গত বছর এডিস মশার কামড়ে হিমশিম খেতে হয়েছিল রাজধানীবাসীকে। ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে ওই সময় প্রাণও দিতে হয়েছিল দুই শতাধিক মানুষকে। এবার অবশ্য পরিস্থিতি ভিন্ন। আগে থেকেই সিটি করপোরেশন নড়েচড়ে বসায় এডিস মশা যেমন কম তেমনি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীরও তোড়জোড় নেই। ডেঙ্গু মৌসুমের শুরুতেই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) চালিয়েছে বিশেষ অভিযান। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে চালানো হয় চিরুনি অভিযান। ১০ দিনব্যাপী দ্বিতীয় ধাপের চিরুনি অভিযানও শুরু হয়েছে গত শনিবার থেকে। এসব অভিযানের পাশাপাশি চলছে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা। কোনো স্থাপনায় এডিস মশা বা লার্ভা পাওয়া গেলেই ভবন মালিকদের করা হচ্ছে আর্থিক জরিমানা। বংশবিস্তারের উপযোগী পরিবেশ পেলেই দেওয়া হচ্ছে সতর্ক নোটিশ। এ ছাড়া প্রতিটি অঞ্চলে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষার ৪০টি কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যে আবার শুরু হচ্ছে স্থানীয় গৃহবধূদের দিয়ে এলাকায় এলাকায় মশকনিধন কাজের তদারকি। এ ছাড়া নিয়মিত রুটিন কার্যক্রম তো চলছেই। এসব কারণে এবার এডিস মশার দেখা মিলছে না।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও মশক বিশেষজ্ঞ কবিরুল বাশার সমকালকে বলেন, মশক নিয়ন্ত্রণের একটি অন্যতম উপায় হলো অভিযান। এবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেছে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অনেক জরিমানাও করেছে। এতে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হচ্ছে। মানুষ যখন তৎপর হয়, তখন মশার দৌরাত্ম্য কমে। তবে মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন লার্ভা ধ্বংস করা (লার্ভিসাইডিং), উড়ন্ত মশা মারা (অ্যাডাল্টিসাইডিং) ও মশার বংশবিস্তারের উৎসস্থল বন্ধ করা। সিটি করপোরেশন এবার এগুলো করার চেষ্টা করছে। এ ছাড়া আরেকটি বিষয় হলো, এবার প্রকৃতিও মানুষের পক্ষে আছে। কারণ এবার প্রচুর বৃষ্টিপাত হচ্ছে। থেমে থেমে বৃষ্টিপাত হলে মশা বাড়ে। এবার সেটা হয়নি। তবে আগস্ট মাস আমাদের জন্য সতর্কতার মাস। সে ক্ষেত্রে আগে থেকেই লার্ভিসাইডিং, অ্যাডাল্টিসাইডিং ও উৎসস্থল নির্মূল করতে পারলে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে থাকবে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, গত বছর এডিস মশার তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে এবার আগেভাগেই প্রস্তুতি নিয়েছি। বিভিন্ন কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে দুই দফা অভিযান শেষ হয়েছে। এখন দ্বিতীয় পর্যায়ের বিশেষ চিরুনি অভিযান চলছে। প্রথম চিরুনি অভিযান সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ায় ভালো ফল মিলেছে। এতে বসে থাকলে চলবে না। দ্বিতীয় ধাপের অভিযান ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এবার আরও কঠোরভাবে অভিযান চলবে।

মেয়র আরও বলেন, যেসব স্থাপনায় এডিস মশা, লার্ভা বা বংশবিস্তার উপযোগী পরিবেশ পাওয়া যাবে, সেগুলোকে বিশেষ নজরে রাখা হবে। ভবিষ্যতে আবারও যদি ওই সব স্থাপনায় এগুলো পাওয়া যায়, তাহলে তাদের অনেক বড় আর্থিক দ দেওয়া হবে। কারণ নগরবাসীর সচেতনতা ও সহযোগিতা ছাড়া এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না।

হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর দেখা নেই :এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে থাকায় এবার রাজধানীর হাসপাতালগুলোতেও ডেঙ্গু রোগীর তেমন দেখা মিলছে না। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত ১ জুলাইয়ের হিসাব অনুযায়ী, পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের কোনো হাসপাতালে নতুন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়নি। অধিদপ্তরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার সমকালকে জানান, গত ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ জুন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগ নিয়ে ৩১৮ জন ভর্তি হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ৩১৪ জন সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরেছেন। ঢাকা শিশু হাসপাতালে তিনজন এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) একজন চিকিৎসাধীন আছেন। এর পর আর নতুন কোনো রোগী হাসপাতালে ভর্তি হননি। চলতি বছর ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে দেশে কোনো রোগী মারাও যাননি।

তৎপর উত্তর সিটি করপোরেশন :জানা গেছে, করোনার মহাদুর্যোগে ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া থেকে নগরবাসীকে রক্ষায় দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ব্যাপক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। উত্তর সিটি করপোরেশন এপ্রিল-মে মাসে চালিয়েছিল বিশেষ মশকনিধন অভিযান। বিশেষ অভিযান শেষ হওয়ার পরই গত ৬ জুন শুরু হয় দশ দিনব্যাপী চিরুনি অভিযান। প্রতিটি ওয়ার্ডকে ১০টি ভাগে ভাগ করে প্রতিটি সেক্টরকে ১০টি সাবসেক্টরে ভাগ করে অভিযান পরিচালনা করা হয়। প্রতিটি সাবসেক্টরে ৪ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও একজন মশকনিধনকর্মীর সমন্বয়ে গঠিত টিম কাজ করে। অর্থাৎ প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রতিদিন ৪০ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও ১০ জন মশকনিধনকর্মী মাঠে নামেন। তারা বিভিন্ন বাসাবাড়ি, স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে যান। কোথাও এডিস মশার লার্ভা আছে কিনা, টানা তিন দিনের বেশি পানি জমে আছে কিনা, ময়লা-আবর্জনা আছে কিনা যা এডিস মশার বংশবিস্তারে সহায়ক প্রভৃতি বিষয় পরিদর্শন করে সেসব স্থানের লার্ভা ধ্বংস করে কীটনাশক প্রয়োগ করেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো নয়জন কীটতত্ত্ববিদ, ডিএনসিসির তিনজন কীটতত্ত্ববিদ, স্বাস্থ্য বিভাগ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের কর্মকর্তারা সরাসরি পুরো চিরুনি অভিযান মনিটরিং করেন। ডিএনসিসির ৫৪টি ওয়ার্ডে একযোগে চলা ওই অভিযানকালে ডিএনসিসির কর্মীরা এক লাখ ৩৪ হাজার ১৩৫টি বাড়ি, স্থাপনা, নির্মাণাধীন ভবন পরিদর্শন করেন। এক হাজার ৬০১টিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায় এবং ৮৯ হাজার ৬২৬টি স্থাপনায় এডিস মশার বংশবিস্তার উপযোগী পরিবেশ পাওয়া যায়। বিভিন্ন স্থাপনায় এডিস মশার লার্ভা পাওয়ায় মোবাইল কোর্ট চালিয়ে ভবন মালিকদের কাছ থেকে ২৪ লাখ ১০ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানাও আদায় করা হয়।

ডিএনসিসি অভিযান পর্যালোচনা করে দেখতে পায়, শতকরা প্রায় ৬৭ ভাগ স্থাপনায় এডিসের বংশবিস্তার উপযোগী পরিবেশ বিরাজমান। আর শতকরা প্রায় ১ দশমিক ২ ভাগ স্থাপনায় এডিসের লার্ভা আছে। যেসব ভবনে এডিস মশার লার্ভা বা বংশবিস্তার উপযোগী পরিবেশ পাওয়া গেছে বা যাবে, সেগুলোকে ডাটাবেজের আওতায় এনে বিশেষভাবে মনিটরিং করার পরিকল্পনা রয়েছে ডিএনসিসির।

চলছে দ্বিতীয় ধাপের চিরুনি অভিযান : ডিএনসিসি মনে করে, প্রথম ধাপের চিরুনি অভিযানের সফলতার কারণে এডিস মশার দৌরাত্ম্য কমেছে। এতে মানুষের মধ্যে সচেতনতাও বেড়েছে। এভাবে প্রতি মাসে একটি চিরুনি অভিযান পরিচালনা করলে এডিস মশা সারা বছরই নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এ জন্য গত শনিবার এডিস মশা নিধনে দ্বিতীয় পর্যায়ের ১০ দিনব্যাপী অভিযান শুরু করে ডিএনসিসি। প্রথম দিন ১২ হাজার ৬১৯টি স্থাপনা পরিদর্শন করে ডিএনসিসির অভিযান পরিচালনকারী কর্মীরা। ওই সময় ৯১টি স্থাপনায় এডিস মশার লার্ভা মেলে। আট হাজার ৭৬৪টি স্থাপনায় এডিস মশার বংশবিস্টত্মার উপযোগী পরিবেশ পাওয়া যায়। এ সময় ১২ জন স্থাপনার মালিকের কাছ থেকে এক লাখ ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। বেশ কিছু বাড়ির মালিককে সতর্ক করে দেওয়া হয়। মশার প্রজনন উপযোগী পরিবেশ পাওয়ায় ৫২০ জন বাড়ির মালিককে সতর্ক করে দেওয়া হয়। ১০ জনকে নোটিশ দেওয়া হয়। এভাবে প্রতিদিনই অভিযান চলছে।

গৃহবধূদের দিয়ে মনিটরিং : ডিএনসিসি মনে করে, স্থানীয় বাসিন্দারা ভালো জানেন কোথায় মশার বংশবিস্তার উপযোগী পরিবেশ আছে, কোথায় মশার দৌরাত্ম্য বেশি। এ জন্য পুরো মশকনিধন কার্যক্রম তদারকির জন্য প্রতি এক বর্গকিলোমিটার এলাকার জন্য স্থানীয় একজন গ্রহণযোগ্য সৎ গৃহবধূকে তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হবে। মশকনিধন কর্মীদের তিনি দিকনির্দেশনা দেবেন। এমনকি গৃহবধূর মতামতের ওপর ভিত্তি করেই মশকনিধন কর্মীদের বেতন পরিশোধ বা বন্ধ করা হবে। আপাতত ডিএনসিসির ৬ নম্বর ওয়ার্ডে (মিরপুরের রূপনগর এলাকা) দু-এক দিনের মধ্যেই এই কার্যক্রম পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হবে। ভালো ফল পাওয়া গেলে পুরো ডিএনসিসি এলাকায় গৃহবধূদের দিয়ে মশকনিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

এদিকে এবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও (ডিএসসিসি) মশকনিধনে তৎপর হয়ে উঠেছে। ডিএসসিসি মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, মশকনিধন কার্যক্রমে কোনো গাফিলতি হলে ছোট-বড় কেউই ছাড় পাবেন না। ফলে ডিএসসিসিও তৎপর। ডিএসসিসি এলাকাতেও জোরেশোরে চলছে মশকনিধন কার্যক্রম।