সবুজ রঙের কচুরিপানায় অজস্র বেগুনি ফুলের ফুটে থাকার দৃশ্যটাকে নয়নাভিরাম মনে হতে পারে। তবে কচুরি পানা এমন এক উদ্ভিত, যা স্বচ্ছ পানির একটা বিশাল জলাশয়কে হুমকির মুখেও ফেলে দিতে পারে। যেমন ইউফেটিস ও টাইগ্রিস নদী। ইরাকের অতিগুরুত্বপূর্ণ এই দুটি নদী এখন ক্রমবর্ধমান কচুরিপানার প্রকোপে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। খবর এএফপির।

বিশ্বের উষ্ণতম দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম ইরাক। দেশটি আগে থেকেই নিয়মিত খরা সমস্যায় ভুগছে। তার ওপর অতিরিক্ত ব্যবহার, দূষণ ও উজানে বাঁধ নির্মাণের কারণে দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে পানির উৎস। এ অবস্থায় নতুন করে হুমকি সৃষ্টি করেছে দ্রুতবর্ধনশীল কচুরিপানা।  

একেকটি কচুরিপানা দিনে পাঁচ লিটার পর্যন্ত পানি শোষণের সক্ষমতা রাখে। একই সঙ্গে এর পাতার কারণে জলাশয়ে পর্যাপ্ত সূর্যালোকও পৌঁছতে পারে না। বাধাপ্রাপ্ত হয় অক্সিজেন প্রবাহও। ফলে নদীর বাস্তুসংস্থানে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, মারা যায় মাছ, যা এরই মধ্যে স্থানীয় জেলেদের জীবিকা সংকট সৃষ্টি করেছে। ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলের একজন মৎস্যজীবী জাল্লাব আল-শরিফি বলেন, ইউফ্রেটিস নদীতে মাছ ধরে আমার জীবন চলে। কিন্তু এ কচুরিপানা সব শেষ করে দিয়েছে। একইভাবে পূর্ব বাগদাদের এক জেলে জানান, টাইগ্রিস নদীতে এখন মাছ মিলছে আগের চেয়ে অর্ধেকেরও কম।

শুধু জেলেই নয়, কচুরিপানার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ইরাকি কৃষকদের ওপরও। আগে থেকেই তারা পানির নিম্নস্তরের কারণে চাষাবাদ নিয়ে সমস্যায় ভুগছিলেন। তার ওপর রয়েছে নদীর উজানে তুরস্ক ও ইরানের বাঁধ। কিন্তু কচুরিপানা পানির স্তরকে আরো নিচে নামিয়ে তো দিচ্ছেই, বাধাগ্রস্ত করছে ক্ষেতের সঙ্গে যুক্ত সেচ নালার পানিপ্রবাহ। পূর্ব বাগদাদের কুটের কাছে এক গ্রামের কৃষক আহমেদ ইয়াসের জানান, সেচ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় তাদের উৎপাদন কমেছে। স্থানীয় বাজারে তাদের সবজির বিক্রি কমে গেছে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ।

এ ছাড়াও কচুরিপানা আরো এক ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এক হাজার বর্গফুট আয়তনের কচুরিপানার ওজন হতে পারে পাঁচ টন পর্যন্ত, যা নদীতীরের জীর্ণ বা দুর্বল অবকাঠামোর ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ভেঙে পড়তে পারে গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও বাঁধ। এমন হলে পানি সরবরাহের পুরো পদ্ধতি ঝুঁকিতে পড়বে। তীব্র পানি সংকট দেখা দেবে ইরাকের সর্বদক্ষিণের প্রদেশ বসরা পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে। উল্লেখ্য, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ২০১৮ সালে সুপেয় পানির অভাবজনিত কারণে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় প্রায় এক লাখ মানুষ।

স্থানীয়রা বলছেন, মূলত বহু বছর ধরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলা ও অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের কারণেই দেশটির প্রধান দুই পানির উৎসের এ দশা হয়েছে। তবে কৃষি বিভাগের গবেষণা প্রধান সালেহ সাদি বলেন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে ওয়াকেফহাল। একই সঙ্গে এ সমস্যার সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় কচুরিপানার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যন্ত্রের মাধ্যমে সেচ নালাগুলো থেকে সব কচুরিপানা সমূলে উৎপাটন করা হবে।