গ্রেপ্তারের পর চমকপ্রদ তথ্য

রূপকথার জীবন দুই ভাইয়ের

বংশপরম্পরায় জুয়াড়ি

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২০     আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাহাদাত হোসেন পরশ

গ্রেপ্তার দুই ভাই রুপন ভূঁইয়া ও এনামুল হক এনু - সমকাল

গ্রেপ্তার দুই ভাই রুপন ভূঁইয়া ও এনামুল হক এনু - সমকাল

দু'জনের চেহারায় অনেক মিল। একই স্টাইলে দাড়ি রেখেছেন তারা। শরীরের গড়নও প্রায় অবিকল। যে কেউ দেখলেই বলবে, তারা সহোদর। সত্যিই তারা গুণধর সহোদর বটে! ক্যাসিনোঝড়ের আলোচনায় ছিল পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়ার এ দুই ভাই আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা এনামুল হক এনু ও রুপন ভূঁইয়া।

গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর গেণ্ডারিয়ায় এনু-রুপনের বাসায় অভিযান চালিয়ে বিপুল অর্থ ও স্বর্ণ জব্দ করেছিল র‌্যাব। তবে প্রায় সাড়ে তিন মাস পলাতক ছিলেন তারা। গত সোমবার ভোররাতে ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যায় ১০ তলা বাড়ির ষষ্ঠতলায় নাটকীয় অভিযান চালিয়ে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি গ্রেপ্তার করেছে তাদের। এ সময় তাদের হেফাজতে ৪০ লাখ টাকা পাওয়া গেছে।

গ্রেপ্তারের পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদে যে চমকপ্রদ কাহিনি বেরিয়ে এসেছে, তা রূপকথার গল্পকে হার মানায়। দীর্ঘদিন পর আবার ক্যাসিনোকাণ্ডে দুই রাঘববোয়াল গ্রেপ্তার হলেন। এ দুই সহোদর পুরান ঢাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী ডাকাত শহীদ একসময় যেসব খাত থেকে চাঁদা তুলত, সেসব খাত নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন।

সাড়ে তিন মাসের পলাতক জীবন: এনু-রুপনকে জিজ্ঞাসাবাদে যুক্ত সিআইডির একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা সমকালকে জানান, র‌্যাবের অভিযানের পরপরই গা-ঢাকা দেন দুই ভাই। প্রথম তিন দিন ঢাকাতেই পালিয়ে ছিলেন তারা। এরপর দুই ভাই একসঙ্গে কক্সবাজারে চলে যান। সেখানে একাধিক হোটেলে অবস্থান করেন। চারটি হোটেলে ঘুরেফিরে ১৫ দিন থাকার পর আবার ঢাকায় চলে আসেন তারা। আসার আগে বিশ্বস্ত কর্মচারী শেখ সেলিম মোস্তফার মাধ্যমে কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা এলাকার সাবান ফ্যাক্টরি রোডে ১০ তলা বাড়ির ষষ্ঠতলার একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন তারা। একটি বিলাসবহুল চেয়ারকোচে কক্সবাজার থেকে সরাসরি কেরানীগঞ্জের ওই ফ্ল্যাটে গিয়ে গত বছরের ৯ অক্টোবর ওঠেন এনু-রুপন। এর পর থেকে তিন মাস ওই ফ্ল্যাটে কার্যত গৃহবন্দি ছিলেন তারা। একবারের জন্যও বাসা থেকে বের হননি। কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে তা মোস্তফার মাধ্যমে মেটাতেন। এনুর বাবা সিরাজুল হক ভূঁইয়া গুরুতর অসুস্থ হয়ে ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি। গ্রেপ্তার এড়াতে বাবাকে হাসপাতালে দেখতে যাননি দুই ভাই। এমনকি পরিবারের কোনো সদস্যকেও কেরানীগঞ্জের ওই ফ্ল্যাটে তারা নেননি।

নাটকীয় গ্রেপ্তার: দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, একাধিক সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে এনু-রুপনের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছিল। সর্বশেষ রোববার সিআইডি জানতে পারে, কেরানীগঞ্জের একটি বাসায় তারা অবস্থান করছেন। বাসার অবস্থান মোটামুটি নিশ্চিত হওয়ার পর সোমবার ভোর ৪টার দিকে ওই ফ্ল্যাটে অভিযান চালানো হয়। দরজায় কড়া নাড়ার পর ভেতর থেকে প্রথমে কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। ১০-১৫ মিনিট পর একজন নারী দরজা খুলে দেন। তখন সিআইডি জানতে পারে, ওই নারী এনু-রুপনের কর্মচারী মোস্তফার স্ত্রী। ওই বাসায় মোস্তফা, তার স্ত্রী, এক শিশু ও আরেক বৃদ্ধ নারীকে দেখতে পায় সিআইডি। এনু-রুপনের বিষয়ে জানতে চাইলে তারা জানান, বাসায় আর কেউ থাকেন না। এরপর সিআইডির সদস্যরা আরেকটি কক্ষে গিয়ে দেখেন, সেখানে লেপ বিছানো। টেবিলের ওপর দামি সিগারেট। কয়েকটি সিগারেটের খণ্ডাংশ পড়ে আছে। আগাম গোয়েন্দা তথ্য ও এসব আলামত দেখে তারা নিশ্চিত হন, ওই রুমে কিছু সময় আগেও কেউ ছিলেন। তবে ফ্ল্যাটের বিভিন্ন কক্ষে খোঁজাখুঁজি করেও তারা দুই ভাইয়ের সন্ধান পাচ্ছিলেন না। একপর্যায়ে বাসার ভেতরে শীতের পোশাক রাখার ছোট্ট কার্নিশের দরজা খুলে তল্লাশি চালানো হয়। এ সময় হঠাৎ একজনের পা বেরিয়ে আসে। তাকে টেনে বের করার সময় ভেতর থেকে আরেকজন চিৎকার করে ওঠেন। এরপরই সন্ধান মেলে দুই ভাইয়ের। পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর তারা পোশাক পরিবর্তন করার জন্য কিছু সময় চান। ওই সময়ের মধ্যে বাসায় তল্লাশি করে একটি ড্রয়ারে ৪০ লাখ টাকা পাওয়া যায়।

ভুয়া পাসপোর্টে বিদেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা: ক্যাসিনোহোতা দুই ভাই জানান, ভুয়া নাম-ঠিকানায় তারা পাসপোর্ট তৈরি করার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। এ জন্য এক দালালের সঙ্গে তাদের ৩০ হাজার টাকার চুক্তি হয়। শামীম পরিচয়ে পাসপোর্ট বানাতে চেয়েছিলেন রুপন। তবে এনু তার নকল নাম ঠিক করেননি। গ্রেপ্তারের পর তাদের কাছ থেকে ১২টি সিমকার্ড পাওয়া গেছে। ক্যাসিনোকাণ্ডের পর এনু-রুপন স্মার্টফোন ব্যবহার করতেন না। বাইরে কোনো প্রয়োজন থাকলে বিশ্বস্ত কর্মচারী মোস্তফা ছাড়াও আরও দুই ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির মোবাইলে তারা কল করতেন। তাদের ফোনের মাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন দুই ভাই। ভুয়া পাসপোর্টে তাদের প্রথমে নেপাল যাওয়ার কথা ছিল। সেখান থেকে ভারত-মালয়েশিয়া হয়ে ইউরোপে পাড়ি জমানোর পরিকল্পনা ছিল তাদের।

রূপকথার জীবনের শুরু : এনু ও রুপন জানিয়েছেন, তারা সাত ভাই ও এক বোন। তার বাবা একসময় নিয়মিত আজাদ ক্লাবে জুয়া খেলতে যেতেন। দু'জনের লেখাপড়ার গণ্ডি দশম শ্রেণি পার হয়নি। জীবনের শুরুতে পুরান ঢাকায় লেদ মেশিনের দোকানে কাজ করতেন দুই ভাই। এরপর খুলে বসেন লোহার শিটের কারবার। তবে সেই কারবারে খুব একটা লাভ হতো না তাদের। দুই ভাইয়ের রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়ার নেপথ্যে ছিল ক্যাসিনো কারবার নিয়ন্ত্রণ। তারা দুই ভাই তার বাবার সঙ্গে প্রায়ই ওই আজাদ ক্লাবে যেতেন। পরে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সঙ্গে তারা জড়ান। প্রথমে ওই ক্লাব ভাড়া নিয়ে ওয়ান-টেন খেলার ব্যবস্থা করেন এনু-রুপন। সেই খেলায় তাদের খুব একটা লাভ হতো না। তাদের জুয়ার কারবারের অংশীদার ছিলেন জনৈক শান্তি ও মোবারক। এরপর তারা ক্যাসিনো কারবারে নামেন। বছর তিনেক আগে পরিচয় হয় নেপালি নাগরিক হ্যারির সঙ্গে। হ্যারি তাদের হয়ে ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে ক্যাসিনো গেমের আসর বসান। ক্যাসিনোর সরঞ্জাম হ্যারির মাধ্যমে ক্লাবে ঢোকে। লাভের নির্দিষ্ট অঙ্ক তারা পেতেন। প্রতিদিন রাত ১০টার দিকে দুই ভাই ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে যেতেন। ওই সময় হ্যারির কাছ থেকে লাভ-লোকসানের হিসাব নিতেন তারা। ক্যাসিনো চালানো শুরু করার পর প্রতিদিন তাদের বড় অঙ্কের টাকা লাভ থাকত। মূলত বাবার হাত ধরে বড় ধরনের জুয়াড়ি হয়ে ওঠেন তারা। এ জুয়ার মাধ্যমে বদলে ফেলেন নিজেদের জীবনের গল্প। এক জামা-প্যান্ট বেশি দিন পরতেন না দুই ভাই। পড়াশোনা বেশিদূর না করলেও চালচলনে অনেক স্মার্ট তারা। তবে ক্যাসিনো অভিযানের পর থেকে নিজেদের আড়াল করতে দুই ভাইয়ের কেউ দাড়ি কাটেননি।

নেশা বাড়ি ও স্বর্ণ কেনার: এখন পর্যন্ত ঢাকায় এনু-রুপনের ২২টি বাড়ি থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। মূলত বাড়ি কেনা দুই ভাইয়ের নেশা। ২০০০ সালের পর থেকে অধিকাংশ বাড়ি কিনেছেন তারা। তাদের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে সোনালি রং বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। বাড়ির গেট এবং অধিকাংশ কমোডও সোনালি রঙের। মূলত সোনালি রং দুই ভাইয়ের প্রিয় রং। এখন পর্যন্ত ছয়টি দেশ ঘুরেছেন তারা। কোনোবারই এনু-রুপন একে অন্যকে ছাড়া যাননি। এমনকি দেশেও তারা একসঙ্গে চলতেন। এর আগে র‌্যাবের অভিযানে তাদের নগদ পাঁচ কোটি টাকা, ৭২০ ভরি বা আট কেজি স্বর্ণালঙ্কার ও ছয়টি আগ্নেয়াস্ত্র জব্দ করা হয়। পলাতক থাকা অবস্থায় তারা পাঁচটি আগ্নেয়াস্ত্র জমা দিয়েছেন। এরই মধ্যে দুই ভাইয়ের নামে যেসব বাড়ির খোঁজ মিলেছে তার মধ্যে রয়েছে- ৪০ গুরুদাস সর্দার লেনের নির্মাণাধীন ২০ তলাবিশিষ্ট বাড়ি, ১ নম্বর নারিন্দার চারতলা বাড়ি, ১৫ নারিন্দা লেনের ছয়তলা বাড়ি, মনির হোসেন লেনের ৬৪ নম্বর বাড়ি, গুরুদাস সর্দার লেনের ৬/২ নম্বর বাড়ি, শরৎগুপ্ত রোডের ৩৯ নম্বর বাড়ি, শাহসাহেব লেনের ৬৯, ৭১ ও ৭৩ নম্বর বাড়ি, ডিস্টিলারি রোডের ১২৪/৫, ৩৯ নম্বর বাড়ি, লালন মোহন সাহা স্ট্রিটের ১১৯/১, ১২১ ও ১০৬ নম্বর বাড়ি, ভজহরি সাহা স্ট্রিটের ৪৪/বি নম্বর বাড়ি, দক্ষিণ মৈশুন্দির ৭১/১, কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়ায় দুটি, সিরাজদীখান ও রাজেন্দ্রপুরে চারটি বাংলো বাড়ি।

স্বপ্ন ছিল কাউন্সিলর হওয়া : সিআইডির জিজ্ঞাসাবাদে রুপন জানান, সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে তিনি এলাকা থেকে এবার কাউন্সিলর হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। অনেক দিন ধরে এলাকাবাসীর নানা সমস্যায় পাশে দাঁড়ান তারা। জনপ্রতিনিধি হয়ে এলাকাবাসীর সেবার কথা ভাবছিলেন তিনি। ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের পরিচালক এনু ছিলেন গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। আর তার ভাই রুপন ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক।

আজ রিমান্ড আবেদন: সিআইডির ইকোনমিক ক্রাইম বিভাগের ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, র‌্যাবের ওই অভিযানের পর এনু ও রুপন কক্সবাজারে চলে যান। সেখান থেকে তারা নৌপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ওই পথে যেতে না পেরে কেরানীগঞ্জে এসে আশ্রয় নেন। এরপর ভুয়া পাসপোর্ট তৈরি করার পরিকল্পনা করেন তারা। মানি লন্ডারিং আইনে চারটি মামলায় আজ তাদের আদালতে হাজির করে রিমান্ড আবেদন করা হবে।

সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিনহাজুল ইসলাম সমকালকে জানান, দুই ভাইয়ের নামে ২২টি বাড়ি ও জমি এবং পাঁচটি যানবাহনের সন্ধান মিলেছে। বিভিন্ন ব্যাংকে ১৯ কোটি ১১ লাখ টাকা রয়েছে তাদের। তাদের ৯১টি ব্যাংক হিসাব এখন অবরুদ্ধ আছে।

দুই ভাইয়ের ভাষ্য: অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে এনু-রুপন সমকালের কাছে দাবি করেছেন, তাদের এত বাড়ি, গাড়ি ও স্বর্ণালঙ্কারের নেপথ্যে তাদের লেদ ও লোহার শিটের ব্যবসা। এমনকি পূর্বপুরুষ জমিদার ছিলেন বলে দাবি তাদের। প্রায় সব বাড়িতে তাদের ভাইবোনের অংশীদারিত্ব রয়েছে বলে জানান তারা। অবশ্য এটা অকপটে স্বীকার করেছেন, ঢাকায় তাদের প্রায় সব বাড়ি ও স্বর্ণালঙ্কার কিনেছেন ২০০০ সালের পর। এমন স্বীকারোক্তির পর তাদের পরিবার পুরোনো ধনী, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এমনকি এলাকায় সকলেই বলছেন, এনু-রুপনের বিত্তবৈভবের নেপথ্যে রয়েছে ক্যাসিনোর অর্থ।