ঢাকা শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪

সুটকি নদীর মালিক কে?

সেমিনারে নাগরিক সমাজের প্রশ্ন

সুটকি নদীর মালিক কে?

শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে সেমিনারের আয়োজন করা হয়। ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৬:৫৮ | আপডেট: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩ | ১৬:৫৮

হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলা দিয়ে বয়ে যাওয়া সুটকি নদীর মালিক জনগণ নাকি একটি ফিসারিজ প্রতিষ্ঠানের মালিক। তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশিষ্ট নাগরিক, অ্যাক্টিভিস্ট ও বিশেষজ্ঞরা। 

তারা বলেন, ১৭৯৩ সালে ইংরেজ শাসনামলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইন বলে জমিদার ও তালুকদাররা নদী ও ভূমির মালিকানা পান। পরবর্তীতে ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বাতিল করা হলে নদী ও ভূমির মালিকানা সরকারের উপর বর্তায়। কিন্তু হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচংয়ে অবস্থিত জমিদার পরিবার সুটকি নদী যাতে আবার নিজেদের দখলে নিতে পারে সেজন্য ১৯৬০ সালে তারা ইয়াহিয়া ফিশারিজ প্রাইভেট কোম্পানি নামক একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠান তৈরি করে।

পাকিস্তানি আমলে তারা নদীর দখল না পেলেও বাংলাদেশ স্বাধীন হলে ১৯৭২ সালে সুটকি নদীকে বিল দেখিয়ে এর ভূমির নামজারি, দখল ও ভোগের দাবি করে ইয়াহিয়া ফিশারিজের পক্ষে দেওয়ান ইয়াহিয়া রাজা একটি স্বত্ব মামলা দায়ের করে। ১৯৭৩ সালে সিলেট সাব-জজ আদালত তার পক্ষে রায় দেন। ১৯৯২ সালে সিলেট জেলা প্রশাসন রিভিউ মামলা করে ইয়াহিয়া রাজার নামজারি আদেশ বাতিল করে সরকারের নামে রেকর্ড পুনর্বহাল করতে সক্ষম হয়। কিন্তু ওই আদেশের বিরুদ্ধে ১৯৯৬ সালে ইয়াহিয়া রাজা হবিগঞ্জ যুগ্ম জেলা জজ আদালতে আবার স্বত্বজারী মামলা দায়ের করেন। বর্তমানে সেখানে মাছ ধরতে গেলে বন্দুক নিয়ে তেড়ে আসে কোম্পানির লোকজন, নদীতে অবৈধভাবে বসানো হয়েছে ব্লক। এখন প্রশ্ন আসে- নদীর মালিক কে?

শনিবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘দখলের গ্রাসে সুটকি নদীর ২৬ কিলোমিটার: ৫০ বছরে নদী লুট ঠেকাতে নাগরিক আহ্বান’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন’, ‘নোঙর বাংলাদেশ ট্রাস্ট’, ‘নিরাপদ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন’ এবং ‘ইনিশিয়েটিভ ফর পিস’ যৌথভাবে এর আয়োজন করে।

হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন ও ইনিশিয়েটিভ ফর পিসের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন প্রাণ-প্রকৃতি-প্রতিবেশ-পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সংগঠক অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ। অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন- বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান হাওলাদার, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সাবেক প্রধান নির্বাহী শীপা হাফিজা, গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান, আরডিআরসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ এবং নিরাপদ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ইবনুল সাঈদ রানা। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নোঙর বাংলাদেশ ট্রাস্টের চেয়ারম্যান সুমন শামস্‌।

অনুষ্ঠানে আনু মুহাম্মদ বলেন, নদী রক্ষা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের লক্ষ্য হওয়া উচিত। কিন্তু যারা নদী দখল করে তারা বড় ব্যবসায়ী ও রাজনীতিক। তাই এটি রাজনৈতিক দলগুলোর এজেন্ডায় আসেনা। এজন্য রাজনৈতিক দলগুলোর উপর চাপ দিতে হবে। তিনি বলেন, সুটকি নদীর দখলদারিত্ব নদী দখলের ঘটনার প্রতিনিধিত্ব করে। সারাদেশে এমন আরও বহু ঘটনা ঘটছে। নদীকে দেখার জন্য আমাদের আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি এখনও সেরকমভাবে তৈরি হয়নি। শীতলক্ষ্যার পাড়ে আমরা এখনও দেখছি- শুধু সিমেন্ট কারখানা। জিডিপি বৃদ্ধির সঙ্গেও নদী দখল জড়িত। কিছুদিন আগে একজন মন্ত্রী বললেন, ‘এতো চওড়া নদীর দরকার নেই। নদী ভরাট করে জমি বানাতে হবে।’ অতীতে নদী নিয়ে আন্দোলনকারীকে ক্রসফায়ারেরও হুমকি দেওয়া হয়েছে এদেশে।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, দেশের সামগ্রিক নদী প্রশাসনের অবস্থা বেশ ঘোলাটে। ভরাট, দখল, উচ্ছেদপ্রক্রিয়া সবই যেন টাকার খেলা। নদী রক্ষা করতে হলে সাহসিকতা ও সততার সঙ্গে কাজ করতে হবে।

মূল প্রবন্ধে সুমন শামস্‌ বলেন, হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং উপজেলার ‘সুটকি নদী’ একটি অসাধারণ নদী। দেশের প্রতিটি রেকর্ডে যা নদী হিসেবেই নিবন্ধিত এবং উল্লেখিত রয়েছে। এরপরও ওই নদীটি ১৯৭৩ সালে আদালতের রায়ে এবং তৎকালীন সিলেট জেলা প্রশাসনের চরম হঠকারিতায় ব্যক্তির মালিকানায় চলে যায়। এরই মাঝে পানি উন্নয়ন বোর্ড সরকারি টাকায় ওই নদীটি খনন করে এবং সেক্ষেত্রে ওই ব্যক্তিরই অনুমতি নেয়।

আরও দূর্ভাগ্যজনক যে, হবিগঞ্জের বর্তমান জেলা প্রশাসক নদীকে ‘বদ্ধ জলাশয়’ বানিয়ে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ২৬ মাইল দীর্ঘ একটি নদী কীভাবে ‘বদ্ধ জলাশয়’ হতে পারে তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।

সভাপতির বক্তব্যে মুহাম্মদ শফিকুর রহমান ২৩ মে কে জাতীয় নদী দিবস হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানের আহ্বান জানান। এছাড়াও নদীভিত্তিক বিতর্ক প্রতিযোগিতা ও শিশুদের মধ্যে নদী সচেতনতা সৃষ্টিতে গবেষণা প্রচলনের ঘোষণা প্রদান করেন।

আরও পড়ুন

×