ঢাকায় নতুন কৌশলে সেই পুরোনো অপরাধ

'ভাঙা মোবাইল' ও ধাক্কা ফাঁদ

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

আতাউর রহমান

পেশায় আইনজীবী ইলিয়াছ সুমন পুরান ঢাকার নাজিমুদ্দীন রোড দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ করে এক যুবকের সঙ্গে ধাক্কা লাগে তার। যুবকের মোবাইল ফোনটি রাস্তায় পড়ে ভেঙে যায়। ফোনের মালিক চিৎকার দেয়, ক্ষতিপূরণ দাবি করে।

ওই যুবকের পক্ষ নিয়ে মীমাংসার জন্য এগিয়ে আসে আরও দু'জন। বিব্রত পথচারী আইনজীবী তার পকেটে থাকা ২৮শ' টাকা দিয়ে মীমাংসার চেষ্টা করেন। বিধি বাম! এত অল্প ক্ষতিপূরণ নিতে রাজি নয় যুবক। শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি। একপর্যায়ে ব্যাংক কার্ড দিয়ে এটিএম বুথ থেকে আরও ১৯ হাজার টাকা 'ক্ষতিপূরণ' দিয়ে রক্ষা পান আইনজীবী। 

তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া পুরো ঘটনাটি নিয়ে সন্দেহ হয় আইনজীবী সুমনের। তিনি চকবাজার মডেল থানায় মামলা করেন। পুরো ঘটনা শুনে সন্দেহ বাড়ে পুলিশেরও। সন্ধান চলে মোবাইল ফোন ভেঙে যাওয়া সেই যুবকের। শেষ পর্যন্ত গত ২৩ জানুয়ারি পুরান ঢাকার বকশীবাজার এলাকা থেকে সেই যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তার নাম জানা যায় রায়হান আহমেদ অন্তু। বয়স ২৫। 'ক্ষতিগ্রস্ত' রায়হানের কথা শুনে তাজ্জব বনে যান পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তাও।

গ্রেপ্তার রায়হানের বক্তব্য ধরে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সেদিন সন্ধ্যায় রায়হানের মোবাইল ফোনটি রাস্তায় পড়ে ভাঙেনি। সেটি সে ইচ্ছে করেই ফেলেছিল এবং তা আগেই ভাঙা ছিল। ঘটনার সময়ে মীমাংসাকারী দুই যুবকও পথচারী বা সাধারণ কেউ নয়। তারাও রায়হানের দলের সদস্য। তারা মূলত ঢাকার রাস্তায় নতুন কৌশলে অপরাধ কর্মকাণ্ড শুরু করেছে। এই অপরাধের শিকার মানুষও কিছু বুঝতে পারে না।

পুলিশ সূত্র জানায়, এক সময়ে ঢাকার গুলিস্তান বা ভিড় থাকে এমন এলাকায় ইচ্ছে করেই পায়ের সঙ্গে পা লাগিয়ে এবং ধাক্কা দিয়ে ঝামেলা সৃষ্টি করে পথচারীর সবকিছু হাতিয়ে নিত অপরাধী চক্র। এমনকি পথচারীর শরীরে ইচ্ছে করেই থুথু ছিটিয়ে তা আবার মুছে দেওয়ার ভান করে কৌশলে সবকিছু কেড়ে নেওয়া হতো। সাধারণত ভবঘুরে মাদকাসক্তরা এমন অপরাধ করে আসছিল। সম্প্রতি চকবাজারের চক্রটি চিহ্নিত হওয়ার পর দেখা যায়, সেই পুরোনো অপরাধ নতুন করে নতুন অপরাধীরা শুরু করেছে। রাজধানীতে এই ধরনের বেশ কয়েকটি গ্রুপও তৈরি হয়েছে। তবে তারা মাদকাসক্ত বা ভবঘুরেও নয়।

নাজিমুদ্দীন রোডের ঘটনায় দায়ের মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চকবাজার মডেল থানার উপপরিদর্শক কৃষ্ণপদ মজুমদার সমকালকে বলেন, 'রায়হান দল গঠন করে ঢাকার রাস্তায় নতুন কৌশলে অপরাধ করে আসছিল। এই চক্রের শিকার লোকজন মনে করত সত্যিই মোবাইল ফোনটি ভেঙে গেছে। তাছাড়া চক্রের দুই সদস্যও নিজেদের প্রত্যক্ষদর্শী বলে সাক্ষ্য দেয়। এ জন্য তারা মীমাংসার নামে নগদ টাকা দিয়ে দিত। অহরহ এমন ঘটনা ঘটলেও বিষয়টিকে সত্য মনে করে লোকজন আইনের আশ্রয়ও নেয় না। ফলে নতুন এই অপরাধ সম্পর্কে পুলিশও খুব একটা অবগত ছিল না।'

চকবাজার মডেল থানার ওসি মওদুদ হাওলাদার সমকালকে বলেন, 'অন্তত পাঁচ বছর ধরে রায়হানের চক্র অভিনব কৌশলে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় অপরাধ করে আসছিল। ২০১৭ সালে ওয়ারী এলাকায় একই অপরাধ করতে গিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়ে জেলেও যায়। জামিনে বের হয়ে ভাঙা  মোবাইল ফোন ব্যবহার করে ফের একই অপরাধ শুরু করে। তার চক্রের অপর দুই সদস্যকেও শনাক্ত করা হয়েছে।'

রায়হান পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে জানিয়েছে, নিজের কাছে থাকা ভাঙা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে সে এমন অপকর্ম করে আসছিল। তার দুই সহযোগী জুবায়ের হোসেন শাওন ও জাহাঙ্গীর। তাদের গ্রুপ ছাড়াও রাজধানীতে একই ধরনের আরও গ্রুপ রয়েছে বলেও সে পুলিশকে তথ্য দিয়েছে। নতুন কৌশলের এই অপরাধী জানিয়েছে, সাধারণত সদরঘাট, কোর্ট-কাচারি, বাস, রেলস্টেশনসহ ভিড় থাকে এমন এলাকায় লোকজন টার্গেট করে তারা। ইচ্ছে করেই টার্গেট ব্যক্তির সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে মোবাইল ফোন ফেলে দেয়। এরপর এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়, যাতে আশপাশের লোকজনও ভাবতে থাকে মোবাইল ফোনটি ভেঙে গেছে। তাছাড়া দুই সহযোগী প্রত্যক্ষদর্শী পথচারী সেজে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য জোরালো ভূমিকা রাখে। এতে টার্গেট ব্যক্তি বুঝতেই পারে না পুরো ঘটনাটি সাজানো ছিল।