জেকেজি কেলেঙ্কারি

নজর ছিল করোনা তহবিলের দিকেও

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২০     আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

আতাউর রহমান

করোনা নমুনা সংগ্রহের বৈধ অনুমতি পাওয়ার পরও টাকার লোভে ভুয়া টেস্ট শুরু করেছিল জোবেদা খাতুন হেলথ কেয়ার (জেকেজি)। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী আরিফুল হক চৌধুরী এবং চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে চলেছিল এমন অপকর্ম। এমনকি সরকারের করোনা ফান্ডের ৫০০ কোটি টাকার দিকেও চোখ পড়ে এ দম্পতির। সেখান থেকে টাকা হাতিয়ে নিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের চার কর্মকর্তাকে 'ম্যানেজ'ও করেছিলেন তারা। তবে তার আগেই অপকর্ম ফাঁস হওয়ার পর গ্রেপ্তার হয়ে আরিফ-সাবরিনা এখন ডিবির হেফাজতে রয়েছেন। সেখানে গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসছে তাদের অপকর্মের নানা তথ্য।

ওই দু'জনকে জিজ্ঞাসাবাদের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট ডিবি সূত্র জানিয়েছে, রিমান্ডে আরিফ ও সাবরিনা দাবি করেছেন, করোনার ভুয়া টেস্ট ও ভুয়া সনদ বিক্রি করে তারা কয়েক কোটি টাকা উপার্জন করেছেন। টাকার অঙ্ক সম্পর্কে অবশ্য তারা একেক সময়ে একেক তথ্য দিচ্ছেন। তবে দু'জনই স্বীকার করেছেন, সন্দেহ এড়াতে টাকাগুলো তারা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে রাখেননি। জেকেজির কর্মীদের খরচ মিটিয়ে অন্তত সাড়ে তিন কোটি টাকা নগদ আকারে পূর্বপরিচিত কয়েকজনের কাছে রেখেছেন তারা।

আরিফ ও সাবরিনা টাকা রেখেছেন, এমন কয়েকজনের নামও বলেছেন। তাদের চিহ্নিত করে এরই মধ্যে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। রিমান্ডে দেওয়া দুই আসামির তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) আবদুল বাতেন গতকাল শনিবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, ডা. সাবরিনার ফেসভ্যালু ব্যবহার করে তার স্বামী আরিফুল হক চৌধুরী করোনা নমুনা সংগ্রহের কাজ বাগিয়ে নেন এবং করোনা টেস্টের নামে ভুয়া সনদ বিক্রি শুরু করেন। রিমান্ডে তারা যেসব তথ্য দিয়েছেন, সেগুলো যাচাই করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ডিবির অন্য এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, করোনা টেস্ট কার্যক্রমের মাধ্যমে ও প্রয়োজনে জেকেজিকে ফিল্ড হাসপাতালে রূপ দিয়ে কভিড-১৯ মোকাবিলায় সরকার নির্ধারিত বরাদ্দ থেকে বড় অঙ্কের তহবিল নেওয়ার চেষ্টায় ছিলেন আরিফুল হক চৌধুরী। আরিফুল জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, এজন্য তাকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দু'জন ও অধিদপ্তরের দু'জন বড় কর্মকর্তা সব ধরনের সহযোগিতা করে আসছিলেন।

ডিবি কর্মকর্তা বলেন, আরিফুল ওই চারজনের নামও জানিয়েছেন। কিন্তু তাদের চাকরির অবস্থানগত কারণে ডিবি চাইছে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করতে। আরিফ-সাবরিনা রক্ষা পেতে অনেকের ওপর দোষ চাপাতে পারেন- সে বিষয়টিও ডিবির মাথায় রয়েছে।

আরিফ ও সাবরিনা জিজ্ঞাসাবাদে জানান, মানুষের মধ্যে করোনা টেস্টের ও দ্রুত রিপোর্ট পাওয়ার চাহিদা দেখে আরিফুল হক চৌধুরী জেকেজিতে পিসিআর মেশিন বসানোর জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আবেদন করেন। সেটি পেতে স্ত্রীর প্রভাবও কাজে লাগান। আরিফুর জানান, পিসিআর মেশিন পাওয়ার মৌখিক অনুমোদনও তারা পেয়েছিলেন। তবে মানুষের দ্রুত টেস্ট রিপোর্ট পাওয়ার চাহিদা দেখে তাদের কর্মচারীরা ভুয়া সনদ তৈরি শুরু করে বলে দাবি করেন তিনি। এরই মধ্যে তার স্ত্রীর সঙ্গে পারিবারিক ঝামেলা শুরু হলে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়।

জেকেজি বুথ স্থাপন করে বিনামূল্যে করোনা নমুনা সংগ্রহের অনুমতি পায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে টাকার বিনিময়ে নমুনা সংগ্রহ শুরু করে। এসব নমুনা টেস্ট না করেই লোকজনকে টাকার বিনিময়ে করোনার ভুয়া সনদ দিয়ে আসছিল প্রতিষ্ঠানটি। এক ভুক্তভোগী তেজগাঁও থানায় অভিযোগ দিলে পুলিশ গত ২৩ জুন জেকেজির সিইও আরিফসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন ২৪ জুন প্রতিষ্ঠানটির কর্মী হুমায়ুন কবীর ও তানজিনা আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। পরে ওইসব ঘটনায় তেজগাঁও থানায় মোট চারটি মামলা হয়। ১২ জুলাই জেকেজির জালিয়াতির মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের পর গ্রেপ্তার দেখানো হয় ডা. সাবরিনাকে। ওই মামলাটি শুরুর দিকে তেজগাঁও থানা পুলিশ তদন্ত করলেও বর্তমানে তা ডিবির তেজগাঁও বিভাগ তদন্ত করছে।