চক্রের ৩ সদস্য গ্রেপ্তার

পরোপকারী সেজে বাসায় ঢুকে স্বর্ণালঙ্কার লুট!

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২০   

ইন্দ্রজিৎ সরকার

গ্রেপ্তারকৃত আমেনা, কোহিনুর ও আবুল হাসেম

গ্রেপ্তারকৃত আমেনা, কোহিনুর ও আবুল হাসেম

সন্তানকে দেখভাল করার কেউ না থাকলে বিরাট ঝামেলায় পড়েন কর্মজীবী মায়েরা। কর্মস্থল সামলাবেন, না ছোট্ট শিশুর পরিচর্যা করবেন তা নিয়ে দেখা দেয় জটিলতা। এসব ক্ষেত্রে অনেকেই গৃহকর্মীর ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে নিশ্চিন্ত হওয়ার চেষ্টা করেন। আর সেই সুযোগ নেওয়ার জন্যই ওঁৎ পেতে থাকে কিছু অসাধু চক্র। চরম সংকটের সময় তারা ত্রাণকর্তা হয়ে আবির্ভুত হয়। বিনাবাক্যে সন্তান ও সংসারের সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয়। এরপর গৃহকর্তার সরলতার সুযোগে স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ টাকাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করে চম্পট দেয়। এমনই এক চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাদের মধ্যে একজন স্বর্ণ ব্যবসায়ীও রয়েছেন, নামমাত্র দামে চোরাই স্বর্ণ কিনে নিতেন তিনি।

ডিবির লালবাগ বিভাগের উপ-কমিশনার রাজীব আল মাসুদ সমকালকে বলেন, ‘অপরাধীরা নানা কৌশলে মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে। এই চক্রটি গৃহকর্মী সেজে মানুষের বাসায় ঢুকে জিনিসপত্র নিয়ে পালায়। গত বছরের আগস্টে তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক নারী চিকিৎসকের বাসা থেকে প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার লুট করে। গৃহকর্মীর ব্যাপারে খোঁজ-খবর না নিয়েই কাজে নিয়োগ দেওয়ায় তার ব্যাপারে কোনো তথ্যই পাওয়া যাচ্ছিল। পরে তদন্তের এক পর্যায়ে গৃহকর্মী আমেনা, তাকে সেখানে নিয়ে যাওয়া কোহিনুর ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী আবুল হাসেমকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। আমেনা রোববার আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।’ 

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৯ সালে ৩৩তম বিসিএস পাস করে ঢাকা মেডিকেলে যোগ দেন ডা. বিচিত্রা রাণী। স্বামী-সন্তানকে নিয়ে তিনি থকেন পুরান ঢাকার নাজিরা বাজার এলাকায়। স্বামী চাকরিজীবী হওয়ায় এবং বাসায় ছোট দুই সন্তানকে দেখভালের কেউ না থাকায় কর্মস্থলে যাওয়া নিয়ে তিনি বিপাকে পড়েন। ওই সময় কোহিনুর নামের এক নারী গিয়ে তার সমস্যার ব্যাপারে সব শোনেন এবং সমাধানের চেষ্টা চালান। এরপর তিনি নিরীহ চেহারার আমেনাকে গৃহকর্মী হিসেবে সেখানে নিয়ে যান। এতে হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন বিচিত্রা। প্রথম দিনই তিনি সম্পূূর্ণ অজানা-অচেনা গৃহকর্মীর কাছে দুই শিশুসহ বাসার যাবতীয় দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে চলে যান হাসপাতালে। দায়িত্ব পালন শেষে বাসায় ফিরে দেখেন, শিশু দুটি কাঁদছে, আমেনা নেই। আরেকটু লক্ষ্য করতেই তিনি বুঝতে পারেন, তার যাবতীয় স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে গেছেন আমেনা। এ ঘটনায় ডা. বিচিত্রা বংশাল থানায় মামলা করেন। তবে গৃহকর্মী সম্পর্কে তার কাছে কোনো তথ্য না থাকায় তদন্ত বিশেষ এগোয়নি। এরপর মামলা আসে ডিবিতে। দীর্ঘ চেষ্টায় সফলতার বন্দরে পৌঁছায় তদন্ত। 

ডিবির কোতয়ালি জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার সাইফুর রহমান আজাদ বলেন, ‘গৃহকর্মীর ছদ্মবেশে আমেনা এক পেশাদার চোর। এর আগেও সে একইভাবে বিভিন্ন বাসায় চুরি করেছে বলে তথ্য মিলেছে। কোহিনুর হলো এ চক্রের দলনেতা। সে বিভিন্ন বাসায় গৃহকর্মী সরবরাহের নামে নারীদের চুরি করতে পাঠাত। আর জুয়েলার্সের মালিক আবুল হাসেম কম দামে চোরাই স্বর্ণ কিনে গলিয়ে ফেলত। তাদের মধ্যে প্রথমে কোহিনুরকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকা আমেনাকে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। জিজ্ঞাসাবাদে আমেনা জানায়, চোরাই স্বর্ণালংকার এক লাখ ২৮ হাজার টাকায় বিক্রি করেছে। শেষে স্বর্ণের ক্রেতা ঢাকার তাঁতিবাজারের ফোর স্টার জুয়েলার্সের মালিক আবুল হাসেমকে গ্রেপ্তার করা হয়।

ডিবির এই কর্মকতা বলেন, ‘প্রতারণা এড়াতে গৃহকর্মী নিয়োগের আগে নাম-ঠিকানা যাচাই করে নিন। তার জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি, নাগরিক সনদ, পরিবারের সদস্যদের নাম-ঠিকানা-ফোন নম্বরসহ আনুষঙ্গিক প্রমাণ রাখুন।’