তিন 'ধনকুবেরে'র বিরুদ্ধে চার্জশিট এ মাসেই

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২০     আপডেট: ১৬ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাহাদাত হোসেন পরশ

ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর অবৈধভাবে বিত্তবৈভবের মালিক হয়েছেন- এমন অনেকের নাম প্রকাশ্যে আসতে থাকে। তাদের মধ্যে অন্যতম জিকে বিল্ডার্সের কর্ণধার জিকে শামীম ও পুরান ঢাকার দুই সহোদর এনামুল হক ওরফে এনু ভূঁইয়া ও রূপণ ভূঁইয়া। চলতি মাসেই আলোচিত এই তিন 'ধনকুবেরে'র মোট পাঁচটি মামলার চার্জশিট দাখিল করতে যাচ্ছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

এরই মধ্যে সিআইডি তদন্ত শেষ করে মানি লন্ডারিং আইনে অভিযোগপত্র দাখিলের প্রস্তুতি নিয়েছে। এখন চলছে ভেটিং। এ প্রক্রিয়া শেষ হলে আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে। গতকাল সোমবার সিআইডির একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র সমকালকে এসব তথ্য জানান।

এ ব্যাপারে সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, জিকে শামীম এবং এনু-রূপণের মামলার তদন্ত শেষ। খুব অল্প সময়ের মধ্যে চার্জশিট দাখিল করা হবে।

সিআইডির অপর এক কর্মকর্তা জানান, সিআইডির কাছে থাকা যে কোনো মামলার তদন্ত শেষে তার খুঁটিনাটি তথ্য বিশ্নেষণ করার জন্য একটি বিশেষ টিম রয়েছে। সেখানে ভেটিংয়ের পর আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হয়। জিকে শামীম এবং এনু-রূপণের মামলাও ভেটিংয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সমকালকে জানান, বিতর্কিত ঠিকাদার জিকে শামীম ছাড়াও মানি লন্ডারিং আইনে করা মামলার অভিযোগপত্রে তার সাত দেহরক্ষীকেও আসামি করা হচ্ছে। গত বছরের ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিকেতনের নিজ কার্যালয় থেকে বিদেশি মদ, অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ নগদ টাকাসহ র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন জিকে শামীম। এ ঘটনায় র‌্যাব বাদী হয়ে গুলশান থানায় তার বিরুদ্ধে অস্ত্র, অর্থ পাচার ও মাদক আইনে মামলা করে। পরে সিআইডি মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করে তদন্ত শুরু করে। তদন্তে উঠে আসে, ক্ষমতা আর প্রভাব বিস্তার করেই কোটি কোটি টাকার কাজ নিয়েছেন জিকে শামীম। সম্পদের সঙ্গে তার বৈধ আয়ের রয়েছে বিস্তর গরমিল। কয়েক বছর আগেও বাসাবো কদমতলার একটি বাড়িতে থাকতেন শামীম। সর্বশেষ থাকতেন বনানীর ওল্ড ডিওএইচএসে নিজের ফ্ল্যাটে। আর নিকেতনে ৫ নম্বর সড়কের ১৪৪ নম্বর ভবনটি তিনি তার জিকে বিল্ডার্স অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের অফিস হিসেবে ব্যবহার করেন। ঢাকার বাসাবো ও নিকেতনে তার পাঁচটি বাড়ি রয়েছে। একাধিক প্রকল্পে তার চার হাজার কোটি টাকার কাজ চলমান ছিল। আর গত এক দশকে গণপূর্তে ১০ হাজার কোটি টাকার কাজ করেছেন শামীম। ঠিকাদারির কাজ বাগাতে অনেক সময় পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানকে ব্যবহার করতেন তিনি।

জিকে শামীম কৌশলে তার মা আয়েশা আক্তারকে নিজের প্রতিষ্ঠান জিকেবি অ্যান্ড কোম্পানির ২০ শতাংশের মালিক করেছিলেন। যদিও তার মায়ের কোনো আয়ের উৎস নেই। মাকে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রেখে অবৈধ আয়কে আড়াল করার চেষ্টা করেছেন তিনি। জিকে শামীমের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে ১৬৫ কোটি ২৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকার এফডিআরের কাগজপত্র জব্দ করা হয়। ওই টাকার তথ্য জিকে শামীম বা তার মায়ের আয়কর নথিতে গোপন করা হয়েছে। হাইকোর্টের দুটি বেঞ্চ থেকে ৪ ও ৬ ফেব্রুয়ারি দুই মামলায় জিকে শামীমের জামিন হয়। তবে তথ্য গোপন করে নেওয়া ওই জামিন বাতিল করা হয়।

এনু-রূপণের মামলায় আসামি হচ্ছেন ভাইয়েরাও : ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান পর পুরান ঢাকার গেণ্ডারিয়ার স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা দুই ভাই এনামুল হক এনু ও রূপণ ভূঁইয়ার বাসায় দুই দফা অভিযান চালিয়ে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণ ও নগদ টাকা জব্দ করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে ওয়ারী, সূত্রাপুর ও ওয়ারী থানায় মোট চারটি মামলার তদন্ত শেষ করেছে সিআইডি। গেণ্ডারিয়া থানার করা ১২ নম্বর মামলায় এনু-রূপণসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হচ্ছে। আসামির তালিকা আলোচিত এই দুই সহোদর ছাড়াও তাদের অন্তত আরও পাঁচ ভাই ও ম্যানেজার রয়েছেন। সূত্রাপুর থানার ২৭ নম্বর মামলায় আসামি হচ্ছেন ১০ জন। ওয়ারী থানার একটি মামলায় ১০ জন ও সূত্রাপুরের আরেকটি মামলায় ৯ জন চার্জশিটভুক্ত হচ্ছে।

তদন্তে এখন পর্যন্ত ঢাকায় এনু-রূপণের ২২টি বাড়ি থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। মূলত বাড়ি কেনা দুই ভাইয়ের নেশা। ২০০০ সালের পর থেকে অধিকাংশ বাড়ি কিনেছেন তারা। তাদের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই সোনালি রং বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। বাড়ির গেট এবং অধিকাংশ কমোডও সোনালি রঙের।

গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান শুরু করে র‌্যাব। প্রথম দিনের অভিযানে গ্রেপ্তার করা হয় যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে। এরপর একে একে অনেক রাঘব বোয়াল গ্রেপ্তার হন। বর্তমানে ক্যাসিনোর ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে অনলাইন ক্যাসিনো ব্যবসায়ী সেলিম প্রধান, কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব ও হাবিবুর রহমান মিজান, কাউন্সিলর ময়নুল হক (মনজু), যুবলীগ নেতা খালেদ, জিকে শামীম, যুবলীগ নেতা আরমান, আওয়ামী লীগ নেতা এনামুল ভূঁইয়া ও রূপণ ভূঁঁইয়া কারা হেফাজতে রয়েছে।