করোনার সংক্রমণ রোধে পরীক্ষামূলক লকডাউন শেষ হতে না হতেই আগের চেহারায় ফিরেছে রাজধানীর পূর্ব রাজাবাজার। মঙ্গলবার মধ্যরাতে শেষ হয় ২১ দিনের 'মডেল' লকডাউন। এরপর গতকাল বুধবার সকাল থেকেই দেখা যায় এলাকার ভিন্ন চেহারা। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে লোকজন দলে দলে রাস্তায় নেমে পড়েছেন। শারীরিক দূরত্ব মানার কোনো বালাই নেই। অনেকে মাস্ক পরারও প্রয়োজন বোধ করেননি। গলি-উপগলির সব দোকানপাট ছিল খোলা। রিকশা-ভ্যান, মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার আর মিনি পিকআপের ভিড়ে এলাকার রাস্তাকে মনে হচ্ছিল ব্যস্ততম সড়ক! দায়িত্বশীলরা বলছেন, লকডাউন শেষ হলেও সতর্কভাবে ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাফেরা না করলে আবারও বাড়তে পারে সংক্রমণ।
করোনা সংক্রমণের ঘনত্ব বিবেচনায় 'রেড জোন' ঘোষিত পূর্ব রাজাবাজারকে ৯ জুন রাত ১২টা থেকে লকডাউন করা হয়। প্রথমে ১৪ দিনের কথা বলা হলেও পরে তা ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এলাকা পুরোপুরি করোনামুক্ত করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে তখন জানান স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ফরিদুর রহমান খান ইরান।
লকডাউন শেষ হওয়ার পর তিনি সমকালকে বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী সকল সংস্থা নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করেছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার ছিল সবার মধ্যে সমন্বয়, সেটা সুষ্ঠুভাবে করা গেছে। এর ফলে লকডাউনের মডেল হয়েছে রাজাবাজার। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে লকডাউন শেষ হলেও কিছু বিধিনিষেধ বহাল থাকবে।'
তবে গতকাল সরেজমিন বিধিনিষেধের ছিটেফোঁটাও কাউকে মানতে দেখা যায়নি। বরং দীর্ঘদিন কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে থাকা রাজাবাজারবাসীর মধ্যে দেখা গেছে কারামুক্তির আনন্দ! দুপুর দেড়টার দিকে ইন্দিরা রোড টেম্পো স্ট্যান্ড-সংলগ্ন প্রবেশমুখের ওষুধের দোকানের সামনে হাস্যোজ্বল এক তরুণকে দেখা গেল। তিনি দোকানিকে বলছিলেন, 'জেল থেকে ছাড়া পাইছি দাদা।' দোকানি প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাতে তিনি বললেন, 'আরে লকডাউনে আছিলাম না। এক্কেরে জেলখানা।' কারাগার থেকে ছাড়া পাওয়ার আনন্দে ওই তরুণের মুখে মাস্কও ছিল না!
অবশ্য শুধু ওই তরুণই নয়, রাজাবাজারের ভেতরের দিকে ঢুকতে এমন আরও বেশ কয়েকজনকে পাওয়া গেল। মোটরসাইকেলের নিরাপত্তায় ব্যবহূত 'ট্যাসলক' লাগানোর গ্যারেজের কাছে চার-পাঁচ তরুণকে মানববন্ধন করার ভঙিতে হাতে হাত রেখে হাঁটতে দেখা গেল। তারা কেউ মাস্ক পরেননি। এলাকার প্রায় প্রতিটি দোকানের সামনে মানুষের জটলা ছিল। যানবাহনের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখ করার মতো। এক রিকশাচালকের বক্তব্য ছিল বেশ মজার। মাস্ক না পরার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'ক্যান? করোনা তো শ্যাষ। লকডাউন করছেল না? আর মাস্ক পইরা কাম নাই।'
পূর্ব রাজাবাজার ঘুরে লোকজনের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি দেখা যায় সোনারতরী টাওয়ার মোড়, আমতলা ও বড় মসজিদ এলাকায়। আর গলির ভেতর তো লোকজন ছিলই।
এদিকে লোকজনের এমন ঘোরাঘুরির ফলে প্রায় করোনামুক্ত হয়ে আসা এই এলাকায় আবারও সংক্রমণ বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা। তারা বলছেন, লকডাউন শেষ হলেও নিজ দায়িত্বে সুরক্ষিত থাকতে হবে, মানতে হবে স্বাস্থ্যবিধি।
কাউন্সিলরের একান্ত সচিব মাসুদ হোসেন সুমন বলেন, 'লকডাউনের ফল পাওয়া যায় মূলত দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে। ধীরে ধীরে আক্রান্তের সংখ্যা কমে যায়। এমনকি অনেকদিনের পরীক্ষায় আক্রান্তই পাওয়া যায়নি। ফলে এই এলাকাকে এখন ঝুঁকিমুক্ত বলা যেতে পারে। তবে এর সুফল পেতে হলে মানুষকে সচেতন হতে হবে।'