অনেকের 'কালো টাকা' বিনিয়োগ ছিল সাহেদের প্রতিষ্ঠানে

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২০     আপডেট: ১৯ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাহাদাত হোসেন পরশ

নানা কৌশলেই প্রতারক মো. সাহেদ অনেকের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। নানা শ্রেণি-পেশার দুর্নীতিবাজ কারও কারও কালো টাকাও সাহেদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা ছিল। অনেকের টাকা সাহেদ গায়েব করে দিলেও কালো টাকা হওয়ায় তারা আইনি সহায়তা চাওয়ার সাহস পেতেন না। আবার সাহেদ প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করতেন না। এ ছাড়া সাহেদ সবার কাছ থেকে সমীহ আদায় করার চেষ্টা করতেন। কেউ তাকে 'স্যার' বলে সম্বোধন না করলেও তার বিপদ ছিল। তাকে নানাভাবে নাজেহাল করতেন তিনি। তদন্ত-সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র সমকালকে এ তথ্য জানিয়েছে।

সাহেদের প্রতিষ্ঠানের এক সাবেক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, পুলিশের এক ডিআইজির স্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘদিনের সখ্য ছিল সাহেদের। নিয়মিত তার বাসায় সাহেদের যাতায়াত ছিল। রিজেন্ট হাসপাতালে ওই পুলিশ কর্মকর্তার স্ত্রীর বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ছিল। এ ছাড়া আরও এক দুর্নীতিবাজ তিন কোটি টাকা সাহেদের প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে। এর বিনিময়ে সাহেদ তার প্রতিষ্ঠানের অন্যতম পরিচালক করার কথা ছিল। কিন্তু তাকে পরিচালক করা হয়নি। এরপরও সাহেদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস দেখাননি তিনি। র‌্যাবের এক কর্মকর্তা জানান, রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর রোগীদের বিনামূল্যে করোনা চিকিৎসার জন্য চুক্তি করে। পরে ওই হাসপাতালে দু'জন সরকারি চিকিৎসককে ডেপুটেশনে পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে এক চিকিৎসক সাহেদের আচার-আচরণ দেখে তাকে 'স্যার' বলে সম্বোধন করতেন না। 'স্যার' বলে সম্বোধন না করায় ওই চিকিৎসকের ওই হাসপাতালে যোগদান-সংক্রান্ত চিঠি মন্ত্রণালয়ে পাঠাননি সাহেদ।

অপর এক কর্মকর্তা জানান, একবার গোয়েন্দা কার্যালয়ে সাহেদকে কোনো একটি বিষয়ে ডাকা হয়েছিল। ওই অফিসের এক পরিচালক তাকে ফোন করেন। পরে ওই পরিচালককে সাহেদ বলেন, 'আমার ওপর আপনার কোনো স্টাডি রয়েছে। আপনার বসের সঙ্গে আমার নিয়মিত কথা হয়।' কিন্তু সত্যি হলো, ওই কার্যালয়ের বসের সঙ্গে তার নিয়মিত কথা হতো না। পরিচালককে থামিয়ে দিতে নিজের এমন অবস্থান জাহির করেন তিনি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, পুরান ঢাকার এক ব্যক্তি সাহেদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা পেতেন। ওই টাকার জন্য দীর্ঘদিন ধরে ঘোরাচ্ছিলেন তিনি। উপায়ন্তর না দেখে পাওনাদার এক যুবলীগ নেতার দ্বারস্থ হন। ওই যুবলীগ নেতা সাহেদকে ফোন করলে তিনি তাকে শাসিয়েছেন। কোন সাহসে তাকে ফোন করেছেন, এমন কথা বলেন। তার কাছ থেকে ওই টাকা আদায় করা যায়নি।

চট্টগ্রামের এক ব্যবসায়ীর সিএনজি অটোরিকশা নির্বিঘ্নে চলাচলের ব্যবস্থা করিয়ে দেওয়ার কথা বলে প্রায় এক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিলেন সাহেদ। তবে পুলিশ ২০টি সিএনজি আটকে দিয়েছিল। এরপর সাহেদ পুলিশের এক শীর্ষ কর্মকর্তাকে ফোন করে চট্টগ্রামে যান। সেখানে গিয়ে পুলিশের স্থানীয় কর্মকর্তাদের বলেন, 'এসব ছোটখাটো কাজের জন্য ঢাকা থেকে আমাকে চট্টগ্রামে আসতে হলো। ভবিষ্যতে যাতে সিএনজি অটোরিকশা নিয়ে কোনো ঝামেলা তৈরি না হয়।' ওই সময় ১৯টি সিএনজি অটোরিকশা তিনি ছাড়িয়ে নিতে পারলেও একটি আটকে দেন এক পুলিশ সদস্য। পরে ঢাকায় এসে পুলিশ সদর দপ্তরে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে ওই পুলিশ সদস্যকে সাসপেন্ড করান তিনি।

অ্যালফার্ড গ্লোবাল ফ্যাক্টরি লিমিটেড নামে একটি কথিত প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নিয়ে বিভিন্ন স্থানে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) সরবরাহ করছিলেনও সাহেদ। আসলে এই নামে কোনো প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই। মহামারি করোনাভাইরাস সংকটের মধ্যে ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ফেসবুকে একটি পেজ খুলেই সাব-কন্ট্রাক্ট নিয়ে পিপিই সরবরাহ করছিলেন তিনি। এটা করেও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন সাহেদ।

তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, সাহেদের নানাবিধ প্রতারণার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। করোনা সংকটের প্রথম দিকে যখন মাস্ক ও পিপিই সংকট ছিল, তখন সাহেদ ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে অনুমোদন নিয়ে নিম্নমানের মাস্ক ও পিপিই সরবরাহ করেন। এ ছাড়া তার ঠিকাদারি ব্যবসা ও প্রতারণার বিষয়ে আরও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এ বিষয়ে রাজধানীর উত্তরাসহ কয়েকটি থানায় পাঁচটি মামলা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে সমকালের গাজীপুর ও কাপাসিয়া প্রতিনিধি জানিয়েছেন, সাহেদের প্রধান সহযোগী ও রিজেন্ট গ্রুপের এমডি মাসুদ পারভেজের বিরুদ্ধে কাপাসিয়া থানায় একটি প্রতারণা মামলা হয়েছে। কাপাসিয়া বাজারের বর্ণালী জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী চন্দন রক্ষিত বাদী হয়ে গত শুক্রবার তার বিরুদ্ধে এ মামলা করেন। গহনা মূল্যবাবদ পাঁচ লাখ টাকা সাড়ে ৯ বছরেও পরিশোধ না করায় এ মামলা করা হয়েছে বলে বাদী জানিয়েছেন।