নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ ঝন্টু ঋষির সঙ্গে সখ্য ছিল হুমায়ুন কবিরের। জরুরি প্রয়োজনে সে ১০ হাজার টাকা চাওয়ায় তাই আপত্তি করেননি ঝন্টু। তবে ঘনিষ্ঠজনের এই উপকার করাই যেন কাল হয়ে দাঁড়ায় তার জন্য। পরে টাকা চাইতে গেলে দু'জনের মধ্যে বাকবিতণ্ডা-মনোমালিন্য হয়। এর জের ধরে শ্বাসরোধে ঝন্টুকে হত্যা করে হুমায়ুন। রাজধানীর খিলক্ষেতে বৃদ্ধ খুনের ক্লুলেস মামলার তদন্তে বেরিয়ে এসেছে এসব তথ্য।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত উপকমিশনার জুনায়েদ আলম সরকার সমকালকে বলেন, 'পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একা থাকতেন ৬০ বছর বয়সী ঝন্টু ঋষি। লোকজনের সঙ্গে তেমন মিশতেন না। ফলে তালাবদ্ধ বাসা থেকে তার লাশ উদ্ধারের পর এ ঘটনার ব্যাপারে তথ্য পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়ে। তবে গোয়েন্দা তৎপরতার একপর্যায়ে হত্যায় জড়িত হুমায়ুন কবিরকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় নেওয়া সম্ভব হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সে হত্যার বিস্তারিত বর্ণনা দেয়। পরে আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও সে এসব বলেছে।'

তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা জানান, জুতা তৈরির কাজ করতেন ঝন্টু ঋষি। তিনি খিলক্ষেতের টানপাড়া সরকারবাড়ি এলাকার খ-৬৮/২ নম্বর বাসায় থাকতেন। তার বড় ভাই সুমন্ত ঋষি গত ৫ ফেব্রুয়ারি খিলক্ষেত থানায় অভিযোগ করেন, ৩০ জানুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে কোনো এক সময়ে তার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। তবে কারা হত্যা করেছে সে ব্যাপারে তিনি কোনো ধারণা দিতে পারেননি। এ ঘটনায় খিলক্ষেত থানায় একটি হত্যা মামলা হয়। থানা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি উত্তর বিভাগের উপকমিশনার মশিউর রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী ক্যান্টনমেন্ট জোনাল টিম মামলাটির ছায়াতদন্ত শুরু করে। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত হুমায়ুন কবিরকে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি নিকুঞ্জ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে হুমায়ুন জানায়, সে তিন বছর ধরে নিকুঞ্জ-২ এর পশ্চিম প্রান্তে বসবাস করে আসছে। ঢাকায় এসে প্রথমে নিকুঞ্জ কল্যাণ সমিতিতে সাড়ে ছয় হাজার টাকায় নাইটগার্ডের চাকরি নেয়। সেখানে পাঁচ মাস কাজ করার পর চাকরি ছেড়ে দেয় এবং রিকশা চালাতে শুরু করে। ওই সময় ঝন্টু ঋষির সঙ্গে তার পরিচয় হয়, ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। ঘটনার মাস খানেক আগে সে ঝন্টুর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ধার নেয়। হত্যাকাণ্ডের দু'দিন আগে পাওনা টাকা চান ঝন্টু। হুমায়ুন টাকা দিতে দেরি হবে বলে জানালে ঝন্টু তাকে বকুনি দেন। এতে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয় হুমায়ুন। ঘটনার রাত সাড়ে ১১টার দিকে সে ঝন্টুর বাসায় যায়। এ সময় টাকা পরিশোধের জন্য সে আবারও সময় বাড়ানোর কথা বলে। তবে ঝন্টু তার কথায় কর্ণপাত না করে তাকে চলে যেতে বলে ঘুমিয়ে পড়েন। হুমায়ুন তার পরও ওই ঘরে থেকে যায়। একপর্যায়ে সে ঘরে থাকা একটি দড়ি দিয়ে ঘুমন্ত ঝন্টুর পা বেঁধে ও আরেকটি দড়ি দিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে শ্বাসরোধে তাকে হত্যা করে। পালানোর সময় সে ঘরের দরজায় বাইরে থেকে তালা দিয়ে চলে যায়।

ডিবি সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারের পর হুমায়ুন কবিরকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক জসীম উদ্দীন দেওয়ান। তখন হুমায়ুন জানায়, ঝন্টুকে মেরে ফেললে আর টাকা পরিশোধ করতে হবে না- এমন চিন্তা থেকেই সে খুনের সিদ্ধান্ত নেয়। এর আগে ঝন্টুর দুর্ব্যবহারের কারণে তার মনে জমে থাকা ক্ষোভও এ ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে।