রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসন

ঢাকা ওয়াসা ব্যর্থ, সিটি করপোরেশন কি পারবে

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

অমিতোষ পাল

ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ভারি বৃষ্টিপাত হলে যখন রাজধানী তলিয়ে যায়, নগরবাসীর ভোগান্তি চরমে ওঠে, তখনই বিষয়টি নিয়ে শুরু হয় তোড়জোড়। সিটি করপোরেশন ঢাকা ওয়াসাকে দুষতে শুরু করে। ওয়াসাও সিটি করপোরেশনকে দুষতে থাকে। আলোচনায় স্থান পায় জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রসঙ্গ। সাম্প্রতিক অতিবর্ষণের পর রাজধানীতে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার পর গত বুধবারও এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনলাইন আলোচনা সভায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস জলাবদ্ধতা নিরসনে ঢাকা ওয়াসা সম্পূর্ণ ব্যর্থ বলে সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাসকিম এ খানকে তীব্র ভর্ৎসনা করেন। একপর্যায়ে দুই মেয়রকে নিয়ে তখনই মাঠ পরিদর্শনে বের হন মন্ত্রী তাজুল ইসলাম। তারা দেখতে পান- জলাবদ্ধতা নিরসনে ওয়াসা যেসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের তথ্য মন্ত্রণালয়ে উপস্থাপন করেছে, বাস্তবে তার মিল নেই। খালগুলোও ওয়াসা পরিস্কার করেনি। ড্রেনও ভরাট হয়ে আছে। এ অবস্থায় শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, 'ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড দায়সারাভাবে দায়িত্ব পালন করছে বলেই বছরের পর বছর ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আইন অনুযায়ী দায়িত্ব আমাদের কাছে হস্তান্তর করুন, আমরা দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত। আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত। আমাদের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেশি।' কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষিত জনবলসমৃদ্ধ ড্রেনেজ সার্কেলের মতো বড় একটি শাখা ঢাকা ওয়াসার থাকার পরও বছরের পর বছর রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসন করতে পারল না ঢাকা ওয়াসা। এসব না থাকা সত্ত্বেও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন কীভাবে তাহলে সফল হবে?
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম তার অভিজ্ঞতার চিত্র তুলে ধরে এ প্রসঙ্গে বলেন, কয়েকটি খালের কারণে কিছু এলাকায় প্রচণ্ড জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। খালগুলো খনন করার জন্য তিনি ঢাকা ওয়াসাকে চিঠি দেন। যে এলাকার মধ্যে খাল, সেই কর্তৃপক্ষকেও চিঠি দেন। তারা জানিয়ে দেয়, তারা খনন করতে পারবে না। তখন ডিএনসিসি কয়েক কোটি টাকা খরচ করে সেই খাল খনন করে। ফলে হজক্যাম্প থেকে পূর্ব এলাকায় এবার জলাবদ্ধতা হয়নি। তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের হাতে দিলে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু এ খাতের বরাদ্দটাও সিটি করপোরেশনকে দিতে হবে।
পানি বেচে লাভ, জলাবদ্ধতা নিরসনে লোকসান :২০১০ সালের দিকে ঢাকা ওয়াসা দেখতে পায়, ড্রেনেজ সার্কেল থেকে ঢাকা ওয়াসার কোনো আয় নেই। এ খাতে কেবলই ব্যয় আর ব্যয়। কিন্তু পানি বিক্রি করে পয়সার মুখ দেখা যায়। প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে বাহবা নেওয়া যায়। তখন জলাবদ্ধতা নিরসনের ড্রেনেজ প্রজেক্ট ফেস-১ ও ফেস-২ চলমান। ২০১৩ সালে ওই প্রকল্প শেষ হওয়ার পর ওয়াসা এ খাতে টাকা ব্যয় করতে অনীহা প্রকাশ করে। এমনকি বর্ষা মৌসুমের আগে বক্স-কালভার্ট ও ড্রেন পরিস্কারেও অনাগ্রহ দেখাতে শুরু করে। পানি নিস্কাশনের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের হাতে ছেড়ে দেওয়ার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দিয়ে বসে থাকে। এ কারণে খাল খনন, পাড় বাঁধাই, ওয়াকওয়ে নির্মাণসহ খালগুলোতে পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার কাজও আর এগোয়নি। পরে প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটলে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মাণ্ডা, হাজারীবাগ, কুর্মিটোলাসহ পাঁচটি খাল খনন প্রকল্প ও ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ প্রকল্প নেয় ওয়াসা। এক হাজার কোটি টাকার সরকারি অনুদানের ওই দুই প্রকল্প বাস্তবায়নেও ওয়াসা গড়িমসি করে। এ প্রকল্পের কাজ বর্তমানে প্রারম্ভিক পর্যায়ে আছে। ওয়াসার এক কর্মকর্তা জানান, ড্রেনেজ সার্কেল থেকে ওয়াসার কোনো আয় হয় না বিধায় এ শাখাকে সব সময় অবজ্ঞা করা হয়েছে। এমনকি ড্রেনেজ সার্কেলের প্রকল্প পরিচালক আবদুল ওয়াসেক, শওকত হোসেন ও নির্বাহী প্রকৌশলী মোজাম্মেল হোসেন বর্তমান প্রশাসনের আজ্ঞাবহ না হওয়ায় পাঁচ খাল প্রকল্প ও ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ প্রকল্পের দায়িত্ব ড্রেনেজ সার্কেল দিয়ে বাস্তবায়ন না করে স্যুয়ারেজ সার্কেলকে দিয়ে বাস্তবায়ন করানো হচ্ছে। অথচ স্যুয়ারেজ সার্কেলের লোকজনের ড্রেনেজবিষয়ক কোনো অভিজ্ঞতাই নেই। আর প্রতি বর্ষা মৌসুমেই যখন রাজপথে ঢেউ খেলার দৃশ্য তৈরি হয়, তখন ওয়াসা-সিটি করপোরেশন রশি টানাটানি শুরু করে।
সাবেক মেয়ররাও ক্ষুব্ধ ছিলেন ওয়াসার প্রতি :ওয়াসার অভিযোগ, উন্মুক্ত (সারফেস) যে ড্রেন দিয়ে পানি ওয়াসার পাইপ ড্রেনে যাবে, সিটি করপোরেশন সেই ড্রেনের মালিক। সেই সারফেস ড্রেনগুলো তারা পরিস্কার রাখে না। আবার সিটি করপোরেশন জানাচ্ছে, সারফেস ড্রেনের পানি যেসব পাইপ ড্রেন, বক্স-কালভার্ট ও স্টর্ম স্যুয়ারেজ দিয়ে যাবে, ওয়াসা সেগুলো পরিস্কার করে না। পাল্টাপাল্টি এ অভিযোগের একপর্যায়ে ২০১৭ সালের বর্ষা মৌসুমে ঢাকার তৎকালীন দুই মেয়র আনিসুল হক ও সাঈদ খোকন ওয়াসাকে তীব্রভাবে কটাক্ষ করেন। ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাসকিম এ খান তখন ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে সিটি করপোরেশনের হাতে ন্যস্ত করার কথা বলেন। ডিএনসিসির তৎকালীন মেয়র প্রয়াত আনিসুল হক স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন, কোনো পঙ্গু সন্তানকে ভালো করার দায়িত্ব তিনি নেবেন না। সন্তানকে সুস্থ করে দিলে তবেই তিনি দায়িত্ব নেবেন। তখন তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন দুই সিটি করপোরেশন ও ঢাকা ওয়াসার শীর্ষ ব্যক্তিদের নিয়ে বৈঠক করে স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব নাসরিন আক্তারকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠন করে দেন। কমিটির দায়িত্ব ছিল সিটি করপোরেশন ও ঢাকা ওয়াসার আইন পর্যালোচনা করে সুপারিশ প্রণয়ন করা। সেই কমিটি দীর্ঘদিনেও কোনো সুপারিশ দিতে পারেনি। এদিকে, ওয়াসাও জলাবদ্ধতা নিরসনের কাজ থেকে কার্যত বিরত।
আইনেও জটিলতা :১৯৯৬ সালের পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিস্কাশন কর্তৃপক্ষ আইনের ১৭ ধারায় বলা হয়েছে, ঢাকা ওয়াসা পানি নিস্কাশনের জন্য বড় ড্রেন নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও খাল দেখভাল করবে। অন্যদিকে, সিটি করপোরেশন আইন ২০০৯-এর তৃতীয় তফসিলে বলা হয়েছে, ছোটখাটো নালা, ড্রেন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে সিটি করপোরেশন। এই আইনের সূত্র ধরে সংস্থা দুটি পরস্পরের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।
সিটি করপোরেশনকে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দিতে হবে :জানা গেছে, জলাবদ্ধতা নিরসনের যেসব আধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে তা দেশে কেবল ঢাকা ওয়াসারই রয়েছে। প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি ও শতাধিক জনবলের একটি বড় বহর রয়েছে ঢাকা ওয়াসার। কিন্তু সিটি করপোরেশনের ড্রেনেজ সার্কেল বলে কোনো শাখাই নেই। তবে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ মনে করে, জলাবদ্ধতার নিরসনের দায়িত্ব যদি তাদের কাছে হস্তান্তর করে, তাহলে জনবল-যন্ত্রপাতিসহ পুরো শাখাকেই হস্তান্তর করতে হবে। আর এ খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ সরকার বা ঢাকা ওয়াসাকে নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই জলাবদ্ধতা নিরসন করা সিটি করপোরেশনের জন্য কঠিন হবে না। কিন্তু বরাদ্দ না দিয়ে শতাধিক জনবলের একটি পুরো শাখা সিটি করপোরেশনের ওপর ন্যস্ত করা হলে সেই হাতির খোরাক জোগাতে করপোরেশনকেই বিপাকে পড়তে হবে। তারপরও করপোরেশন চায়, সিটি করপোরেশনের হাতেই এ দায়িত্ব দেওয়া হোক। কারণ, এ রকম সমস্যা হলে নগরবাসী মেয়রকেই দায়ী করেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন করতে ঢাকা ওয়াসাও পারত। সেই সক্ষমতা ঢাকা ওয়াসার রয়েছে। তারা কখনোই চায়নি জলাবদ্ধতা নিরসন হোক। একটি সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে তাদের জনবলকে কাজে লাগালে আজ ঢাকা শহরে এ রকম জলাবদ্ধতা হতো না। তিনি বলেন, রাজধানীর খালগুলো উদ্ধার ও সেগুলো সচল করলেই ৭০ শতাংশ কাজ হয়ে যায়। ওয়াসা সেই কাজটিও এত দিনে করতে পারেনি।