'কাম না করলে খামু কী? ঘরে একবেলা খাবারের চাউল নাই। জমানো টাকা নাই। যাদের টাকা আছে, তারা চাউল, ডাউল কিইন্যা ঘরে আছে। আমার নাই।'

'করোনাভাইরাসের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে কেমন চলছে জীবন?' জিজ্ঞেস করতেই ঠেলাগাড়িচালক বাসেত খাঁ অকপটে জানালেন ওইসব কথা।

কখন একটা কাজ পাবেন- ঠেলাগাড়িতে বসে ভাবছিলেন বাসেত খাঁ। রোববার দুপুর। তার সঙ্গে দেখা হলো রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউনহল মসজিদের সামনে। জানালেন নিত্যদিনের শ্রম ছাড়া তার পেটে ভাত জুটবে না, সংসার চলবে না। অনেকের কোটি কোটি টাকা  আছে। অনেকের একবেলা খাবারের টাকা নেই। তিনি বলেন, মানুষের বাড়িতে থাকি, ভাড়া দিতে হয়। চাল-ডাল কিনতে হয়।

রোববার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে খেটেখাওয়া শ্রমজীবী মানুষ সত্যিই অসহায়। পেটের তাগিদে যাদের নিত্যশ্রম দিতে হয়, মৃত্যুভয় নেই তাদের। করোনা থেকে রক্ষা পেতে এত সতর্কতার সময় কোথায় তাদের? বাঁচার জন্য প্রস্তুতিরই কি সামর্থ্য আছে? সারাদেশের সামর্থ্যবান মানুষ যখন ভয়ানক করোনা থেকে রক্ষা পেতে নানা প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন শ্রমিক, মুটে-মজুরেরা ঘাম ঝরিয়ে কাজ করছেন। তারা করোনার এই ভয়াবহ পরিবেশে এখন অসহায়।

বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাটসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, করোনায় শ্রমজীবী মানুষের প্রস্তুতি শূন্যের কোঠায়। তারা যার যার কাজে ব্যস্ত। কারও কারও কথা বলার সময় নেই। রিকশাওয়ালা, নির্মাণ শ্রমিক, সিএনজি অটোরিকশাচালক, ঠেলাগাড়িচালক, কুলি-মুটে-মজুরসহ নানা পেশার শ্রমজীবী জানিয়েছেন, কামাই (রোজগার) না করলে পেটে ভাত যাবে না। স্ত্রী, সন্তানেরা না খেয়ে থাকবে।

ময়মনসিংহের ফুলপুরের মো. জাবেদ রিকশা চালান ঢাকায়। তিনি জানালেন, কামাই না করলে পেট চলবে না। করোনার ভয়ে ঘরে বসে থাকলে বউ-বাচ্চারা উপোস থাকবে। ঘরে বসে থাকার উপায় নেই। মৃত্যুকে ভয় করার সময় নেই তাদের। ঘরের ভেতরে থাকবে বড়লোকেরা। তাদের অনেক টাকা-পয়সা আছে। তাদের মৃত্যুভয় আছে। আর আমাদের মৃত্যু নসিবে থাকলে হবে, নইলে হবে না।

'মুখে মাস্ক পরছেন না কেন, হাতে স্যানিটাইজার মাখিয়েছেন কিনা?'

এ প্রশ্নের জবাবে অনেকেই বলেছেন, এগুলো পাব কোথায়? এগুলো কিনতে টাকা লাগে।

অবশ্য গতকাল কিছু রিকশাচালককে মাস্ক পরতে দেখা গেছে। তবে বেশিরভাগই কোনো প্রস্তুতি না নিয়েই রিকশা চালাচ্ছেন।

বাদাম বিক্রেতা সাইদুল ইসলাম বলেন, 'বইস্যা থাকলে পকেটে টাকা আসবে না। পরিবারের সবাই আমার ওপর নির্ভরশীল। বাদাম বেইচাই সংসার চালাই। তাই বাইরে বাইর হইছি।'

সিএনজি অটোরিকশাচালক মিজানুর রহমানের বাড়ি ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গায়। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে তার কোনো প্রস্তুতি আছে কিনা? জানতে চাইলে বলেন, 'কোনো প্রস্তুতি নাই। টাকা রোজগারের জন্য হন্যে হয়ে কাজ করতে হয়। কাজে না বের হলে সংসার চলবে না। জমানো টাকা নেই। তাই ঘরে বইস্যা থাকার সুযোগ নাই।'

মানিকগঞ্জের সিএনজিচালক আবদুল আলীম বলেন, 'আমরা দিন কামাই করি, দিন খাই। গাড়ি চালালে বাজার করে খেতে পারমু, নইলে পারমু না।

ঢাকার সদরঘাটসংলগ্ন স্টিমারঘাটের কুলি শাহ আলম নিজেকে আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়ে বলেন, 'আল্লাহ বাঁচাইলে বাঁচমু, নইলে বাঁচমু না। ভয় পাইয়্যা লাভ নাই। ঘরে বইস্যা থাইকলে টাকা আইসব না। সংসারও চইলব না।'

ঘাটের মজিবর মাঝি বলেন, 'নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনে কাজ করতে হচ্ছে। এ কাজ থেকে প্রতিদিন আয় করি। করোনার ভয়ে কাজ না করলে আয় হইব না। সংসারও চইলব না।