মহামারি কালেও লাশের 'ডাম্পিং স্পট' ৩০০ ফিট

সড়ক বাতি ও সিসি ক্যামেরা না থাকায় সুযোগ নিচ্ছে দুর্ধর্ষ চক্রগুলো

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২০     আপডেট: ২৫ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাহাদাত হোসেন পরশ

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে নেমে ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার দিকে যে সড়কটি গেছে, তা ৩০০ ফিট নামে পরিচিত। রাজধানীর ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এরই মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই এলাকা। রাজধানী লাগোয়া এলাকাটি দুটি থানার মধ্যে পড়েছে। একটি খিলক্ষেত ও অন্যটি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ। সবুজ ও নির্মল প্রকৃতির কারণে অনেকেই ৩০০ ফিট এলাকায় ঘুরতে যান। সুন্দর এ এলাকাটি যে কারও জন্য বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। সংঘবদ্ধ নানাচক্র সেখানে ওত পেতে রয়েছে। করোনার মহামারিকালেও এলাকাটি যেন লাশ ফেলার 'ডাম্পিং স্পটে' পরিণত হয়েছে। একের পর এক সেখানে মিলছে মরদেহ। পুলিশসহ স্থানীয়রা বলছেন, সড়কবাতি ও আশপাশ এলাকায় ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা না থাকায় অপরাধীরা এর সুযোগ নিচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আরও ভয়ঙ্কর হবে অপেক্ষাকৃত নির্জন এই এলাকাটি।

জানা গেছে, সর্বশেষ গত ১৯ জুন পূর্বাঞ্চল থেকে বসুন্ধরা প্রকল্পের মাঝামাঝি সড়কের দক্ষিণ পাশে এক তরুণীর লাশ উদ্ধার করা হয়। তার পরনে ছিল লাল-কালো রংয়ের সালোয়ার কামিজ। তার শরীরে বাহ্যিকভাবে কোনো আঘাতের চিহ্ন পায়নি পুলিশ। ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত হতে আলামত সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠাতে হয়েছে। খিলক্ষেত থানার এসআই মোশাররফ হোসেন সমকালকে বলেন, 'এখনও ওই তরুণীর পরিচয় পাওয়া যায়নি। হাতের আঙুলের ছাপ থেকে পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে। এর পাশাপাশি দেশের সব থানায় মেসেজ পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট পেলে হত্যার কারণ সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যাবে। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।'

অজ্ঞাত ওই তরুণীর লাশ উদ্ধারের দু'দিন আগেই ১৭ জুন ৩০০ ফিট এলাকার অস্ট্রেলিয়ান স্কুলের সামনে একটি গাছের নিচ থেকে অজ্ঞাত এ যুবকের লাশ উদ্ধার করে খিলক্ষেত থানা পুলিশ। তার মুখে অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন ছিল। পরদিনই অজ্ঞাত ওই লাশের পরিচয় মেলে। তিনি একজন ব্যবসায়ী। তার নাম হারুন অর রশিদ (৩৫)। পার্টস ও চায়ের ব্যবসা ছিল তার। গতকাল পর্যন্ত হারুন হত্যার কারণ সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ক্লু পুলিশ বের করতে পারেনি। তবে ধারণা করা হচ্ছে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিতেই তাকে অন্য কোথাও হত্যা করে লাশ ৩০০ ফিট এলাকায় ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা।

হারুনের স্ত্রী সোনিয়া আক্তার সমকালকে জানান, ১৭ জুন সন্ধ্যার পর খিলক্ষেতের বাসা থেকে ব্যবসায়িক কাজে মহাখালী যান তার স্বামী। সেখানে ব্যবসায়িক অংশীদার সারওয়ারের কাছ থেকে চায়ের চালান দিয়ে বাসার দিকে ফেরার কথা ছিল। তবে রাত ১০টার দিকেও বাসায় না ফেরায় স্বামীর দুটি মোবাইল নম্বরে কল করে তা বন্ধ পান। উপায়ান্তর না দেখে সারওয়ারকে ফোন করেন তিনি। সারওয়ার জানান, তার কাছ থেকে ৩০ বক্স চা নিয়ে মহাখালী থেকে বাসার উদ্দেশে চলে গেছেন হারুন। এরপর আর কথা হয়নি। পরে স্বামীর নিখোঁজ ডায়েরি করতে যান দক্ষিণ খান থানায়। সেখানে জিডি নিতে রাজি না হওয়ায় তারা বনানী থানায় যান। বনানী থানার পুলিশ হারুনের কলরেকর্ড পরীক্ষা করে দেখে, সর্বশেষ খিলক্ষেতের নামাপাড়া এলাকায় তার মোবাইল সচল ছিল। খোঁজাখুুঁজির একপর্যায়ে স্বজনরা জানতে পারেন ৩০০ ফিট এলাকায় এক ব্যক্তির লাশ পাওয়া গেছে। পরে ওই লাশই হারুনের বলে শনাক্ত করেন স্ত্রী। তার মোবাইল ও মানিব্যাগ পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, মার্চের পর থেকে করোনাকালেই ৩০০ ফিট এলাকায় ৫টি লাশ পাওয়া গেছে।

এর আগেও বিভিন্ন সময় ৩০০ ফিট এলাকা থেকে লাশ উদ্ধার হয়েছে। ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ওই এলাকায় একসঙ্গে তিন যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় আলমপুর ব্রিজের নিচে ওই লাশ পাওয়া যায়।

পুলিশের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ৩০০ ফিট এলাকায় একাধিক সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র রয়েছে। যারা মূলত সিএনজি অটোরিকশা, মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেল নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে ওত পেতে থাকে। যাত্রী হিসেবে যানবাহনে অন্যদের তুলে সবকিছু কেড়ে নেয় তারা। কেউ জোর করলে তাকে হত্যা করা হয়। সম্প্রতি এই চক্রের ৮ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তখন বেরিয়ে আসে একেকজন গত ৫-৬ বছরে ৩০০ ফিট এলাকায় কয়েক হাজার ছিনতাই করেছে। এমনকি ছিনতাইয়ে বাধা দিলে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যার পর লাশ কুড়িল ব্রিজ ও ৩০০ ফিট এলাকায় ফেলে দিত তারা। এই চক্রের মাধ্যমে হত্যার শিকার অন্তত ১২ জনের নাম-পরিচয় পরে বেরিয়ে আসে।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের ডিসি মশিউর রহমান সমকালকে বলেন, '৩০০ ফিট এলাকায় ঘিরে বেশকিছু অপরাধী চক্র রয়েছে। সেখানে প্রায়ই লাশ পাওয়া যায়। এলাকাটি নিরাপদ হিসেবে গড়ে তুলতে অনেক সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। সেটা না হলে অপরাধীদের তৎপরতা বন্ধ করা কঠিন হবে।'

পুলিশের গুলশান বিভাগের ডিসি সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, '৩০০ ফিটে তৎপর অপরাধী চক্রের কয়েকজনকে সম্প্রতি ধরা হয়েছে। তাদের মধ্যে দু'জন পুলিশের সঙ্গে 'বন্দুকযুদ্ধে' মারা গেছে। তবে এখনও বেশকিছু চক্র সক্রিয় আছে সেখানে। করোনার মধ্যে কয়েকটি লাশ ওই এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে শুরু করে আশপাশের সড়কে বাতি ও সিসিটিভি লাগাতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে সিটি করপোরেশন ও সড়ক ও জনপথ বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়। সশরীরে গিয়ে আমি তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। পুলিশের সিসি ক্যামেরা রয়েছে। তবে এই ক্যামেরা ফ্লাইওভারে একেকটি বসালে ৫৫ কেজির ওপর লোড হয়। এটার জন্য সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি লাগে। ওই অনুমতি পেলে পুলিশ নিজ উদ্যোগে সিসি ক্যামেরা বসাতে পারবে। তবে দ্রুত এর সমাধান না হলে ৩০০ ফিট ও আশপাশ এলাকায় নির্বিঘ্ন করা সত্যি কঠিন সাধ্য।'