ইস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক কাজী তাহমিনা। গত বছরের জন্মদিনে তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, বাকি জীবন সাধ্যমতো অসহায় মানুষের, বিশেষত পথশিশুদের কল্যাণে কাজ করবেন। এরপর ঈদুল ফিতরের আগে তিনি পথশিশুদের নতুন কাপড় ও সেমাই কিনে দেন। এভাবে বছরজুড়েই ছোটখাটো সহায়তা নিয়ে দাঁড়ান কারও না কারও পাশে।

এর মধ্যেই শুরু হয় করোনা দুর্যোগ। এবার কাজী তাহমিনা সিদ্ধান্ত নেন, পথশিশুদের জন্য রান্না করবেন। তবে তার পক্ষে খাবার বিতরণ করা কঠিন হবে বলে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে সাহায্য চান। স্বেচ্ছাসেবীও জুটে যায়। তারা প্রতিদিন তাহমিনার বাসা থেকে রান্না করা খাবার নিয়ে বিভিন্ন এলাকার পথশিশু ও অভুক্ত মানুষের মধ্যে বিতরণ করছেন।

তাহমিনার এই উদ্যোগ পছন্দ হয় অনেকের। ফলে বাড়তে থাকে বাসায় রান্না করা খাবার সরবরাহকারীর সংখ্যা। সর্বশেষ সিএসআর উইন্ডো নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এটা নিয়ে কাজ করছে। সপ্তাহখানেক ধরে তাদের প্রায় ১০০ স্বেচ্ছাসেবী এসব একক উদ্যোগ সমন্বয় করে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন বিভিন্ন এলাকায়।

কাজী তাহমিনা সমকালকে বলেন, 'করোনার কারণে বাসাতেই থাকতে হচ্ছে। প্রতিদিন নিজের পরিবারের জন্য রান্না করছি। হঠাৎ মনে হলো, খানিকটা বেশি রান্না করলে কিছু অভুক্ত শিশুর মুখে খাবার তুলে দেওয়া সম্ভব। আমার আশপাশে হয়তো অনেক শিশু ক্ষুধায় কষ্ট পাচ্ছে। তাই ছোট পরিসরে হলেও উদ্যোগ নেওয়া যায়। আপাতত আমি প্রতিদিন ৩০-৪০ জনের খাবার রেঁধে দিচ্ছি।'

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের কাদেরাবাদ হাউজিংয়ে পরিবারের সঙ্গে থাকেন তাহমিনা। তার দুই সন্তানের মধ্যে ইনিয়ানার বয়স সাড়ে ছয় বছর, ইরাবতীর এখনও আড়াই বছর হয়নি।

তাহমিনা জানান, তার এসব কাজে উৎসাহ দেন স্বামী পলাশ সরকার। তিনি ইত্তেফাকের সহ-সম্পাদক। বাজার করে দেওয়া থেকে শুরু করে রান্নার সময় সহায়তাও করেন পলাশ। তাহমিনার স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার অভ্যাস অবশ্য ছাত্রজীবন থেকেই ছিল। এখন পেশাগত ব্যস্ততা ও দুই সন্তানের পরিচর্যা মিলিয়ে আর সেভাবে পেরে ওঠেন না। তবে ইচ্ছাটা রয়ে গেছে পুরোদমে। তাই ঘরে বসে পথশিশুদের জন্য কিছু করার পথ খুঁজছিলেন। এরপর রান্না করে দেওয়ার বিষয়টি মাথায় আসে।

তিনি জানান, ১০ এপ্রিল থেকে শুরু করেন রান্নার কাজ। এতদিন খিচুড়ি-ডিম, তেহারি ইত্যাদি দিলেও রমজান শুরু হওয়ার পর ইফতারসামগ্রী দিচ্ছেন। রোববার দিয়েছেন গরুর মাংস দিয়ে তৈরি হালিম ও আলুর চপ। প্রতিদিন নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেন। মূলত শিশুদের জন্য রান্না করলেও অনেক সময় অভাবী পরিবারগুলোকেও খাবার দেওয়া হচ্ছে। তার এই কাজে অর্থ সহায়তা দিতে এগিয়ে এসেছেন স্বজন ও বন্ধুরা।

স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বয়কারী সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন সমকালকে বলেন, 'লকডাউন পরিস্থিতিতে পথশিশুসহ অসহায় মানুষের জন্য খাবার রান্না করে দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেন কাজী তাহমিনা। একই সময়ে লালমাটিয়া এলাকার আসমা আক্তার লিজাও রান্না করা খাবার দিতে চান। এভাবে আগ্রহীর সংখ্যা বাড়তেই থাকে। পরে সিএসআর উইন্ডো সমন্বিতভাবে একই কার্যক্রম শুরু করে।'

সিএসআর উইন্ডোর সহ-প্রতিষ্ঠাতা আহসান রনি জানান, সপ্তাহখানেক ধরে 'আপনার হাতে তৈরি খাবার আমরা পৌঁছে দেব অসহায় মানুষের কাছে' শীর্ষক একটি প্রচারণা কার্যক্রম চালাচ্ছেন তারা। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে অনেকেই রান্না করে দিচ্ছেন। সেসব খাবার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়। যেভাবে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে তাতে প্রতিদিন এক হাজার মানুষের খাবারের ব্যবস্থা করা যাবে। সর্বশেষ রোববার যারা খাবার দিয়েছেন, তাদের একজন মোহাম্মদপুরের নওরীন ওশিন।

আহসান রনি জানান, প্রায় দুই বছর আগে তিনি ও সাদমান সাকিব মিলে সিএসআর উইন্ডো প্রতিষ্ঠা করেন। তারা করোনা নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেন ১৬ মার্চ। প্রথমে তারা ইপিলিয়ন গ্রুপের অর্থায়নে ১৭০টি ইউনিয়নে স্থানীয় ভাষায় মাইকিং করে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা চালান। পরে ২১ উপজেলায় দুই হাজার ৬০টি পরিবারকে চাল-ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী দেওয়া হয় আইডিএলসি ফাইন্যান্সের উদ্যোগে। এছাড়া ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরামের ঢাকা হাব, আন্তর্জাতিক সংস্থা কন্ট্রোল ইউনিয়ন, দেশের ফাগুন অডিও ভিশন এবং ডানো গুঁড়ো দুধের সহায়তায় তাদের কিছু কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

মন্তব্য করুন