ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচন উপলক্ষে একধরনের উৎসবে মেতে উঠেছে নগরবাসী। পাশাপাশি সমৃদ্ধ নগরজীবনের প্রত্যাশাও বাড়ছে তাদের। নতুন মেয়র কে হবেন, মেয়র তাদের কেমন নগরী উপহার দেবেন- তা নিয়েও আগ্রহের কমতি নেই। কিন্তু আমাদের জেনে রাখা দরকার যে, ঢাকার দুই মেয়রের ক্ষমতা কিন্তু অসম্ভব সীমিত। যদিও আমরা বলি নগর পিতা, কিন্তু তাদের কাজ করার ক্ষমতা মফস্বলের একজন মেয়রের চেয়ে অনেক কম।

উন্মুক্ত দৃষ্টিতে যদি দেখি, তাহলে ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়রদ্বয় সাধারণত তিনটি কাজ করতে পারেন। এক. ট্যাক্স আদায় করা, দুই. রাস্তাঘাট পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করা এবং তিন. রাস্তায় বৈদ্যুতিক বাল্ক্ব সংযোজন করা। তারা কিন্তু রাস্তা থেকে বৈদ্যুতিক খুঁটি সরানোর ক্ষমতাটুকুও রাখেন না। ঢাকার বাইরের মেয়ররা পানির সংযোগ ও দালানকোঠার অনুমোদন দেওয়াসহ অনেক কাজ করতে পারেন, যেগুলো ঢাকার মেয়ররা করতে পারেন না। এমন বাস্তবতায়ও নগরবাসী মেয়রদের কাছে প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা আশা করেন।

ঢাকা সিটির একজন মেয়র প্রায় ৩০ লাখ মানুষের ভোটে নির্বাচিত হন। সংখ্যার হিসাবে এই ভোট প্রায় ১৬টি সংসদীয় আসনের সমান। অর্থাৎ একজন মেয়র প্রায় ১৬ জন এমপির সমান ভোটে নির্বাচিত হন। সেই মানুষটিকে যদি আমরা ক্ষমতায়ন করতে চাই, তাহলে নগর সরকারের বিকল্প নেই। এরপরও বলব- যতই সীমাবদ্ধতা থাকুক না কেন, ভালো কাজ করার অনেক সুযোগ তাদের থাকে। মেয়র সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত। এটাই তার বড় ক্ষমতা। কারণ সংসদীয় পদ্ধতির যে কোনো দেশে সংসদ চাইলেই প্রধানমন্ত্রীকে সরিয়ে দিতে পারে। কিন্তু একজন মেয়রের মৃত্যু বা মানসিক বিকৃতি (পাগল) হওয়ার আগে তাকে অপসারণ করার সুযোগ নেই। আমরা যদি মেয়রদের ক্ষমতায়ন করতে পারি, তাহলে তারা সঠিকভাবে জনগণের সেবা করতে পারবেন।

ঢাকা শহরের জনগণের সহযোগিতা করার জন্য সাতটি মন্ত্রণালয় নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে। এই সাতটি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আরও অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠান নগরবাসীকে সেবা দিতে চায়, কিন্তু তাদের ভেতরে কোনো সমন্বয় না থাকার কারণে কোনো সেবা সঠিকভাবে পায় না নগরবাসী। ঢাকা শহরে চারটি প্রতিষ্ঠান ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ করছে, কারও সঙ্গে কারও সমন্বয় নেই। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে মেয়রকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হবে।

ঢাকাবাসীর মৌলিক সমস্যাগুলোর মধ্যে যানজট, জলাবদ্ধতা, মশা ও অপরিচ্ছন্নতা অন্যতম। সিটি করপোরেশনের অর্থায়নে যে রাস্তা নির্মাণ হয়, সেই রাস্তায় পরিবহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা মেয়রের নেই। সিটি এলাকার ট্রাফিক সিস্টেমের ব্যবস্থা করেছে সিটি করপোরেশন, কিন্তু সেই সিস্টেম নিয়ন্ত্রণ করা বা ট্রাফিক পুলিশ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা মেয়র রাখেন না। যে কারণে দেখা যায়, সিগন্যালে লাল বাতি জ্বললে পুলিশ গাড়ি ছেড়ে দেয় আর সবুজ বাতি জ্বললে গাড়ি আটকে দেয়। এই সমন্বয়হীনতার চিত্র নিত্যই দেখা যায়। যানজট নিরসন সিটি মেয়রের ক্ষমতার বাইরে। কিন্তু তিনি যদি উদ্যোগ নেন, সব পক্ষকে নিয়ে সমন্বয় করতে পারেন, তাহলে এ সমস্যা নিরসন সম্ভব। এ কাজটি কিছুটা করে দেখিয়েছেন আনিসুল হক। তিনি গুলশান এলাকায় ঢাকার চাকা চালু করে প্রমাণ করেছেন, ঢাকা শহরের যানজট নিরসন করা সম্ভব।

আমরা দেখি দুটি প্রাইভেটকার রাস্তায় যতখানি জায়গা নেয়, ঠিক ততখানি জায়গা নেয় একটি বাস। দুটি প্রাইভেটকারে সর্বোচ্চ ১০ জন মানুষ বসা থাকেন, অন্যদিকে একটি বাসে ৫০ জনের মতো যাত্রী থাকেন, আর দোতলা বাসে থাকেন ৮০ জনের মতো। তার মানে ৮০ জনের জায়গা দখল করে আছে দুটি প্রাইভেটকার। আমরা যদি গণপরিবহন উন্নত করতে পারি, আনন্দদায়ক, জনবান্ধব ফুটপাত তৈরি করে হাঁটার উপযোগী করতে পারি, তাহলে যানজট এমনিতেই কমে আসবে। উন্নত গণপরিবহন ও ফুটপাতের সঙ্গে দরকার জননিরাপত্তা। নিরাপত্তা না থাকলে এসব কাজে আসবে না। উন্নত গণপরিবহন করতে হলে পরিবহন কোম্পানির সংখ্যা কমিয়ে আনতে হবে। শতাধিক কোম্পানিকে একীভূত করে ৫/৬টি কোম্পানিতে পরিণত করে রুট ভাগ করে দেওয়া যেতে পারে। এতে ওই রুটের সব গাড়ি রুটিন মাফিক চলাচল করবে, যে কোনো পার্কিংয়ে গাড়ি দাঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পেছনে আরেকটি গাড়ি এসে দাঁড়াবে। সামনের গাড়িতে যারা উঠতে পারবেন না, তারা পেছনের গাড়িতে উঠবেন। এতে ওই কোম্পানির কোনো লোকসান হবে না। এর জন্য দরকার আইনের কঠোর প্রয়োগ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। এটা আমাদের দেশে করা সম্ভব- এর আগে তিন দিনের আন্দোলনে সে বিষয়টি প্রমাণ করেছে আমাদের খুদে শিক্ষার্থীরা।

মশা মারা নিয়ে আমরা অনেক কথা বলি। দুই মেয়র যদি একমত হন, তাতেও কি মশা দূর হবে? হবে না। কারণ ঢাকা শহরের মধ্যে বেশ কিছু এলাকা রয়েছে, যেমন ক্যান্টনমেন্ট, বিমানবন্দর ও পিলখানা। এগুলোর ওপর মেয়রের কোনো ক্ষমতা নেই। মেয়র চাইলেও মশা তাড়াতে পারবেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত অনুমতি না পাওয়া যায়। এই অসহায়ত্বের ভেতরেও তারা চাইলে কিছু কাজ করতে পারেন, যেটা আনিসুল হক প্রমাণ করে গেছেন। মশা তাড়াতে হলে সিটি মেয়রদের দাবি করতে হবে, তারা ৩০ লাখ মানুষের প্রতিনিধি- তাদের আর্মি, বিজিবি, সিভিল এভিয়েশনসহ ঢাকার বাইরের জেলাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে। এভাবে দুই বছর সমন্বিতভাবে কাজ করা গেলে ঢাকা শহর সম্পূর্ণ মশামুক্ত হবে। জলাবদ্ধতার সমাধান করতে চাইলে বাসাবাড়ির পানি পাইপে করে সড়কে আনা বন্ধ করতে হবে। কারণ ঢাকার রাস্তায় যে পরিমাণ বৃষ্টি হয়, তাতে জলজট হওয়ার কথা নয়। আমাদের উচিত বৃষ্টির পানি রাস্তায় না ফেলে সংগ্রহ করে দৈনদিন কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করা। এতে অর্থব্যয়ও কমে আসবে। এ ক্ষেত্রে ওয়াসা ও সিটি করপোরেশনকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সবচেয়ে ভালো হবে ওয়াসাকে সিটি করপোরেশনের অধীনে ছেড়ে দিলে।

সুষ্ঠু ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতে মেয়রের অধীনে ট্রাফিক পুলিশ থাকা দরকার। ঢাকা নগরীতে পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট নেই। মেয়েরা বিকেলে রাস্তায় বের হতে চাইলে সকালে পানি খাওয়া ছেড়ে দেয়। সে কারণে ঢাকায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী কিডনি রোগে ভুগছেন। দৈনন্দিন জীবনে অভ্যস্ত হওয়ায় এগুলো আমাদের চোখে পড়ে না। এর পাশাপাশি নগরীর বেদখল হওয়া মাঠগুলো দখলমুক্ত করে জনকল্যাণে উন্মুক্ত করতে হবে। এই কাজগুলো করা গেলে আগামী ৩-৪ বছরের মধ্যেই ঢাকা শহরের বৈপ্লবিক পরিবর্তন সম্ভব। এভাবে কাজ করতে পারলে একদিকে যেমন মেয়রদ্বয়ের গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে, অন্যদিকে নগরীর বিভিন্ন ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণের যে জায়গাগুলো আমলারা দখল করে রেখেছেন, সেগুলোও ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন। এটা করা গেলে ধীরে ধীরে নগর সরকার গঠন করা সম্ভব আর নগর সরকার হলে মানুষ মেয়রের কাছ থেকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা পাবেন। এই পর্যায়ে আসতে হলে মেয়রদের অনুভব করতে হবে, তাদের পেছনে ৩০ লাখ লোক দাঁড়িয়ে আছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- যারা মেয়র নির্বাচিত হবেন, তারা শুধু দলের মেয়র না হয়ে অবশ্যই নগরবাসীর মেয়র হবেন, সবার দিকে সমান নজর দেবেন।