২০১৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর গে ারিয়ার দুই ভাই এনামুল হক এনু ও রুপন ভূ?ঁইয়ার আস্তানা থেকে পাঁচ কোটি টাকা ও আট কেজি স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধার করেছিল র‌্যাব। মাত্র সাড়ে চার মাসের মাথায় সর্বশেষ গত বুধবার আবার তাদের বাড়ির ভল্টে মিলল সাড়ে ২৬ কোটি টাকা, এক কেজি স্বর্ণ, বিদেশি মুদ্রা ও পাঁচ কোটি টাকার এফডিআর। এ ছাড়া গত ১৩ জানুয়ারি কেরানীগঞ্জ থেকে সিআইডির হাতে গ্রেপ্তারের সময় তাদের হেফাজত থেকে ৪০ লাখ টাকা পাওয়া যায়। পুরান ঢাকার স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাবেক এ দুই নেতার যে আস্তানায় হাত দেওয়া হচ্ছে সেখান থেকেই যেন মিলছে 'টাকা-স্বর্ণের খনি'। প্রশ্ন হলো, ভল্টে, ফ্রিজে যে কোটি কোটি টাকা মিলল, তা কতটুকু বৈধ? কীভাবে এলো এত টাকা? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে চমকপ্রদ তথ্য মিলল। সর্বশেষ যে ট্যাক্স ফাইল এনু-রুপন জমা দিয়েছেন, তাতে মাত্র ছয় কোটি টাকার অর্থ-সম্পদের হিসাব দেখান তারা। এরই মধ্যে দুই ভাইয়ের আস্তানায় যে পরিমাণ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার পাওয়া গেছে, তার তুলনায় তাদের বৈধ সম্পদের পরিমাণ নস্যি। তাদের নামে-বেনামে আর্থিক লেনদেনের বেশ কিছু নথি সমকালের হাতে এসেছে। এসব নথি বিশ্নেষণ করেই দুই ভাইয়ের দুর্নীতি-অনিয়মের নানা চিত্র পাওয়া যায়।
রিমান্ডে এনু-রুপনকে ট্যাক্স ফাইলে তাদের অর্থ-সম্পদ গোপন করার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিলেন গোয়েন্দারা। তাদের জবাব, একজন আইনজীবী তারা নিয়োগ দিয়েছেন যেন তাদের সব কিছুর হিসাব দেখিয়ে নতুনভাবে ট্যাক্স ফাইল জমা দেওয়া হয়। তবে ওই আইনজীবী আপডেট ট্যাক্স ফাইল জমা দিতে বিলম্ব করে ফেলেন।
এরই মধ্যে সব মিলিয়ে এনু-রুপনের এক হাজার কোটি টাকার অর্থ-সম্পদের হিসাব পেয়েছে মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। ৯৯৪ কোটি টাকার অর্থ-সম্পদের হিসাব গোপন করে গেছেন তারা। বৈধ আয়ের সূত্র না থাকায় বিপুল পরিমাণ এই কালো টাকা সাদা করার কোনো পথ খুঁজে বের করতে পারেননি তারা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র থেকে গতকাল এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্ত-সংশ্নিষ্ট উচ্চপদস্থ একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে জানান, গত ছয় বছরে এনু-রুপনের নামে বিভিন্ন ব্যাংকের ৯১টি হিসাব নম্বরে ১০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়েছে। এসব হিসাব নম্বরে অনেকেই টাকা জমা ও উত্তোলন করেছেন। যারা দুই ভাইয়ের হিসাব নম্বরে টাকা লেনদেনের সঙ্গে জড়িত তাদের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এমন অন্তত ১২০ জনকে আগামী সপ্তাহ থেকে সিআইডির কার্যালয়ে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কেন কী কারণে এনু-রুপনের হিসাব নম্বরে তারা টাকা জমা দিয়েছেন, তা জানতে চাওয়া হবে। এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর না পেলে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ব্যাংকিং নথি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঢাকা ব্যাংকে রুপনের ১৩টি এফডিআর রয়েছে। একেকটি হিসাব নম্বরে সর্বোচ্চ ৩২ লাখ থেকে সর্বনিম্ন ১০ লাখ টাকা জমা রয়েছে। এফডিআরসহ অন্যান্য হিসাব নম্বরে অন্তত ৩০ কোটি টাকা জমা থাকার তথ্য মিলেছে। একটি বেসরকারি ব্যাংকের নয়াবাজার ব্রাঞ্চের একটি হিসাব নম্বরে ২২ কোটি ৫ লাখ ১০ হাজার ৪০৮ টাকা জমা রয়েছে। ওই হিসাব নম্বরটি তাদের স্টিল হাউসের নামে। সেই হিসাব নম্বরে সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ১২২ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। তাদের ব্যবসার ধরনের সঙ্গে তুলনা করলে ব্যাংক লেনদেনের হিসাব অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন গোয়েন্দারা।
উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, এনু-রুপন ট্যাক্স ফাইলে তাদের মালিকানাধীন একটি স্টিল হাউসের লাভ-লোকসানের হিসাব দেয়। সেখানে তাদের মূলধন দেখানো হয় ছয় কোটি টাকা। ওই মিল থেকে বছরে ২০ লাখ টাকা আয়ের কথা বলা হয়।
মূলত পুরান ঢাকার আলোচিত দুই ভাইয়ের আয়ের প্রধান উৎস ছিল ক্যাসিনো কারবার। মতিঝিলের ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ভাড়া নিয়ে তারা দীর্ঘদিন ধরে এ কারবার চালিয়ে আসছিলেন। ক্যাসিনোতে তাদের কর্মীর সংখ্যাই ছিল ৪৫০ জন। প্রতিদিন ২০০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত একেক কর্মীকে পরিশোধ করতেন তারা। শুধু ক্যাসিনো কারবার নয়, ক্যাসিনোর নানা সরঞ্জামও বিদেশ থেকে এনে বিভিন্ন ক্লাবে টাকার বিনিময়ে সরবরাহ করা ছিল তাদের পেশা। এনু-রুপনের বিভিন্ন বাসায় কয়েক টন ক্যাসিনো সরঞ্জাম রয়েছে। ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের ক্যাসিনোর পাশাপাশি বিভিন্ন দামি হোটেল থেকে খাবার এনে বিক্রি করতেন তারা। কারও দরকার হলে মদও সরবরাহ করা হতো। কয়েকজন নেপালি সুন্দরীকে ভাড়া করে ক্যাসিনোর ঘুঁটি, মদ ও খাবার সরবরাহ করতেন।
জানা গেছে, এনু-রুপন তাদের বাবার দ্বিতীয় ঘরের সন্তান। এক সময় তার বাবা খুলনায় বইয়ের কারবার করতেন। পুরান ঢাকার চকবাজারে তাদের বাবার লাইব্রেরি ছিল। বইয়ের কারবার থাকলেও নিয়মিত জুয়া খেলতেন তিনি। মূলত বাবার কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে দুই ভাই পাকা জুয়াড়ি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
এরই মধ্যে এনু-রুপনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মানি লন্ডারিং মামলায় আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন চারজন। তাদের মধ্যে একজন হলেন শেখ সানি মোস্তফা। তিনি হলেন দুই ভাইয়ের বিশ্বস্ত কর্মচারী। কেরানীগঞ্জের তার বাসা থেকেই এনু-রুপনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মূলত ক্যাসিনোয় যাতায়াতকারীদের বিভিন্ন হোটেল থেকে মদ, খাবার এনে দিতেন মোস্তফা। এরপর নেপালি তরুণীরা তা পরিবেশন করতেন। দিনে ৭০ হাজার টাকায় ভাড়ায় ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন তারা। ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়া আরেকজন হলেন সাইফুল ইসলাম। তিনি ওই ক্লাবের কর্মচারী। সাইফুলের কাজ ছিল এনু-রুপনের হয়ে ক্যাসিনোর টাকার একটি ভাগ প্রতি মাসে নির্দিষ্ট লোকজনের কাছে পৌঁছে দেওয়া। দুই ভাইয়ের একটি রেজিস্টার খাতা পাওয়া গেছে। যাদের নিয়মিত মাসোহারা দিতেন সেই তালিকা ওই খাতায় রয়েছে। এ ছাড়া আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের কর্মচারী নবীর হোসেন ও তুহিন মুন্সী। কারা কীভাবে ক্যাসিনোর টাকায় লাভবান হয়েছিলেন সে তথ্য তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
একাধিক কর্মকর্তা জানান, মাথা ঠান্ডা রাখার জন্য দীর্ঘদিন ধরে একটি বিদেশি ওষুধ খেয়ে আসছেন এনু-রুপন। গ্রেপ্তারের পর অনেক দিন পরিবার থেকে তাদের ওই ওষুধ সরবরাহ করা হয়। 'একটু কঠিন' জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলেন। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) আরেকটি পৃথক মামলায় রিমান্ডে নিয়ে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে। তবে তারা সব সময় নগদ অর্থের বিষয়টি গোপন করে আসছিলেন।
তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এখন পর্যন্ত দুই ভাইয়ের ২২টি বাড়ি, ১২২টি ফ্ল্যাট, ৮টি প্লট ও একাধিক গাড়ির সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। যেসব বাড়ির খোঁজ মিলেছে তার মধ্যে রয়েছে ৪০ গুরুদাস সর্দার লেনে নির্মাণাধীন ২০ তলাবিশিষ্ট বাড়ি, ১ নম্বর নারিন্দার চারতলা বাড়ি, ১৫ নারিন্দা লেনের ৬ তলা বিশিষ্ট বাড়ি, মনির হোসেন লেনের ৬৪ নম্বর বাড়ি, গুরুদাস সর্দার লেনের ৬/২ নম্বর বাড়ি, শরৎগুপ্ত রোডের ৩৯ নম্বর বাড়ি, শাহ সাহেব লেনের ৬৯, ৭১ ও ৭৩ নম্বর বাড়ি, দক্ষিণ মৈশুি র ৭১/১, কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়ায় ২টি, সিরাজদীখান ও রাজেন্দ্রপুরে ৪টি বাংলো বাড়ি। সিআইডির কর্মকর্তারা বলছেন, এনু-রুপন অধিকাংশ বাড়ির মালিককে ভয়-ভীতি দেখিয়ে অল্প টাকায় কিনেছেন। যাদের কাছ থেকে বাড়ি কেনা হয়েছে ভূমি অফিস থেকে তাদের তথ্য সংগ্রহ করে সাবেক সব বাড়িওয়ালাকে ডাকা হবে। এরই মধ্যে দুই ব্যক্তি সিআইডির কাছে অভিযোগ করেন, এনু-রুপন তাদের বাড়ি জোর করে কিনে নেন।
সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ সমকালকে বলেন, এনু-রুপনের এক হাজার কোটি টাকার অর্থ-সম্পদের খোঁজ পাওয়া গেছে। এই চক্রে আর কারা জড়িত তা বের করার চেষ্টা চলছে। তদন্ত শেষে যৌক্তিক সময়ে চার্জশিট দেওয়া হবে।
সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজিম উদ্দিন আল আজাদ বলেন, যেহেতু ট্যাক্স ফাইলে দুই ভাই অর্থ গোপন করেছেন, তাই তাদের প্রায় সবই কালো টাকা। এ অবৈধ অর্থ-সম্পদ কোন প্রক্রিয়ায় অর্জন করেছেন, তা নিয়ে বিশদ তদন্ত চলছে।

বিষয় : এনু-রুপনের টাকার খনি

মন্তব্য করুন