউর রহমান বলেন, 'ঘটনার পরপরই রহস্য উন্মোচনে ছায়া তদন্ত শুরু করে পুলিশ। অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এরই মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অনেক তথ্য পাওয়া গেছে। শিগগিরই সব কিছু সামনে আসবে।'

বনানী এ-ব্লকের ২৩ নম্বর সড়কের ৮২ নম্বর বাসার ছয়তলায় ৬/বি ফ্ল্যাটে থাকতেন ব্যবসায়ী গাওজিয়ান। তিনি পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে পাথর সরবরাহ করতেন। ১১ ডিসেম্বর বনানীর বাসার পেছনের ফাঁকা স্থানে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় লাশ পাওয়া যায় তার। এ ঘটনায় ওইদিন রাতে তার ঘনিষ্ঠজন ঝাং শু হং বাদী হয়ে বনানী থানায় হত্যা মামলা করেন।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, গাওজিয়ানের ফ্ল্যাট থেকে নগদ অর্থ ও মালপত্র লুট করতে তাকে টার্গেট করা হয়। এই হত্যার সঙ্গে জড়িত কেউ কেউ তার পূর্বপরিচিত ছিল। হত্যার পর চীনা নাগরিকের ওই ফ্ল্যাট থেকে কিছু মালপত্র লুট করা হয়। তবে যে পরিমাণ অর্থ ও মালপত্র ওই বাসায় থাকবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, তা পায়নি খুনিরা। এরই মধ্যে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত দুই-এক জনকে গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। আরও একজনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। তবে তদন্তের এই পর্যায়ে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করতে চায়নি পুলিশ।

তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, চীনা ওই নাগরিককে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে- এটা নিশ্চিত হয়েছেন তারা। কারণ, খুনিরা আগেই রেকি করেছিল ওই ভবনের ১১ তলায় ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা থাকলেও তা অকার্যকর ছিল। এছাড়া ঘটনার সময় ভবনের মূল গেটের সিসি ক্যামেরা বন্ধ ছিল। খুনিদের কারও কারও তার বাসায় যাতায়াত ছিল। ঠিক কোন সময় চীনা ওই নাগরিককে হত্যা করা হয়েছে, তার একটি ধারণা তারা পেয়েছেন। নিহতের ব্যবসায়িক অংশীদার এক চীনা নারী জিজ্ঞাসাবাদে এ-সংক্রান্ত কিছু তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশি এক ব্যক্তি গাওজিয়ানের সাড়ে চার কোটিরও বেশি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ ছাড়াও বেশ কয়েকজনের কাছে টাকা পেতেন তিনি। ফলে লেনদেন-সংক্রান্ত বিরোধে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। পরে জানা যায়, ওই বিরোধে হত্যাকাণ্ড ঘটেনি।

তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা জানান, চীনা ওই নাগরিক ধনাঢ্য ঠিকাদার ছিলেন। দোভাষী হিসেবে তিনি যাকে নিয়োগ দিয়েছিলেন তার মাসিক বেতন ছিল ৫০ হাজার টাকার বেশি। গাড়ি চালকের বেতন ছিল মাসে ২৭ হাজার টাকা। দীর্ঘদিন ধরে গাওজিয়ান পদ্মা সেতু প্রকল্পে পাথর সরবরাহ করে আসছিলেন। এছাড়া পায়রাবন্দর নির্মাণকাজে পাথর সরবরাহ করতেন তিনি।

গাওজিয়ানের লাশ এখন রয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গের হিমঘরে। তার স্ত্রী লিউ হুই পুলিশকে জানিয়েছেন, খুনি ধরা না পড়া পর্যন্ত তিনি স্বামীর শেষকৃত্য করবেন না। নইলে তার স্বামীর আত্মা শান্তি পাবে না। যতদিন এ হত্যার রহস্য উদ্‌ঘাটন না হয়, ততদিন লিউ এদেশেই থাকার চেষ্টা করবেন বলেও জানিয়েছেন।