রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের  শান্তিনিকেতন এলাকার বাসায় রাখা বিপুল পরিমাণ টাকা লুটের জন্যই ব্যবসায়ী শাহ মো. তবারক হোসেনকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা স্বজন ও তদন্ত-সংশ্নিষ্টদের। এ ক্ষেত্রে নিহতের পালিত ছেলে পরিচয় দেওয়া সাইফুল ইসলামকে অন্যতম সন্দেহভাজন ভাবা হচ্ছে। তার পরিকল্পনায় পরিচিত কয়েকজন মিলে এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। যদিও ঘটনার পর সাইফুল নিজেই রক্তাক্ত অবস্থায় বেরিয়ে এসে অন্যদের বিষয়টি জানান। তখন তাকেও আহত দেখা গেছে। পুলিশ বলছে, হত্যায় জড়িত অন্তত তিনজন নজরদারিতে রয়েছে। থানা পুলিশের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একাধিক দল রহস্য উদ্‌ঘাটনে কাজ করছে। পুলিশ সুপার হিসেবে পদোন্নতি পাওয়া ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার মুহাম্মদ হাবীবুন নবী আনিছুর রশিদ সমকালকে বলেন, হত্যার কারণ সম্পর্কে এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। শিগগিরই জড়িতদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের শান্তিনিকেতন এলাকার মসজিদ গলির ১৭৮ নম্বর বাসার চতুর্থ তলায় নিজের ফ্ল্যাটে থাকতেন তবারক হোসেন। বুধবার ভোরে ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকে তাকে ছুরিকাঘাত করে দুর্বৃত্তরা। তাকে উদ্ধার করে মহাখালীর একটি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত তবারক মামা প্লাজা নামে মহাখালীর একটি মার্কেটের মালিক। চট্টগ্রামের শফি মাইজভাণ্ডারীর অনুসারী ছিলেন তিনি। খুনের ঘটনায় তার ভাই মোবারক হোসেন বাদী হয়ে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মামলা করেছেন। মামলায় আসামিদের অজ্ঞাত বলা হলেও এজাহারে সন্দেহভাজন পাঁচ-ছয়জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিবির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, হত্যাকাণ্ডের পর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক সাইফুলসহ অন্যদের কাছ থেকে কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। সেগুলো বিশ্নেষণ করে হত্যায় জড়িত কয়েকজকে শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি জড়িত তিনজনকে গ্রেপ্তারে জোর প্রচেষ্টা চলছে। অবশ্য ডিবির আরেকটি সূত্র বলছে, এরই মধ্যে তাদের আটক করা হয়েছে। আজ শুক্রবার এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হতে পারে।

ডিবির অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহাদাত হোসেন সুমা বলেন, নিহতের বাসা থেকে টাকা লুট বা আর্থিক লেনদেন নিয়ে বিরোধের জের ধরে খুনের ঘটনা ঘটে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।

নিহতের স্ত্রী পারভীন ইসমত আরা জানান, তার স্বামীর সহকারী হিসেবে কাজ করতেন সাইফুল। তিনি 'বাবা' ডেকে, হাত-পা টিপে দিয়ে ও নানাভাবে সেবা-শুশ্রূষা করে তবারকের বিশেষ প্রিয়ভাজন হয়ে উঠেছিলেন। এ কারণে তাকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তবে কিছুদিন ধরে সাইফুল সুযোগ নেওয়া শুরু করেন। তিনি টাকা চুরি ও হিসাবে নয়ছয় করতেন। তবারকের স্বাক্ষর জাল করে ব্যাংক থেকে টাকা তোলার ঘটনাও ঘটেছে। এতে তার ওপর অসন্তুষ্ট হন তবারক। তিনি নতুন কাজের লোক খুঁজছিলেন। এটা জানতে পেরেই সম্ভবত সাইফুল তার সঙ্গীদের নিয়ে হত্যাকাণ্ড ঘটান।

পারভীন ইসমত আরা জানান, মাইজভাণ্ডারীর অনুসারী ও মার্কেটের প্রচুর লোকজন প্রতিদিনই বাসায় আসতেন। তাদের কেউ কেউ বাসায় থাকতেন। সংসার-সন্তান ছেড়ে তাদের ব্যাপারেই বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ায় স্বামীর সঙ্গে তার বাগ্‌বিতণ্ডা হতো। পরে ২০১৭ সালে তিনি বড় মেয়ের মহাখালীর বাসায় থাকতে শুরু করেন। তবে স্বামীর সঙ্গে তার যোগাযোগ ছিল। তবারক হোসেন সাইফুলের বিষয়সহ অনেক কথাই স্ত্রীকে বলতেন। সাধারণ ঘরের ছেলে সাইফুল দুই বছর কাজ করেই গাড়ি কিনেছেন, জমি কিনেছেন। এর থেকে তার আর্থিক লুটপাটের ব্যাপারে ধারণা পাওয়া যায়।

তিনি আরও বলেন, মার্কেটের ভাড়া বাবদ মাসে পাঁচ-ছয় লাখ টাকা পেতেন তবারক। প্রায় পুরো টাকাই তিনি বাসায় রাখতেন। আনুমানিক ৫০-৬০ লাখ টাকা হয়তো বাসায় ছিল। ওই টাকা লুটের জন্যই খুনের ঘটনা ঘটান সাইফুল। না হলে তিনি খুনিদের দরজা খুলে দেবেন কেন? তা ছাড়া হত্যায় ব্যবহূত ছুরিগুলো কেনার রসিদ তার পকেটে পাওয়া গেছে। তার সহযোগী হাসান, সোহাগ, নাইম, জাভেদ ও সোহেলের এতে সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। মহাখালীর মার্কেটটি নিয়ে মামলা চলমান থাকলেও সে কারণে হত্যার ঘটনা ঘটে বলে মনে করেন না পারভীন।

মামলার বাদী মোবারক হোসেনেরও ধারণা, টাকা লুটের জন্যই তার ভাইকে হত্যা করা হয়। আর সাইফুল এতে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।

বুধবার খুনের পরপরই পুলিশ সাইফুল ও দুই নিরাপত্তাকর্মীকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। তবে গতকাল পর্যন্ত তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি।

পারিবারিক সূত্র জানায়, তবারক হোসেনের মরদেহ মর্গের হিমঘরে রাখা হয়েছে। আজ শুক্রবার তার যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী ছেলে শাহাদত হোসেন তুষার দেশে ফিরবেন। এরপর মরদেহ গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের চরপাড়ায় নিয়ে দাফন করা হবে।

বিষয় : তেজগাঁওয়ে ব্যবসায়ী খুন

মন্তব্য করুন