জেসিআই-সমকাল-সিটি আলো উদ্যোগ

১১ সফল নারীর মুখে বৃত্ত ভাঙার গল্প

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

শনিবার গুলশানের সিটি আলো সেন্টারে 'উইমেন আউট অব দ্য বক্স' অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী সফল নারীদের সঙ্গে উদ্যোক্তারা- সমকাল

শনিবার গুলশানের সিটি আলো সেন্টারে 'উইমেন আউট অব দ্য বক্স' অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী সফল নারীদের সঙ্গে উদ্যোক্তারা- সমকাল

নারী মানেই সংসার আর সন্তান সামলাবেন- কিছুদিন আগেও সমাজে এই ধারণা ছিল প্রকট। দেশের নানা প্রান্তে আজও এই ধারণা পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে সামাজিক ও পারিবারিক নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বৃত্ত ভেঙে সফল হয়েছেন কেউ কেউ। তেমনই ১১ সফল নারী শোনালেন তাদের মনোমুগ্ধকর গল্প। তাদের কেউ বিশ্বদরবারে দেশকে চেনাতে স্বপ্নের ইউরোপ ছেড়ে দেশে এসে হাতে তুলে নিয়েছেন সোনালি আঁশ। জাতিসংঘের লোভনীয় চাকরি ছেড়ে কেউ শুরু করেন প্রতিবন্ধীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া। পাড়া-প্রতিবেশীদের কটূক্তি সয়েও লক্ষ্যে অটুট থেকে কেউ হয়েছেন ফিফার রেফারি। কেউ নৌবাহিনী কিংবা বাংলাদেশ পুলিশে পোক্ত করেছেন নিজেদের অবস্থান।
একদিন যারা তাদের সমালোচনায় মুখর ছিলেন, তাদের কাছেই এখন গর্বের স্বজন তারা। অবশ্য জীবনের বাঁকে বাঁকে হাজার বাধা মাড়িয়ে এমন অবস্থান তৈরি করার পরও অনেকে তাদের সাফল্যকে ভালো চোখে দেখেন না। তবু এই নারীরা স্বপ্ন দেখেন যে, তাদের অনুসরণ করে অন্য নারীরা স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে চলবেন স্বমহিমায়।
গতকাল শনিবার বিকেলে রাজধানীর গুলশানে সিটি আলো সেন্টারে 'উইমেন : আউট অব বক্স' শীর্ষক অনুষ্ঠানে নারীরা তাদের এগিয়ে চলার গল্প শোনান। জেসিআই নর্থ এবং সমকাল যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের সহযোগিতায় ছিল সিটি ব্যাংকের 'সিটি আলো'। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মাসরুর আরেফিন।
অনুষ্ঠানে নিজেদের সফলতার গল্প শোনান জনপ্রিয় লেখিকা আনোয়ারা সৈয়দ হক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো অর্থনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ, পিএফডিএ
ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টার ট্রাস্টের চেয়ারম্যান সাজিদা রহমান ড্যানী, ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকোর হেড অব লিগ্যাল অ্যান্ড এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স মুবিনা আসাফ, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার কামরুন নেছা, ওয়ার্ল্ডভিশন ইন্টারন্যাশনালের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপক লে. কমান্ডার (অব.) ফারজানা তান্নি, কণ্ঠশিল্পী নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি, দেশের প্রথম ফিফা রেফারি জয়া চাকমা, বইবাজারডটকমের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান দোয়েল আক্তার এবং ইকো মনার্কি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাশরেকা বিনতে মোশাররফ।

মুস্তাফিজ শফি বলেন, শুরু থেকে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে কিছু নীতি-আদর্শকে ধারণ করেই সমকাল কাজ করে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েই আমরা এগিয়ে চলেছি। সেই শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সকল নারীকেই এগিয়ে আসতে হবে। নারী অগ্রযাত্রায় সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।

নারী জাগরণের অগ্রপথিক বেগম রোকেয়ার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে ঘরের মধ্যে রেখে কোনো জাতির উন্নয়ন সম্ভব নয়। সমাজের সকল বৃত্ত ভেঙে নারী এগিয়ে যাবেই। অর্থনৈতিক ক্ষেত্র থেকে শুরু করে সমাজ বিনির্মাণেও অবদান রাখবে নারীরা। তিনি আরও বলেন, ১১ নারী প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে আলোকিত ও সফল। আমরা বিশ্বাস করি, তাদের এ আলো দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারীর মধ্যে ছড়িয়ে দিতে হবে।

মাসরুর আরেফিন বলেন, শুরু থেকেই নারী উন্নয়নে তাদের আলাদা ব্যাংকিংয়ের ইচ্ছা ছিল। তাই দেশের নারীদের অর্থনৈতিক মুক্তির পথ দেখানোর উদ্দেশ্যেই সিটি আলোর যাত্রা। সেই উদ্দেশ্য থেকেই 'কফিশপ ব্রাঞ্চ' গড়ে তোলা হয়েছে। অর্থাৎ কফি-কথা-ব্যাংকিং। এটা যেন হয়ে ওঠে রাজধানীর সব নারীর নীতিনির্ধারণের স্থান। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নারীদের সমস্যা-সম্ভাবনার গল্প হবে এখানেই। কফি খেতে খেতে নেটওয়ার্ক তৈরি হবে। সেই ইচ্ছা থেকেই নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৭০ নারীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, গুলশানের সিটি আলোর এই শাখায় নারীরা যত কথা বলবেন, ততই জানতে পারবেন অনেক সত্য ঘটনা।

আনোয়ারা সৈয়দ হক বলেন, অর্থনৈতিকভাবে বাবার প্রতি নির্ভরশীল পরিবার থেকেই আমরা সবাই এগিয়ে এসেছি। প্রত্যেক পরিবারের মায়েরা অনেক লাঞ্ছনা-বঞ্চনার মধ্য দিয়ে তাদের মেয়েদের এ জায়গায় পৌঁছে দিয়েছেন। আমার চলার পথও ছিল বন্ধুর। তখন ১৩-১৪ বছরেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিত। যে বাড়িতে ১৪ বছরের মেয়েকে বিয়ে দেওয়া হতো না, সে পরিবারের বাবা-মাকে লাঞ্ছনার শিকার হতে হতো। এমনকি ওই সময় ১১ হাতের শাড়ি পেঁচিয়ে রিকশায় চড়িয়ে মেয়েদের স্কুলে পাঠানো হতো। কেউ ৬-৭ বছর বয়সী মেয়ের মুখ দেখে ফেললেই বাবা-মাকে কথা শুনতে হতো। সেই অবস্থা থেকে প্রতিটি মানুষের মধ্যে, প্রতিটি মেয়ের মধ্যে শত বাধা ঠেলে আলোর প্রদীপ জ্বেলে দিয়েছেন আমাদের মায়েরা।

শাহীন আনাম বলেন, সব মহীয়সী নারী, যারা আমাদের ভিত তৈরি করে দিয়েছেন, আওয়াজ তুলেছেন অন্যায় আর অবিচারের বিরুদ্ধে, তাদের আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আমরা আজকের অবস্থানে এসেছি। বাংলাদেশের নারীরা এগিয়ে গেছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই নারীর পদচারণা রয়েছে। তবে আরও অনেক দূর এগোতে হবে। পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে এখনও নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়নি। এজন্য এখনও নারীরা পারিবারিকভাবে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। নারীর মধ্যে অনেক রূপ রয়েছে। কেউ শিক্ষিত, কেউবা অশিক্ষিত। প্রতিবন্ধী নারীও আছেন। পাহাড়ি, আদিবাসী নারীও আছেন। তাই কাউকে পেছনে ফেলে রাখা যাবে না। তাদের ক্ষেত্রে কী কৌশল অবলম্বন করা যায়, সে বিষয়ে ভাবতে হবে। নারীর উন্নয়ন করতে হলে সবার কথাই ভাবতে হবে। বাংলাদেশের লাখ লাখ নারী বাড়ির বাইরে গিয়ে কাজ করেন না বলে পারিশ্রমিক পান না। তাদের মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ, তারা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অবদান রেখে যাচ্ছেন। এ সম্মানটা পরিবার থেকেই দিতে হবে। তাহলে নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতাও কমতে থাকবে। ঘর থেকেই নারীর কাজের স্বীকৃতি দিতে হবে।

ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ছোটবেলা থেকেই একটু ব্যতিক্রম ছিলাম। নাচ, গান, অভিনয়ে যেমন বুঁদ হয়ে ছিলাম, পড়াশোনায়ও বিন্দুমাত্র অবহেলা করিনি। জীবনে কোনোদিন দ্বিতীয় হইনি। খুব অল্প বয়সে মা হয়েছি। তবে কখনও সমস্যাকে সমস্যা মনে করিনি। যোগ্যতা দিয়েই একটি অবস্থান তৈরি করেছি। তবে চলার পথ যে একেবারেই সহজ ছিল, তা নয়। পদে পদে অনেক প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়েছি। বাস্তবতা হলো, আমরা অনেকে নির্যাতনের কথা বলতেই পারি না। সংগ্রামের গল্পগুলো বলা যায় না। জীবনের গল্প তুলে ধরতে অন্যের আশ্রয় নিতে হয়। নারীর সব কাজকে সম্মান করতে হবে। গৃহ নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। সবার বোঝা উচিত যে, প্রত্যেকেরই স্বপ্ন দেখার অধিকার রয়েছে। সে অধিকার যেন কেউ কেড়ে না নেয়।

সাজিদা রহমান ড্যানী বলেন, জাতিসংঘের চাকরি ছাড়ার পর অনেকেই গ্রহণ করতে চায়নি। আর যখন একেবারেই অস্তিত্ব নেই এমন একটি কাজ শুরু করেছি, তখন তো কেউই মানতে পারেনি। কিন্তু আমি আমার লক্ষ্যে অটুট থেকেছি। আমার এগিয়ে চলার পেছনে মায়ের ভূমিকা অনেক বেশি। যে জায়গা থেকে উঠে এসেছি, ভাবতেই পারি না যে, আমি এই পর্যায়ে আসতে পেরেছি। জীবনের পরতে পরতে অনেক প্রতিবন্ধকতা ডিঙিয়ে এসেছি। এ জায়গায় আসাটাই ছিল অনেক চ্যালেঞ্জের। আমি উপলব্ধি করেছি, আমাদের মধ্যে যে ক্ষমতা আছে, পুরুষের মধ্যে নেই। মাতৃত্বের ক্ষমতাই নারীকে অনন্য করে তোলে। কিন্তু সমাজ এই ক্ষমতাকে মানতে চায় না। হতাশা থেকে দমে গেলে নারী এগিয়ে যেতে পারবে না।

মুবিনা আসাফ বলেন, অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আইন পেশায় আমি একটি অবস্থান তৈরি করেছি। অন্য অনেক পেশার মতো আইন পেশায়ও নারীর কাজ সহজ নয়। এর মধ্যে নিম্ন আদালতে তো আরও কঠিন অবস্থা। দীর্ঘ ২৭ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে বলতে পারি, এখনও নিম্ন আদালতে নারীদের কাজের জায়গা মসৃণ হয়নি। আমরা এগিয়েছি, আরও অনেক এগিয়ে যেতে চাই। ২০২০ সালে এসেও আমরা যদি হতাশার কথা বলতে থাকি, আমাদের চলার পথ কঠিনই হয়ে থাকবে। এ জন্য পুরুষের উচিত নারীদের কাজকে সম্মান করে তাদের পাশে দাঁড়ানো।

কামরুন নেছা বলেন, বেড়ে ওঠার গল্পটা খুব সহজ ছিল না। শৈশবেই বাবার মৃত্যুতে পরিবারে ছন্দপতন হয়। তবে লেখাপড়ায় ভালো থাকায় পরিবারের সবার উৎসাহ পেয়েছি। অনেক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের মধ্যেই স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হই। শিক্ষাজীবনের পরে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা পদে চাকরিতে যোগ দিলেও বিসিএসের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশে যোগ দিই। যে সময় পুরুষ সহকর্মীদের দেখতাম শুক্রবারে বিশ্রাম নিত, সেই সময় আমি পরীক্ষা দিতে ঢাকায় চলে আসতাম। বিসিএসের লিখিত পরীক্ষা শেষে বিকেলে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলেন তিনি। এ বিষয়ে বলেন, প্রবল আগ্রহ কাজ করেছিল বলেই মেয়েরা যে বয়সে বিয়ের প্রস্তুতি নেয়, সে বয়সে আমি বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। পরবর্তীকালে শাশুড়ি ও স্বামীর সহযোগিতা তার চলার পথটা মসৃণ করে দেয়। একজন মেয়ে হিসেবে কোনো জায়গায় তিনি পিছিয়ে ছিলেন না। প্রত্যেক নারী পুলিশ সদস্য দক্ষতা প্রমাণ করেই আজকের অবস্থানে এসেছেন। এ জন্যই দিন দিন নারী পুলিশের সংখ্যা বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, তিনি নারী পুলিশের কর্মপরিবেশ সৃষ্টি করেছেন।

ফারজানা তান্নি বলেন, দেড় যুগ আগের পরিস্থিতি আরও খারাপ ছিল। তখন আমি নৌবাহিনীতে যুক্ত হতে যাচ্ছি। চারপাশ থেকে অনেক কথা ভেসে আসতে থাকে। পুরুষের মতো চুল ছোট করে এসব চ্যালেঞ্জিং কাজে জড়াব, এটি কেউই মেনে নিতে চায়নি। কিন্তু আমি দমে যাইনি। পেশাগত কারণে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের সুবাদে পৃথিবীর ৩৩টি দেশের নারীর সঙ্গে আমার সখ্য গড়ে উঠেছে। ফলে আমি জানি কোন দেশে নারীর বাধাগুলো কী। দেশে বর্তমানে ৪৯ শতাংশ নারী। আমরা প্রতিটি ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখি। অর্থনীতিতে অবদান রাখছি। অথচ বিস্ময়করভাবে পুরুষের কাছে সেগুলো গ্রহণযোগ্য হয় না। তারা ঘরে ঢুকে প্রথমেই জানতে চায়, আজ সারাদিন তুমি কী কী কাজ করেছ। একজন নারী একই সঙ্গে অনেক চরিত্র বহন করে। সে অনুযায়ী যথাযোগ্য সম্মান পাওয়া যায় না। নারী এগিয়ে গেলেও অনেকের চক্ষুশূল হয়। সবাই মিলে চেষ্টা করে কীভাবে নারীর পথচলা থামিয়ে দেওয়া যায়।

নাজমুন মুনিরা ন্যান্সি বলেন, ঘর থেকেই শুরু হয় নানা বৈষম্য। ভাইবোনের মধ্যেই বৈষম্যের চিত্র স্পষ্ট করে দেওয়া হয়। এ জন্য পরিবারই দায়ী। কারণ, মা-বাবাই তাদের মেয়েকে ভিন্ন দৃষ্টিতে বিবেচনা করে থাকেন। সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, একজন নারী অন্য নারীর দ্বারাও কটূক্তির শিকার হয়ে থাকেন। এ ছাড়া পুরুষ দ্বারা আমরা কতভাবে নির্যাতিত ও নিগৃহীত, সেই চিত্র নতুন কিছু নয়। সংবাদপত্র এ ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে নারী নির্যাতনের করুণ চিত্র, প্রেক্ষাপট এবং প্রতিকার নিয়ে এমন কিছু প্রতিবেদন তুলে ধরতে হবে, যেন নারীরা মানুষ হিসেবে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

জয়া চাকমা মজা করে বলেন, ছোটবেলায় এলাকার এক ক্যাডারকে দেখতাম, যাকে পাড়ার লোকেরা মান্য করত। তখন স্বপ্ন দেখি তার মতো ক্যাডার হবো। পরে বুঝলাম নারীরা তা হতে পারে না। কিন্তু ফিফা রেফারি হয়ে বুঝতে পারি যে, সত্যিই ক্যাডার হয়েছি। এখন আমার হাতে বাঁশি আছে, হলুদ কার্ড, লাল কার্ড আছে। আমি অনেককে শাস্তি দিতে পারি। অনেক সংগ্রাম করে আমাকে এ পর্যায়ে আসতে হয়েছে। প্রথম দু'বার ফেল করার পর তৃতীয়বারে ফিফা রেফারি হিসেবে টিকেছি। এগিয়ে চলার পথে অনেক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছি। হাফপ্যান্ট পরে খেলাধুলা করি, এটি অনেকে মানতে পারত না। কটূক্তি করত। চলার পথে নারীকে নিজের সঙ্গেও যে যুদ্ধ করতে হয়, সে বিষয়ে একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না। তবু সব বৃত্ত ভেঙে ঠিকই নিজের কাঙ্ক্ষিত অবস্থানে পৌঁছতে পেরেছি।

দোয়েল আক্তার বলেন, আমার প্রথম পরিচয় আমি একজন মানুষ। আমার বিপরীত স্রোতে হাঁটার গল্পটি একেবারেই অন্যরকম। যখন বই বিক্রি করতে শুরু করি, সবাই তাচ্ছিল্যের সুরে বলত- বই কে কিনবে। অথচ আমরা এখন কয়েকশ' প্রকাশকের সঙ্গে কাজ করি। অমর একুশে গ্রন্থমেলার পাশাপাশি বিদেশের বিভিন্ন বইমেলায় আমরা অংশ নিই। একপর্যায়ে ভাবতে থাকি সারাবছর কীভাবে বই বিক্রি করা যায়। সেই ভাবনা থেকে মাত্র পাঁচজন কর্মী নিয়ে বইবাজারডটকমের যাত্রা। প্রথম মাসে কর্মীদের বেতন দিতে পারিনি। তবে দ্রুতই আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি। এখন আমরা সফল।

মাশরেকা বিনতে মোশাররফ বলেন, ইউরোপে অবস্থানকালে ভিনদেশিদের কাছে বাংলাদেশকে চেনাতে অনেক কষ্ট হতো। কিছুতেই তারা বাংলাদেশকে খুঁজে পেত না। কেউ কেউ ভারতের অংশ বলেই মনে করে। বিষয়টি আমার মনে খুব নাড়া দেয়। তখন চিন্তা করি, আমার দেশকে কীভাবে তুলে ধরা যায়। এক বছর ইউরোপের দেশে দেশে ঘুরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করি। দেশে ফিরে ভাবতে থাকি, কীভাবে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করা যায়। মাথায় এলো সোনালি আঁশ হিসেবে বিখ্যাত পাটের কথা। পাটজাত পণ্য বানানোর চিন্তা মাথায় ঢোকে। নানারকম ডিজাইন তৈরি করেছি। এসব পণ্যের পাশাপাশি জামদানি নিয়ে ইউরোপে 'মেইড ইন বাংলাদেশ'কে ব্র্যান্ডিং শুরু করি। এখন নিজেও স্বাবলম্বী হয়েছি। অথচ ইউরোপ থেকে দেশে ফেরার পর কেউ মানতেই চায়নি। আমার উদ্যোগকে পাগলামো বলে অনেকে দূরে সরে গেছে। আমি লক্ষ্যে অটুট থেকেছি। দেশের নানা প্রান্ত চষে বেড়িয়েছি। এর ফলে দেশের নারীদের কাজের প্রতিবন্ধকতাগুলোও নিবিড়ভাবে দেখার সুযোগ হয়েছে। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন জেসিআই নর্থ সভাপতি ইমরান কাদির।